Main Menu

উন্নয়ন হতে হবে টেকসই

ড. মাহবুব উল্লাহ্ >>>
প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট, দুর্যোগ-দুর্ঘটনা বাংলাদেশের পিছু ছাড়ছে না। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ছোবল থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা পাওয়ার পর ঘটল মারাত্মক এক ট্রেন দুর্ঘটনা। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সামান্য বলা যাবে না। মৌসুমি সবজির আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশ কিছু ঘরবাড়িও বিধ্বস্ত হয়েছে।
প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। ঘূর্ণিঝড়টি যে রুদ্র রূপ ধারণ করে বাংলাদেশের উপকূলের দিকে এগিয়ে আসছিল, সেই রুদ্র মূর্তি যদি অটুট থাকত তাহলে ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস একত্র হয়ে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করতে পারত। বিপদ বা দুর্যোগ থেকে যখন আমরা রেহাই পাই, তখন আমরা সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। আমরা যে ধর্মীয় বিশ্বাস ধারণ করি সেই অনুযায়ী বিপদ থেকে রক্ষা পেলে সৃষ্টিকর্তার কৃপার জন্যই এটা সম্ভব হয়েছে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

তবে সৃষ্টিকর্তাও তার অপার করুণায় মানুষকে এমন কিছু দিয়ে থাকে যার বদৌলতে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হয়। দক্ষিণ বাংলায় সুন্দরবন ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে বিশাল বর্মের মতো কাজ করে। সুন্দরবনের প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সংবর্ধনের মধ্যেই নিহিত আছে মানুষ হিসেবে এ পৃথিবীর বুকে আমাদের টিকে থাকার শর্ত। অথচ সুন্দরবনের মূল্য আমরা বুঝতে পারছি না। সুন্দরবন তার প্রাণবৈচিত্র্য দিয়ে আমাদের জন্য একদিকে যেমন বিবিধ উপহার তুলে দিচ্ছে, অন্যদিকে এর অবস্থান আমাদের সামুদ্রিক ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করছে। কিন্তু মাতৃরূপিনী এ সুন্দরবনের হন্তারক হতে আমাদের দ্বিধা নেই। সুন্দরবনের সন্নিকটেই গড়ে তোলা হচ্ছে কয়লাভিত্তিক বিশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এ ছাড়া গড়ে তোলা হচ্ছে অনেক ধরনের শিল্প-কারখানা। এগুলোর বর্জ্য সুন্দরবনের প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে পরিবেশ বিজ্ঞানীদের ধারণা। সুন্দরবন পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট হিসেবে বিশ্ব ঐতিহ্যরূপে স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্ব ঐতিহ্যগুলো চিহ্নিতকরণ ও দেখভাল করার দায়িত্ব যে আন্তর্জাতিক সংস্থাটির হাতে সেই সংস্থাটি ইউনেস্কো নামে পরিচিত। সুন্দরবনের সন্নিকটে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও শিল্প স্থাপন এ বিশ্ব ঐতিহ্যের জন্য ক্ষতিকর হবে বলে ইউনেস্কো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আমরা ইউনেস্কোর এ উদ্বেগের প্রতি সামান্যতম শ্রদ্ধাও প্রদর্শন করছি না।

বিশ্বের অনেক দেশ কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ থেকে সরে আসছে। এর পাশাপাশি অবশ্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষণ রোধকল্পে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনেরও চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে ‘সুপার ক্রিটিক্যাল’ প্রযুক্তি নামে আপেক্ষিকভাবে কিছুটা নিরাপদ প্রযুক্তিরও ব্যবহার শুরু হয়েছে। কিন্তু এর চেয়েও নিরাপদ প্রযুক্তি প্রয়োজন। সুন্দরবনের পাশে যে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি তৈরি করা হচ্ছে তাতে ‘সুপার ক্রিটিক্যাল’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে বলে দাবি করা হলেও অনেকেই এ দাবির প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না। তারা প্রকল্পের দলিল দস্তাবেজ ব্যবচ্ছেদ করে দেখাতে চাইছেন যে, সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি এ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে না। এক কথায় বলতে হয়, উন্নয়নের নামে এবং উন্নয়নের স্বার্থে আমরা যা কিছুই করি না কেন, তার দ্বারা সুন্দরবনসহ সমগ্র বাংলাদেশের পরিবেশ ও প্রতিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না।
কথা উঠতে পারে, উন্নয়নের লক্ষ্য উৎপাদন বৃদ্ধি। কিছু ধ্বংস না করে কিছু উৎপাদন করা সম্ভব নয়। উৎপাদন করতে গিয়ে ধ্বংসের যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাতে পরিবেশের ক্ষতি হয়। পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য টেকসই উন্নয়নের প্রপঞ্চটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। টেকসই উন্নয়নের মূল কথা হল, বর্তমান প্রজন্মের ভোগ বৃদ্ধি করতে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভোগের পরিমাণ ও মান হ্রাস করা যাবে না। মানুষ হিসেবে আমরা যা কিছু ভোগ করি তার উৎসস্থলকে বলা হয় Original Fund of Consumption. যেমন- বর্তমানে বেশি করে মাছ খাওয়ার জন্য আমরা যদি মাছের বংশ সৃষ্টিকারী মাছগুলোকেও নদী বা জলাশয় থেকে তুলে ফেলি, তাহলে পরবর্তী সময়ে আর মাছ পাওয়া যাবে না। সে জন্যই সংরক্ষণের কথাটি ওঠে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, সরকার ইলিশ মাছের প্রজনন মৌসুমে ইলিশ মাছ ধরা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। এ সময় জেলেরা যাতে জীবনধারণ করতে পারে তার জন্য ভর্তুকিরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি রয়েছে, সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। এ ত্রুটি কীভাবে মোকাবেলা করা যায় তার জন্য সৃজনশীল ও বিজ্ঞানধর্মী চিন্তাভাবনার প্রয়োজন রয়েছে।
উৎপাদনের জন্য দু’ধরনের সম্পদের ব্যবহার করা হয়। এগুলোর একটি অনবায়নযোগ্য এবং অপরটি নবায়নযোগ্য। যেসব খনিজসম্পদ আমরা ব্যবহার করে ফেলি সেগুলো আর নতুনভাবে সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। অপরদিকে গাছপালা, লতাপাতা এবং প্রাণিকুলের সংরক্ষণ ও নবায়ন সম্ভব। তবে শর্ত থাকে যে, যে হারে এ ধরনের সম্পদ ব্যবহার করা হবে, একই হারে এ ধরনের সম্পদের প্রতিস্থাপনও করতে হবে। যেমন বলা হয়, একটি গাছ কাটলে দুটি গাছ লাগাও। এ নীতি অনুসরণ করলে বৃক্ষ সম্পদের মজুদ রক্ষা করা সম্ভব হবে।
টেকসই প্রপঞ্চটি দু’রকমের। এর একটি হল কঠোর টেকসই নীতি অবলম্বন এবং অন্যটি হল দুর্বল টেকসই নীতি অবলম্বন। অর্থনীতিবিদরা সাধারণভাবে দ্বিতীয় নীতির পক্ষে। কারণ প্রথমোক্ত নীতিটি অনুসরণ করা হলে প্রকৃতির গায়ে কোনো রকম আঁচড় কাটা যাবে না। ফলে উৎপাদনও হবে না। বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব হবে না। যে Original Fund of Cons
umption-এর কথা বলা হয়েছে তাকে Stock of CapitalI বলা যায়। Capital বা পুঁজির কাজ হল অধিকতর উৎপাদনে কাজে লাগা। Stock of Capital অনেক ধরনের হয়। যেমন বস্তু পুঁজি, প্রাকৃতিক পুঁজি, মানব পুঁজি, সামাজিক পুঁজি ও আর্থিক পুঁজি। প্রাকৃতিক পুঁজি ছাড়া অন্য ধরনের পুঁজিগুলো পাঠকের পক্ষে বুঝে ওঠা তুলনামূলকভাবে সহজ। প্রাকৃতিক পুঁজি হল নির্মল বায়ু, দূষণমুক্ত পানি, দিগন্ত বিস্তৃত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, প্রকৃতির মধ্যে নীরবতা, পাখির কলতান, ফুলের বিচিত্র সৌন্দর্য ইত্যাদি। উৎপাদন করতে গেলে এগুলোর কিছু না কিছু ক্ষতি হবেই। কারখানার ধোঁয়া নির্গমনে বায়ুর নির্মলতা হারিয়ে যায়। এ রকম আরও অনেক দৃষ্টান্ত দেয়া যায়।
উৎপাদনও করতে হবে এবং এটিকে টেকসইও করতে হবে- এ দুই শর্ত পূরণ করতে হলে বিভিন্ন ধরনের পুঁজির সমাহার স্থির রাখতে হবে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কোনো এক ধরনের পুঁজির মজুদ হ্রাস পেলে অন্য ধরনের পুঁজির মজুদ বৃদ্ধি করে সামগ্রিকভাবে পুঁজির মজুদটাকে স্থির রাখতে হবে। এর একটি বড় উপায় হল মানবসম্পদ বৃদ্ধি করা এবং এর গুণগত উৎকর্ষ সাধন করা। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন।
বাংলাদেশে সরকার ও সরকার সমর্থক গোষ্ঠী দিনরাত প্রচার করে যাচ্ছে, অচিরেই বাংলাদেশ হবে মধ্যম আয়ের দেশ, এবং তারপর হবে উচ্চ আয়ের দেশ। কিন্তু এগুলো অর্জন করতে হলে মানবসম্পদের যে উন্নয়ন ঘটাতে হবে তার জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো প্রয়াস লক্ষ করা যাচ্ছে না। শিক্ষার মান দিনের পর দিন নিচে নেমে যাচ্ছে। বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এক হাজারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান পাচ্ছে না। তাহলে আমরা জ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য কী করছি? এ ক্ষেত্রে যদি জাতি ক্রমাগতভাবে পিছিয়ে পড়ে তাহলে কোনো মেগা প্রজেক্টই এ জাতিকে রক্ষা করতে পারবে না। বস্তুগত পুঁজি, যেমন সড়ক-মহাসড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের জন্য শত-সহস্র কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। তার পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের জন্য আমাদের বাজেট বরাদ্দ অনেক অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। সুতরাং উন্নয়ন পরিকল্পনাতেও ভারসাম্য আনতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা ও রেল দুর্ঘটনার মতো ঘটনা ঘটতে পারছে তার একটা বড় কারণ, সুপ্রশিক্ষিত রেল ইঞ্জিনচালক ও মোটরযান চালকের অভাব। এ জন্যই খোদ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ট্রেন দুর্ঘটনা রোধে চালকদের প্রশিক্ষণ দরকার। কিন্তু সমস্যা হল, এ দেশে প্রশিক্ষণও অনেক ক্ষেত্রে প্রহসনে পরিণত হয়েছে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পরিবহন চালক প্রশিক্ষণ, নার্স প্রশিক্ষণসহ বহু ধরনের প্রশিক্ষণ রয়েছে যেগুলোর জন্য দেশে নামে মাত্র শত-সহস্র প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, কিন্তু এগুলোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং মান নিয়ন্ত্রণের জন্য তেমন কোনো সুষ্ঠু প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই। প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য হবে নিছক কুশলী মানব সৃষ্টি নয়, এর উদ্দেশ্যকে আরও অনেক সম্প্রসারিত করে সৎ ও নীতিবান মানুষ সৃষ্টিতেও মনোযোগী হতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টা পণ্ড হয়ে যাবে।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *