Main Menu

স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা ভূমি, ইতিহাস সমৃদ্ধ নাঙ্গলকোট জেলা অবিলম্বে ঘোষিত হোক!

মো.আব্দুর রহিম বাবলু :

নাঙ্গলকোট একটি উপজেলার নামই শুধু নয়, বীরত্বে গাঁথা বহু আন্দোলন সংগ্রামের নাম। ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এক জনপদের নাম নাঙ্গলকাট। কবির কবিতা আর শিল্পীর তুলির আঁচঢ়ে নাঙ্গলকোটের ছবি আকাঁ হয়েছে। খ্রীষ্টিয় অষ্টম শতকে আরাকান রাজসভার কবি মুকন্দরামের কাব্যে হোমনাবাদ পরগনার মানুষের জীবন চিত্রের পরিচয় মেলে। পূর্ব বাংলার ইতিহাসে সমতট অঞ্চলের কাহিনীর অধিকাংশ পাতা জুড়ে এ এলাকার তথ্য স্থান পেয়েছে। শিক্ষা, সংস্কৃতির আন্দোলন সংগ্রামে নাঙ্গলকোট বরাবরই ছিল প্রথম কাতারে। পূর্তগীজদের গড়ে তোলা শহর দায়েমছাতি, ময়ূরা, ধাতিশ্বর আজো ঐতিহ্য হারায়নি। স্মৃতি জাগানিয়া মাঝিপাড়ার মাঝিদের পালতোলা নৌকার বন্দর নাওগোদা, চিলপাড়া, জাপানন্দী, বাঙ্গড্ডা যেন জীবন্ত রুপকথার সমাহার। সম্রাট আকবরের মন্ত্রী সভার প্রভাবশালী সদস্য রায়বাবুর নামে নাঙ্গলকোটে একটি ইউনিয়নের নাম করন করা হয় রায়কোট। শিক্ষিত স্বজ্জন লোকদের বসবাস স্থল হিসেবে বৃটিশরা অনেক কোটপরা মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করেই এখানকার নাম করনে উৎসাহী হন। তাছাড়া জলদস্যূদের আক্রমন প্রতিহত করতে নবাব আলীবর্দী খাঁর তৈরী কৃত দূর্গ/কোর্ট নামকরনে ইস্পিত ভ’মিকা রাখে। ব্যবসা ও কৃষি এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান পেশা হওয়া সত্বেও পোশাকে রীতিমত আভিজাত্যের ছোঁয়া দেখে অনেক বৃটিশেরই নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছিল। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শ্রী বসন্ত কুমারের ৩২ সহযোগী সহ আত্মদানের স্মৃতি কাহিনী এখনো এ অঞ্চলের মানুেষর মুখে মুখে। নাঙ্গলকোটের মানুষের দুঃখ কষ্ট আর বঞ্চনার ইতিহাস শুধু নাঙ্গলকোটে চাপা থাকেনি অল্পেতুষ্ট এখানকার মানুষের কল্পকথা, না পাওয়ার ব্যাথা, সব হারানোর ইতিহাস বিখ্যাত লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারের ধারাবাহিক নাটক সংশপ্তকে কালজয়ী চলচিত্রকার জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া ছবিতে ফুটে উঠেছে। জনপ্রিয় লেখক ইমদাদুল হক মিলন লেখা নাটকে নাঙ্গলকোটের মানুষের প্রত্যাহিক জীবন চিত্রের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। সোনালী আঁশের অঞ্চল নাঙ্গলকোটের পাটোয়ার মরা নদীর তটে পাড়লেও আজো ঐতিহ্য হারায় নি। কিল্লা দিঘী এখনো জীবন্ত সাক্ষী। যুগে যুগে প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে নাঙ্গলকোটবাসী তাদের বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে। নাঙ্গলকোট বাসীর যতটুকু অর্জন তা কারো দানে নয় পুরোটাই আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে অর্জিত হয়েছে। কুমিল্লা বিভাগ আন্দোলনের পুরোধা এডভোকেট মোখলেছুর রহমান চৌধুরী কুমিল্লা ও নোয়াখালীর মধ্যবতী স্থানের্ জেলা আন্দোলনের অন্যতম সদস্য গফুর মজুমদার ও রফিকুজ্জামানের পিতৃভূমি এ নাঙ্গলকোট। দ্বিজাতি তত্ব আন্দোলন ও ৪৭ এ দেশ ভাগ আন্দোলনে এখানকার মানুষের ভুমিকায় মুগ্ধ হয়ে পরবর্তীতে পাকিস্তানের লৌহ মানব নাঙ্গলকোট সফরে আসেন। এছাড়াও বাংলার গর্ব একে ফজলূল হক, হোসেন শহীদ সহরাওয়ার্দী, মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এখানে এসে নাঙ্গলকোটের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হন।
৬৯’র গন অভ্যুথানের সুতিকাগার ছিল নাঙ্গলকোট। শ্রীহাস্য গ্রামের একটি তুচ্ছ ঘটনার মধ্যে দিয়ে পাকিস্তানীদের তাড়ানোর সাহস পায় বাঙ্গালী। সূত্রপাত ঘটে স্বাধীনতা সংগ্রামের। এ ঘটনায় ১৩ ইপিআর সদস্যের ঘটনাস্থলেই মৃত্যু পাকিস্থান বিরোধী মনোভাবের প্রথম প্রকাশ ঘটে নাঙ্গলকোটের ধাতীশ্বরে। বিবিসির তৎকালীন ভাষ্যকার মার্কটালী এ ঘটনার বর্ণনায় স্বাধীনতা প্রিয় বাঙ্গালীদের আশ্বস্থ করে তোলে। বিশ্ব দরবারে নাঙ্গলকোট বীরত্বের পরিচয়ের পাশাপাশি স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা ভূমির মর্যাদা লাভ করে। প্রতিশোধ হিসেবে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শুধু ৪০টি গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি উপরন্ত তারা এখানকার ৩২ হাজার মানুষের জীবন দুর্বিসহ করে তুলেছিল। তাদের অত্যাচারে নাঙ্গলকোটের প্রায় চার শতাধিক মানুষ চির পঙ্গুত্বের শিকার হয়। যে স্মৃতি এ অ্ঞ্চলের মানুষ কে আজো কাঁদায় সহানুভুতি জানাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান নাঙ্গলকোটের ধাতিশ্বরে আসার ঘোষনা দেন। এর পূর্বে তোফায়েল আহমেদ, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, আস ম আব্দুর রব, অধ্যাপক খোরশেদ আলম শাজাহান সিরাজ, কে এম ওবায়দুর রহমান, মোঃ নাসিম আবদুল মালেক উকিল, আলহাজ্ব জালাল আহম্মদ, আব্দুল আউয়াল, মফিজুল ইসলাম, মনিরুল হক চৌধুরী, অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদসহ দেশ বরেণ্য বহু নেতা নাঙ্গলকোট বাসীর সাথে সাক্ষাত করে তাদের উৎসাহ যোগান। ২৫শে মার্চ ইয়াহিয়া খাঁন সামরিক শাসন জারি করায় বঙ্গবন্ধু ঘোষনা দিয়েও ঘটনা স্থলে পরিদর্শনে আসতে পারেননি। এ ঘটনায় তৎকালীন কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আমিনুর রহমান খান ১৭ নভেম্বর ৬৯- ৫জনের ফাঁসি এবং ১৬ জনের যাবৎজীবন রায় ঘোষনা করেন। পরবর্তীতে জেলা জজ আদালতে আপীলেও প্রায় একই রায় বহাল থাকায় বঙ্গবন্ধু নিজ খরচে হাইকোটে আপীল করেন, মামলাটি পরিচালনা করেন হামিদুল হক চৌধুরী ও সিরাজুল হক।
এদিকে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় মামলার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে পড়ে। যুদ্ধ শেষে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে এলাকার হাজার হাজার মানুষের গণ সাক্ষর আর টিপসই নিয়ে নিঃশর্ত মুক্তির আবেদন করলে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত ২১ কয়েদি মুক্তি লাভ করে। দেশ স্বাধীন না হলে এ মানূষ গুলো কোন দিন আলোর মুখ দেখার সুযোগ পেতনা। মুক্তিযুদ্ধে নাঙ্গলকোট বাসীর স্বতঃফুর্ত অংশ গ্রহণ ছিল রীতিমতো ঈর্ষনীয়। মেজর হায়দার, ক্যাপ্টেন মাহবুব, মেজর এনামুল হক চৌধূরী, ক্যাপ্টেন হুমায়ুন কবির,(বীর প্রতিক) কর্নেল কাদের বিগ্রেডিয়ার জালাল উদ্দিন সিদ্দিকী, গোলাম মাওলা মজুমদার, কমান্ডার আব্দুল মালেক, রশিদ আহম্মদ খন্দকার, আনোয়ার হোসেন মজুমদার, ইসহাক মিয়া, সুবেদার আকামত আলী, আবদুল গনি দারোগা, কমান্ডার মহসিন,আরিফ সহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার কৃতিত্বপূর্ণ আবদান জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরন করেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে নাঙ্গলকোটের বীর মুক্তিযোদ্ধারে তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে। খেতাবে ভূষিত হন ৪ বীর নাঙ্গলকোটবাসী। (ক্যাপ্টেন হুমায়ূন বীরপ্রতীক, আবুল কালাম বীরপ্রতীক, শহীদ আলী অশ্রাফ বীর বিক্রম,শহীদ রঙ্গুমিয়া বীর বিক্রম,) বিশেষ করে পরিকোট ব্রীজ তেলপাই অপারেশন, আদ্রা ইউনিয়ন ঢালুয়া, বক্সগঞ্জ ও হেসাখাল বাঙ্গড্ডা, রায়কোট, হাসানপুর এলাকার স্মৃতিময় ঘটনা পুরো দেশবাসীকে প্রেরনা যুগিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান উপজেলার আদ্রা ইউনিয়নস্থ পাপাচোঁ গ্রামের জনৈক হাবিবুর রহমানের বাড়িতে কিছু সময়ের জন্য অবস্থান করেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে বীর নাঙ্গলকোট বাসীর ভুমিকা ছিল অনবদ্য। এখানকার সর্বস্তরের জনগন ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বৈরাচার পতন আন্দোলন গড়ে তোলে, তাই প্রতিহিংসা আর দমন পীড়নের কবলে পড়ে নাঙ্গলকোটবাসী। হারাতে হয় তাদের প্রিয় স্বজন শহীদ আবদুল হামিদকে। স্বৈরাচার পতন আন্দোলনে দেশের প্রথম শহীদের তালিকায় নাম লেখায় নাঙ্গলকোটের শহীদ হামিদ। ৯১এর সংসদে স্বৈরাচার পতন আন্দোলনে নিহতদের শহীদ তালিকায় স্থান পায় নাঙ্গলকোটের দুই বীর সন্তানের নাম। চট্টগ্রামে কর্মসূচী পালন কালে স্বৈরাচার সরকারের লেলিয়ে দেয়া বাহিনীর নির্মম আঘাতে শাহাদাত বরন করেন শহীদ আবু তাহের। গর্বিত হয় নাঙ্গলকোট বাসী। জাতি লাভ করে গনতন্ত্র।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বীর নাঙ্গলকোট বাসীর স্বপ্নের দাবী কুমিল্লা ও নোয়াখালীর মধ্যবর্তী স্থান তথা দুটি জেলার হৃদপিন্ড বলে খ্যাত নাঙ্গলকোটকে সরকার প্রথমে থানা ও পরে উপজেলায় উন্নীত করে। কিন্তু দেশের জন্য জাতির জন্য স্বাধীনতার জন্য স্বতস্পূর্ত ভাবে প্রাণ উৎসর্গকারী নাঙ্গলকোট বাসীর শ্রম আর মেধার সঠিক মূল্যায়ন আজোা হয়নি। নাঙ্গলকোটের মানুষ আজো পায়নি সুন্দর যাতায়াত সুবিধা, এখানকার কৃষক পাচ্ছেনা উৎপাদিত পন্যের ন্যায্য মূল্য। হিমাগারের অভাবে কৃষকের উৎপাদিত ফসল সহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি চোখের সামনে পঁচতে দেখে। খেলার মাঠের অভাবে খেলোয়াড় তৈরী হচ্ছেনা, নেই কোন বিনোদন কেন্দ্র, ফায়ার সার্ভিস ষ্টেশনের অভাবে যাায়না আগুন নেভানো। নাঙ্গলকোটের বুকচিরে চলে যাওয়া গ্যাস আর রেল লাইন যেন তাদের অনাত্মীয়। ঢাকা চট্টগ্রামে চলাচলকারী প্রয়োজনীয় আন্ত:নগর ট্রেনের অভাবে যাত্রীদের দূর্ভোগের কমতি নেই। এছাড়া ও প্রশাসনিক সুবিধার অভাব জনিত কারনে নাঙ্গলকোবাসীকে পূজিপতি ও স্বার্থবাদী এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের হাতের পুতুল হযে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। অন্যার্য ও অনাকাঙ্খিত যন্ত্রনা কাতর এখানকার মানুষ। শৃঙ্খলা প্রত্যাশী হয়েও পাচ্ছেনা শান্তি।
তাই সত্য সুন্দর আর পরিচ্ছন্নতার সংমিশ্রনে উদিত হোক সেনবাগ, সোঁনাইমুড়ী, চৌদ্দগ্রাম, দাগনভূইয়া, লাকসাম আর মনোহরগঞ্জের ৩০ লক্ষ মানুষের নতুন ঠিকানা এবং প্রাণের দাবী অবিলম্বে ঘোষিত হোক নাঙ্গলকোট জেলা।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *