ফেনী প্রতিনিধি :
ফেনী জেলার সোনাগাজী পৌরসভায় সড়ক উন্নয়নের নামে চলছে হরিলুট। পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২ (আইইউডিপি-২) আওতায় প্রায় ১০ কোটি টাকার সড়ক উন্নয়ন কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
এ ব্যাপারে কাউন্সিলর ও স্থানীয়রা আপত্তি জানালেও সংশ্লিষ্টরা তাতে কর্ণপাত করছেন না বলে অভিযোগে জানা গেছে। উন্নয়ন কাজের দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার ঝড় তুলছেন স্থানীয়রা। সোনাগাজী পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম খোকনের কাছে উন্নয়ন কাজের অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এটিকে কাল্পনিক ও একটি চক্রের অপপ্রচার বলে দাবি করেন।
নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় তাকে ঠেকাতে একটি সিন্ডিকেট মরিয়া হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। সরেজমিন দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২ এর আওতায় উপজেলার নজরুল প্রাইমারি সড়ক উন্নয়নের জন্য সড়কের দক্ষিণ প্রান্তে ৭৬ লাখ ৫১ হাজার ৯১৪.৪২৬ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।
পৌরসভার অর্থায়নে ৬০০ মিটার নজরুল প্রাইমারি সড়কটি নির্মাণের জন্য ফেনী মাস্টারপাড়ার মেসার্স নাহার এন্টারপ্রাইজ নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পায়। একই সড়কের ওই প্রান্তে আবার ১২০ মিটার নির্মাণের জন্য ৭৪ লাখ ৬৭ হাজার ৯৮৭.৫৩৭ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এ সড়ক নির্মাণের জন্য শহরের বারাহীপুরের মেসার্স রফিকুল হক নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হয়। উভয় সড়ক উদ্বোধন করেন পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন।
যেখানে ৬০০ মিটার সড়কের জন্য ৭৬ লাখ ৫১ হাজার ৯১৪ টাকা বরাদ্দ হয়। আবার একই সড়কের ১২০ মিটারের জন্য ৭৪ লাখ ৬৭ হাজার ৯৮৭ টাকা বরাদ্দ হওয়ায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। এভাবে একই সড়কে দু’বার নেমপ্লেট ব্যবহার করে সড়ক উদ্বোধন করে টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে খোদ সোনাগাজী পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকনের বিরুদ্ধে। এভাবে ছয়টি সড়ককে দু’দিক থেকে নির্মাণ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে নিজের পকেটে ভরেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে পৌর মেয়রের বিরুদ্ধে। গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২ এর আওতায় ভূঞাপাড়া সড়ক উন্নয়নের জন্য ৯৪ লাখ ৭১ হাজার ৯৪০.৫৭৮ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ১২৯ মিটার ভূঞাপাড়া সড়ক নির্মাণ কাজের জন্য মাস্টারপাড়ার মেসার্স নাহার এন্টারপ্রাইজকে কাজ দেয়া হয়। ওই সড়কের নেমপ্লেট লাগিয়ে উদ্বোধন করার দু’দিন পর এলাকাবাসী নেমপ্লেটটি তুলে ফেলেন। শহীদ নুরুল হক ফরাজি সড়ক উন্নয়নের জন্য ৯৭ লাখ ৪১ হাজার ৭৭৪.৪৭৪ টাকা বরাদ্দ হয়। ৮০৫ মিটার এ সড়কটির কাজ দেয়া হয় বারাহীপুরের মেসার্স রফিকুল হক নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। পোস্টমাস্টার সড়ক উন্নয়নের জন্য ৭১ লাখ ৪৫ হাজার ৪২১.৪২৬ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ৬০০ মিটার এ সড়কটির কাজ দেয়া হয় মেসার্স চৌধুরী নিহা এন্টারপ্রাইজকে।
আবার ২০০ মিটার পোস্টমাস্টার সড়কটি নির্মাণের জন্য ৬১ লাখ ৬৩ হাজার ৫৮৮.২৩৪ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এ কাজটিও দেয়া হয়েছে মেসার্স নাহার এন্টারপ্রাইজকে। এভাবে একই সড়কে দুইবার নেমপ্লেট লাগিয়ে উন্নয়নের নামে টাকা আত্মসাতের হিড়িক পড়েছে সোনাগাজী পৌরসভায়। এনায়েত উল্যাহ মহিলা কলেজ সড়ক উন্নয়নের নামে ৭৭ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৩.১৯ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। কলেজ গেট থেকে তুলাতুলী পর্যন্ত ৭৫৬ মিটার সড়কের জন্য ৭৭ লাখ ২৯ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এ সড়কের কাজ দেয়া হয় মিজান রোডের মেসার্স হাসানুজ্জামান ভূঞা নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। এনায়েত উল্যাহ মহিলা কলেজ সড়কের নামেও দুটি প্রকল্প দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ করা হয়। তুলাতলি প্রাথমিক বিদ্যালয় সড়কের জন্য ৯০ লাখ ৩৭ হাজার ৫৮২ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ১৪০ মিটার এ সড়ক নির্মাণের জন্য কাজ দেয়া হয়েছে কদলগাজী রোডের মেসার্স চৌধুরী নিহা এন্টারপ্রাইজ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। শেখপাড়া ৩০০ মিটার সড়কের জন্য ১৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। বক্স আলী ভূঞা সড়কের জন্য ৯৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। সড়কগুলো করার ক্ষেত্রে ওয়ার্ক অর্ডার না মানা ও নিুমানের সামগ্রী ব্যবহারেরও অভিযোগ উঠেছে। সড়কে ব্যবহার করা এবং সড়কের পাশে জমানো ইটের সবই তিন নম্বর, পুরনো ও পুরনো পাইলিং ভাঙা পাথর।
প্রতিটি সড়ক ঢালাই হওয়ার কথা রয়েছে ১২০ এমএম থেকে ১৫০ এমএম। এতে রডের নেট ছিল ১২ থেকে ১৪ ইঞ্চি ফাঁকা। সেখানে রডের নেট বসানো হয়েছে ১৮ থেকে ২০ ইঞ্চি ফাঁকা। সড়ক নির্মাণ কাজ শেষের এক মাসের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। ফাটল স্থানগুলোতে সিমেন্টের গোলা ব্যবহার করে মেরামতও চলছে। কাজে অনিয়ম বিষয়ে সোনাগাজী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী সুধাংশ পাল মেয়রের নির্দেশ ছাড়া কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
পৌরসভার সড়ক নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২ এর প্রকল্প পরিচালক কাজী মিজানুর রহমান বলেন, সোনাগাজী পৌরসভার উন্নয়ন কাজ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তিনি শুনেছেন। তাই প্রকল্পের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত টিম গঠন করা হবে। কিছুদিনের মধ্যে তদন্ত টিমকে সরেজমিন নির্মাণ কাজ পরিদর্শন করে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেয়া হবে।