Main Menu

জলাবদ্ধতা : দায় কার মাশুল কে দেয়?

 

সস্পাদকীয় >>>

বৃষ্টি হলেই ঢাকায় জলাবদ্ধতা যেন আমাদের নিয়তি হয়ে গেছে। বর্ষা প্রতিবছরই আসে, আর আমাদের নগরপিতারা প্রতিবারই বলেন, ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, আগামী মৌসুম জলাবদ্ধতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। কিন্তু আগামী মৌসুম যেন আর আসে না। আর বৃষ্টি হলে তো শুধু পানি জমে না, তার সঙ্গে নর্দমার সব ময়লা-আবর্জনাও উঠে আসে। অথচ যে শহরের আশপাশে চারটি নদী, সেই শহরে এমন জলাবদ্ধতা কেন হবে। শুধু চারটি নদী নয়, ঢাকা শহরের মাঝখানে আরও ৪৩টি খালের অস্তিত্ব ছিল একসময়। সেই খালের বেশির ভাগই আজ বিলীন। ভূমিদস্যুরা সেসব খালের ওপর এখন দোকানপাট ও ঘরবাড়ি নির্মাণ করেছে।

উন্নয়ন চিন্তায় প্রকৃতিকে বশে আনার ভাবনা যে কী বিপজ্জনক, তা নিশ্চয়ই আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। পার্বত্য চট্টগ্রামের কথাই বলছি। একসময় রাজনৈতিক বিবেচনায় সেখানে বিপুলসংখ্যক বাঙালিকে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। তারা না চিনত পাহাড়, না চিনত সেখানকার প্রকৃতি। ফলে তাঁরা যেখানে-সেখানে পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি বানিয়ে থাকতে শুরু করে। একপর্যায়ে শুরু হয় এই পাহাড়ধস। ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত সেখানে যে ১৬৬ জন মানুষ মারা গেছে, তার মধ্যে ১০৬ জনই বাঙালি, অর্থাৎ ৬৪ শতাংশ।

আজকের ঢাকা শহরটি মূলত নদীবেষ্টিত নিচু অঞ্চল। ফলে এখানে খাল-নদী ভরাট করে রাস্তা বানানোটা আত্মঘাতী হয়েছে। কবি বুদ্ধদেব বসুর স্মৃতিকথায় জানা যায়, তাঁরা একসময় নৌকা করে মিরপুরের আত্মীয় বাড়িতে যেতেন। নানা সূত্রে জানা যায়, ফরাশগঞ্জ, নারিন্দা, মৈশুণ্ডি থেকে হিন্দুধর্মাবলম্বীরা বর্ষাকালে নৌকায় চড়ে সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরে পূজা দিতে আসতেন। এই ২০ বছর আগেও ধোলাই খাল ছিল। ধোলাই সেতুর ওপর দিয়ে রিকশায় গিয়েছি, সে স্মৃতি আমার নিজেরই আছে। যতীন্দ্রমোহন রায়ের ‘ঢাকার ইতিহাস’ বইয়ে এই খালের বিবরণ দেওয়া হয়েছে এভাবে: ‘এই খাল বালু নদী হইতে বহির্গত হইয়া ঢাকা ফরিদাবাদের নিকটে বুড়িগঙ্গার সহিত মিলিত হইয়াছে। এই খালের একটি শাখা ঢাকা শহরের মধ্য দিয়া বাবুবাজারের নিকটে বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রবেশ লাভ করিয়াছে।’ অর্থাৎ একসময় এই খাল দিয়ে ঢাকার পূর্বাঞ্চল থেকে আজকের পুরোনো ঢাকায় আসা যেত। মোগলরা যখন ঢাকার দায়িত্ব নেয়, তখন তা এখনকার মতো সমতল ছিল না। এর নানা জায়গায় ডোবা, নালা, ঝিল ইত্যাদি ছিল। নদীমাতৃক বাংলাদেশের এই শহরটিতে পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে মোগল সুবেদার ইসলাম খাঁ ধোলাই খালের কিছু অংশ সংস্কার করান। তিনি সম্ভবত খালে কিছু অংশে নতুন করে খননও করিয়েছিলেন। ঢাকায় তখন পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যমই ছিল নৌকা। যোগাযোগের পাশাপাশি এই খাল ঢাকাবাসীর বিনোদনেরও খোরাক ছিল। এখানে একসময় নৌকাবাইচ হতো। অথচ সেই ধোলাই খাল আজ নেই। কতটা আত্মঘাতী জাতি হলে আমরা এ কাজ করতে পারি।

অন্যদিকে আজকের কারওয়ান বাজারের নামকরণ কিন্তু কারওয়ান নদীর নামানুসারে। এই নদী পূর্ব দিকে পাণ্ডু নদের সঙ্গে মিশেছিল। পাণ্ডু নদ মগবাজারকে দ্বিখণ্ডিত করেছে। অর্থাৎ আজকে যেটা হাতিরঝিল, তার পাশেও ছিল এক নদী। অথচ নগর-পরিকল্পনায় এই খাল ও নদীগুলো বিবেচনায় আনা হয়নি। সেটা করা হলে ঢাকাও ভেনিসের মতো শহর হতে পারত। তবে আশার কথা, সম্প্রতি হাতিরঝিলে ওয়াটার ট্যাক্সি সেবা চালু হয়েছে। গুলশান-১ থেকে রামপুরা হয়ে এফডিসি পর্যন্ত এই সেবা বিস্তৃত। পাঠক একবার ভাবুন, ঢাকার প্রতিটি খাল যদি থাকত আর সেগুলো পরস্পর সম্পর্কিত হলে আমরা এখন ওয়াটার ট্যাক্সিতে চড়ে সারা ঢাকা ঘুরতে পারতাম। সেটা হলে যানজটে আমাদের সময় নষ্ট হতো না, বৃষ্টি হলে নর্দমার ময়লা গায়ে লেগে শরীর ঘিন ঘিন করত না। আর বৃষ্টির পানি রাস্তায় জমত না, তা খালে-ঝিলে নেমে যেত।

মোদ্দা কথা হলো, প্রকৃতির গতির বিরুদ্ধে গিয়ে উন্নয়ন করা যায় না। একসময় মানুষ ভাবত, প্রকৃতিকে বশে এনে মানুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু সেই চিন্তা এখন পুরোনো হয়ে গেছে। বরং এখন প্রকৃতির সঙ্গে উন্নয়নযজ্ঞকে খাপ খাওয়াতে হবে। এটাই এ যুগের আধুনিকতা।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *