ভাস্কর্যের আত্মকাহিনী | বাংলারদর্পন

জহিরুল ইসলাম জাহাঙ্গীর :

শীতের ঋতুতে সকাল দশটা কি এগারটা মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি গায়ে ঢিলেঢালা পুরনো একটা কোট তাও আবার বুতাম ছাড়া পরনে কালো রঙয়ের প্যান্ট।

বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে একজন মানুষ কাঁধে চটের তৈরি একটা ব্যাগ নিয়ে ফুলগাজী উপজেলা প্রশাসনের অফিস বারান্দায় পায়চারি করছে ইউ.এন.ও’র দপ্তরে ঢুকবেন কি ঢুকবেন না ইতস্ততা করছেন।

তখন ভাগ্যক্রমে দেখা হলো লেখকের সাথে লেখক দেখে “এইযে সুনীলদা আপনি কখন দেশে এসেছেন? এখানে কখন এসেছেন এবং কেন এসেছেন? লেখক এর এমন একাধিক প্রশ্নে তিনি প্রথমে বিব্রত হলেন, তারপরও উত্তরে বললেন আমি ২০ বছর সৌদি আরবে স্বর্ণের কারখানায় গোল্ড ডিজাইনার হিসাবে কর্মরত ছিলাম কিন্তু অসুস্থ হয়ে যাওয়ার কারণে চলে এসেছি।

 

, বর্তমানে আমি এক্কেবারে বেকার তাই আমার পুরনো চারু ও সাহিত্য অঙ্গন টাকে নতুন করে উদ্ভাসিত করার চেষ্টা করছি। আমি কয়েকটা প্রস্তাব নিয়ে ইউ.এন.ও, ও উপজেলা চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে দেখা করতে এসেছি, আপনি আমাকে একটু সময় দিয়ে তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন।

 

তখন সাথে সাথে লেখক তৎকালীন উপজেলা নির্বাহি অফিসার কিসিঞ্জার চাকমা স্যারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন এবং সুনীল দাদার সেই কালের চারু ও সাহিত্য অঙ্গনের পুরো বিষয়টা তুলে ধরলেন ইউ.এন.ও মহোদয় তার এমন শিল্পকর্মের কথা শুনে তাকে প্রথমে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানালেন এরপর ভাস্কর সুনিল দাদা তাঁর অভিপ্রায় টুকু এক এক করে ব্যক্ত করলেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটা বিষয় হলো ফুলগাজী উপজেলার প্রবেশদ্বারে রাস্তার দু’পাশে দুটি ভাস্কর্য নির্মাণের কথা এই বিষয়টা উপস্থাপন করার সাথে সাথেই  কিসিঞ্জার চাকমা তা সাদরে গ্রহণ করলেন এবং উত্তম প্রস্তাব হিসেবে তা বিবেচনায় রাখলেন দুঃখের বিষয় এর দুদিন পরেই ইউএনও কিসিঞ্জার চাকমার বদলীজনিত কারণে তিনি চলে গেলেন বাংলাদেশ রেলওয়ে চট্টগ্রাম বিভাগে তবে তিনি যাওয়ার সময় পরবর্তী ইউ এন ওর সাথে এ বিষয়ে আলাপ করেছেন পরবর্তীতে উপজেলায় নতুন উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে যোগদান করেন মোঃ সাইফুল ইসলাম তার সাথে সুনীল বাবুর পরিচয়পর্ব সহ পূর্বের বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা হল সুনীল বাবু কিন্তু নাছোড়বান্দা উপজেলার প্রবেশদ্বারে তোরণ নির্মাণ করিয়ে ছাড়বেন এমন প্রত্যয় নব যোগদানকৃত উপজেলা নির্বাহি অফিসার এর সাথে তোরণ নির্মাণ সম্পর্কে আলোচনা করার সাথে সাথেই তা সাদরে লুফে নিলেন ইউএনও তখন সুনিল দাদা কে বললেন আপনি কয়েকটা তোরণের নকশা তৈরি করে আমার কাছে নিয়ে আসবেন উপজেলার সর্বজন স্বীকৃত যেই ডিজাইন টি নির্বাচিত হবে সেই ডিজাইন মতেই আমরা প্রবেশদ্বারে এ তোরণ নির্মাণ করব এই কথা বলার সাথে সাথেই সুনীল বাবু এক এক করে চারটি ডিজাইনের নকশা তৈরি করে হাজির হলেন সেই উস্কোখুস্কো চেহারা বুতাম ছাড়া কোট পরা কালো প্যান্ট কাঁধে ব্যাগ নিয়ে চলে আসলেন ইউএনওর দপ্তরে এই চারটি নকশা দেখার সাথে সাথেই ইউএনও মহোদয় উপজেলা নির্বাহি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল আলিম এর কাছে উপস্থাপন করেন এবং তার সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন।

 

এরপর পরেই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান তা দেখে এই তোরণ নির্মাণের সার্বিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন এক এক করে উপজেলার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সুশীল সমাজ জনপ্রতিনিধি সাংবাদিকসহ বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের সাথে এই ভাস্কর্যের নকশাগুলো উপস্থাপন করেন সবার নির্বাচনে এই নকশার ভাস্কর্যটির নির্বাচিত হয় এরপর ইউএনও নির্মাণ স্থান উপজেলার আনন্দপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হারুন মজুমদার এর সাথে আলাপ করলে তিনি তা সাদরে গ্রহণ করে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবার তোরণ নির্মাণের সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে চিঠি চালাচালি সহ আরো অন্যান্য কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ সাইফুল ইসলাম সাথে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মেশকাতুল রহমান ও নকশা প্রণেতা সুনীল দাস কে নিয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে গিয়ে তা অনুমোদন সম্পন্ন করে নিয়ে আসেন পরবর্তীতে উপজেলা প্রকৌশল বিভাগের সার্ভেয়ার আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম কে দায়িত্ব দেয়া হল ভিত্তি নকশার কার্যকরী প্রাক্কলন সহ নকশা তৈরি করা প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এই ভাস্কর্যের কার্যকরী একটি নকশা তৈরি করলেন নকশা প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় চার লক্ষ টাকা কিন্তু উপজেলা প্রশাসন ও পরিষদের ভান্ডারে তিন লক্ষ টাকার উপরে না থাকায় পিছিয়ে গেল এই ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ হতাশ হয়ে পড়লেন নকশা প্রণেতা ভাস্কর সুনীল দাস এর প্রায় মাস খানেক পরে সুনিল দাদা লেখক কে নিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এর কার্যালয় সে কাতর স্বরে বলেন স্যার আমার জীবদ্দশায় বোধহয় এই তোরন নির্মাণ দেখে যেতে পারলাম না যদি এই তোরণ নির্মাণ না হয় তাহলে আমি নিজেই ওই স্থানে বাঁশ ও বেত দিয়ে এই নকশা অনুপাতে তোরণ নির্মাণ করে নিজের মনকে সান্ত্বনা দেব সুনিল দাদার এমন কথা শুনে ইউ.এন.ও মহোদয় উচ্চকণ্ঠে সুনীল বাবুকে বললেন এই সুনীল বাবু আপনি এত হতাশ হচ্ছেন কেন আমি যেহেতু এটার কাজ হাতে নিয়েছি তা নির্মাণ করিয়ে ছাড়বো তবে তার বাজেট টা আরো কমিয়ে আনতে হবে তখন আমাকে ডেকে বললেন তিন লক্ষ ২০ হাজার টাকার মধ্যে এই তোর নির্মাণের কার্যকরী নকশা তৈরি করুন আবার পূর্বের প্রাক্কলন নকশা পরিবর্তন করে নতুন প্রাক্কলনে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যেই তৈরি করা হলো তার কার্যকরী নকশা এই টাকার মধ্যে তরুণ নির্মাণে এগিয়ে আসলেন এলাকার তরুণ সমাজ সেবক ক্রীড়াবিদ ঠিকাদার নাজিম উদ্দিন মজুমদার নির্মাণের কাজ হাতে নিলেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার চেষ্টা শুরু করলো ভাস্কর সুনীল বাবু নকশা তৈরীর কারিগর জোগাড় করে ঠিকাদার নাজিম উদ্দিন মজুমদার শুরু করলেন তার কাজ এদিকে সুনিল দাদা লেখক কে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা না খেয়ে বসে থাকে উপজেলার প্রবেশ দ্বারে আনন্দপুর ইউনিয়ন এর বন্দুয়া দৌলতপুর সিলোনিয়া নদীর দক্ষিণ পাশে তোরণ নির্মাণ স্থানে তখন লেখক বিরক্ত হয়ে সুনীল বাবু কে বারবার চলে যাওয়ার তাগাদা দেয় একপর্যায়ে সুনীলদা লেখক কে বলেন আমি এখানে কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত থাকবো আপনার তারা থাকলে আপনি চলে যেতে পারেন এভাবে একদিন দুদিন করে এক মাসের মাথায় নির্মাণ হল রাস্তার দুই ধারে দুটি একই নকশায় তোরণ বা ভাস্কর্য দৃষ্টিনন্দন এই ভাস্কর্য নির্মাণের পরে এক এক করে নজর কেড়ে নিল উপজেলার সহ পার্শ্ববর্তী ফেনী জেলা সহ বিভিন্ন উপজেলা লোকজনের নজর।

 

অপরদিকে নির্মাণকালে ঠিকাদার নাজিম উদ্দিন মজুমদার এর সাথে ভাস্কর সুনীল দাদার একটু পর পর এই কথা কাটাকাটি শুরু হয় বিভিন্ন নকশার অপরদিকে কারিগর জড়িয়ে পড়েন এই ঝামেলায় তার মধ্যস্থতা হিসেবে লেখক তাদেরকে সামাল দেয় অবশেষে মাথা উঁচু করে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর সেই বিখ্যাত কবিতা বিদ্রোহী কবিতার মত বল বীর চির উন্নত মম শির এবং মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে দাঁড়িয়ে আছে ফুলগাজী ফেনী পরশুরাম সড়কের ফুলগাজী উপজেলার আনন্দপুর ইউনিয়ন এর বন্দুয়া দৌলতপুর সিলোনিয়া নদীর দক্ষিণ পাশে।

 

এ দুটি অপেক্ষার প্রহর গুনছে উদ্বোধনের জন্য আর স্বাগত জানাচ্ছে ফুলগাজী উপজেলা ও উপজেলা বাসীর পক্ষ থেকে এই ভাস্কর্যটি এ ব্যাপারে নকশা প্রণেতা ভাস্কর সুনীল দাদার সাথে তার তাত্ত্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন “নতুন প্রজন্মের তারুণ্যের প্রতীক প্রচলিত শিক্ষা কে সূর্যের রশ্মির সাথে তুলনা করা হয়েছে, এছাড়া সমুদ্রের মাঝে এক জোড়া তরুণ-তরুণী তরীর মাঝে উঠে তারা নির্দিষ্ট অভিষ্ঠ লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে, অন্তর চক্ষু দিয়ে অনন্ত আকাশ দেখা, অনাগত সূর্যের সুদূরপ্রসারি দরজা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি স্মরণ করে মাথা উঁচু করে মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে”। এই বিষয়গুলোকে একত্রিত করে তারুণ্যের উদ্দেশ্যে এই তোরন বা ভাস্কর্য।

পরিশেষে লেখক ভাস্কর সুনীল বাবুর চাওয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন “দিয়েছি কি পাওয়ার আশায়” ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *