Main Menu

শহীদ স্মরণে – নূর আয়েশা সিদ্দিকা

 

 

শহরের একঘেয়ে জীবনের ফাঁক গলিয়ে প্রতি বছর ২/১ বার করে ফুসরত মিলতো নানাবাড়ি বেড়াতে যাবার। স্কুল ছুটির পর নানা বাড়ি বেড়াতে যাবার আমেজটাই ছিলো অন্যরকম।

 

শীতের সকালে কচি পতা আর ঘাসের শরীরে রাতভর জমা হওয়া শিশিরের জলকণা সূর্যমামার ছোঁয়ায় হীরকদ্যুতি নিয়ে ঝিকমিক করে উঠতো।নানাবাড়ির পাশার রাস্তা ধরে ফেরীওয়ালার হাঁকডাক- মোয়া নেবে মোয়া……এখনো জিবে লোভাতুর অনুভূতি আনে। পুকুরে ছোটছোট মাছ শিশুদের দলবেঁধে ভেসে বেড়ানো দেখতাম আদ্ভুত পলকহীন চোখে।এদিকে তখন আদিগন্ত মাঠের পাজর জুড়ে সর্ষে মেয়েদের গায়ে হলুদের আসর।

 

দুপুরে মৃদ্যু বাতাসের ধাক্কায় যখন বড় বড় পাছেদের পাতায় ঝিরঝিরে কাঁপুনি উঠতো তারই ছায়া এসে পড়তো সারা উঠোনময়। সেই সাথে মাঝে মাঝে পাখির ডাক,ঝরাপাতার দীর্ঘশ্বাস।

 

দিনান্ত বেলায় দিগন্তে নিজকে বিলীন করে সূর্য মামা যখন লুকিয়ে পড়তো তখন সাঁঝের সেই আলোআাঁধারির রেখা ধরে সারাদিন বন বদাড়ে ছুটাছুটি করে আমার ও বাড়ি ফেরার সময় হত। ইতিমধ্যে দেখতাম নানাবাড়ির এঘর ও ঘরে কাতাও হারিকেন কিংবা কুপির আলো জ্বলতে শুরু করেছে।

 

ওরই মাঝে চারদিকে প্রগাঢ় হতে থাকা অন্ধকারের মাঝে হারিকেনের টিমটিকে আলো গিয়ে ঠিকরে পড়তো নানা বাড়ির বসার ঘরের দেয়ালে একটি ছবির কাঁচের ফ্রেমে।অবাক আমি গা ছমছমে ভাব নিয়ে তাকিয়ে দেখতাম একমাথা ঝাকড়া চুল,মোটা ভ্রু আর মায়াবী চোখের তারুণ্যে ভরপুর এক যুবকের হাসিমাখা ছবি। আজ ও মনে পড়ে সাঁঝে পাখিরা তাদের আাঁষটে গন্ধ ডানায় মেখে নীড়ে ফিরতো। একসময় নানা ভাইয়া আর সব মামারা ও ঘরে ফিরতেন একে একে। কিন্তু আমার শিশু মনের প্রশ্নের জবাব মেটাতে ছবির সেই তরুণটিকে কখনই ঘরে ফিরতে দেখিনি। নিঃসঙ্গ দূরের যাত্রীর মত সবার মাঝে থেকে ও নেই।বুকের মাঝে ছবির সেই তরুনের ঘরে ফেরার প্রতীক্ষায় যখন হাজারো প্রশ্নের উঁকি ঝুঁকি তখন একদিন মায়ের কাছে জানলাম- উনি আমার বড় মামা। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শহীদ নুরুল আবসার।

 

শৈশবের স্মৃতি হতে আজ ও স্মৃতিতে উঁকি দেয় বড় মামার সেই ছবিটির পাশে লেইস আর চুমকি দিয়ে হাতের কাজের ফুল তুলে নকশা করা আমার মায়ের হাতে তৈরী করা আর ও দুটি কাঁচের ফ্রেম।যার একটিতে লিখা ছিলো-‘’তোমার খাতার প্রথম কোণে এঁকে দিলাম আলপনা/ আমার ছবি কইবে কথা যখন আমি থাকবনা।‘’

 

আর একটিতে না ফেরা সহোদরের প্রতি হৃদয়ের আকুলতা নিয়ে আমার মা সুঁই সুতার ফোঁড়ে লিখেছিলেন-‘’তুমি যে এলে না আবসার।‘’

 

শৈশবে শহীদ মামার সেই ছবি আর সেই দুটি ফটো ফ্রেমের লিখাই ছিলো আমার  প্রথম স্বাধীনতার ইতিহাস জানার হাতে খড়ি।

 

আমার মা প্রায়ই বড় মামার স্মৃতি চারণ করে কাঁদতেন। সেই সাথে মুক্তিযুদ্ধের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতেন। না কোন পুঁথিগত বিদ্যা হতে নয়। আমার মায়ের ৭১’এর সেই স্মৃতি চারণ হতেই বুঝেছি- ৭১’ মানে মা-বাবা আর প্রিয়জনের মায়ার বন্ধন ছেড়ে দেশকে বাঁচাতে এক তারুণ্যদীপ্ত তরুনের আত্নাহুতি।৭১’ মানে এক সম্ভবনাময় তরুণের না ফেরার দেশে হারিয়ে যাওয়া।

 

লেখক, নূর আয়েশা সিদ্দিকা। শহীদ নুরুল অাফছার এর ভাগনি।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *