Main Menu

বেপরোয়া পদক বানিজ্য : কতৃপক্ষের হস্তক্ষেপ জরুরী

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

টাকা দিলেই মেলে পদক, সম্মাননা। বিখ্যাত ব্যক্তিদের নামে দেয়া হচ্ছে এসব পদক। অনুষ্ঠানে অংশ নেন মন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। পদকপ্রাপ্তদের তালিকায়ও দু’-একজন বিখ্যাত লোক থাকেন। তবে এটি পদক ব্যবসায়ীদের এক ধরনের কৌশল। পদক দেয়ার নামে বাণিজ্য করছে রাজধানীতে এমন চক্র আছে অন্তত অর্ধশত। এই চক্র বিখ্যাত ব্যক্তিদের নামে পদক দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নেয় অর্থ। টাকা দিলে যে কেউ পেতে পারে তাদের দেয়া পদক আর সম্মাননা। পদক ব্যবসায়ীদের বিষয়ে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে নানা চমকপ্রদ তথ্য। অর্থের বিনিময়ে পদক দেয় এমন কয়েকটি চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা নির্ধারিত অর্থের বিনিময়ে একাধিক পদক দেয়ার প্রস্তাব দেয়। এমনকি পদকের ‘মূল্য’ নিয়ে দরকষাকষিও করে তারা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীসহ সারা দেশে অর্ধ শতাধিক ‘সংগঠন’ নামে-বেনামে অর্থের বিনিময়ে এ অনৈতিক পদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসায়, সমাজসেবা, কৃষি, রাজনীতি, শিল্প, সংগীত, সাংবাদিকতা, সৃজনশীলতা এ রকম অন্তত ১৬টি ক্যাটাগরিতে সম্মাননা ও পদক দেয় এসব ‘সংগঠন’। বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তি ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী, স্বাধীন বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলা, বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শান্তিতে নোবেল বিজয়ী মাদার তেরেসা, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা, ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, সাহিত্যিক ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া, পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর, বঙ্গবীর এমএজি ওসমানী, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, কবি সুফিয়া কামাল-এমন বিখ্যাত ব্যক্তিদের নামে দেয়া হয় সম্মাননা পদক। এছাড়া আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসসহ বিভিন্ন বিশেষ দিবসেও দেয়া হয় পদক। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র, মাদার তেরেসা গবেষণা পরিষদ, মহাত্মা গান্ধী গবেষণা পরিষদ, বঙ্গবীর ওসমানী গবেষণা পরিষদ, স্বাধীনতা গবেষণা পরিষদ, অতীশ দীপঙ্কর সম্মাননা পরিষদ, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক স্মৃতি পরিষদ, কাজী নজরুল ইসলাম সম্মাননা পরিষদ, সুফিয়া কামাল গবেষণা পরিষদ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা গবেষণা পরিষদ, বিজয় দিবস স্মৃতি পরিষদ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্মাননা পরিষদ, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর গবেষণা পরিষদ- এ রকম অসংখ্য নামে পদক ও সম্মাননা দিচ্ছে অবৈধ সংগঠনগুলো। আর যারা পদক নেন তাদের বেশির ভাগই রাজধানীর বাইরে থেকে আসা পৌরসভার মেয়র, ওয়ার্ড কাউন্সিলর, ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্যসহ বিভিন্ন পেশাজীবী।

যাদের হাতে পদক তুলে দেয়া হয় তারাই মূলত এসব সম্মাননা অনুষ্ঠান আয়োজনের যাবতীয় খরচ বহন করেন। নির্ধারিত অনুষ্ঠানের জন্য সংগঠনগুলো বেছে নেয় জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ), সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তন, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, পাবলিক লাইব্রেরি মিলানয়তন, বিএমএ মিলনায়তনসহ রাজধানীর নামকরা হোটেলগুলোকে।

‘বাংলাভাষা ও সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র’ নামে একটি সংগঠনের প্রধান সমন্বয়কারী কাজী জামাল উদ্দিনের সঙ্গে পদক প্রাপ্তির জন্য যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, ১৯শে ফেব্রুয়ারি (ইতিমধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে) রাজধানীর শাহবাগস্থ পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে বিকাল ৫টায় ৩০ জনকে ক্রেস্ট ও ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা সম্মাননা’ দেয়া হবে। অনুষ্ঠানে সরকারের একজন মন্ত্রীর উপস্থিত থাকার বিষয়টিও জানান তিনি। নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিয়ে ওই অনুষ্ঠানে যারা সম্মাননা পাচ্ছেন, তাদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করে পদক নেয়া যাবে এবং কাজী জামাল উদ্দিন স্বাক্ষরিত একটি চিঠি এই প্রতিবেদকের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আলাপকালে কাজী জামাল উদ্দিন জানান, ইউপি সদস্য ছাড়াও যে কোনো ধরনের জনপ্রতিনিধি বা বিশেষ পেশায় থাকেল ৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকায় সম্মাননা বা পদক পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে সম্মাননা অনুষ্ঠানের সংবাদ ও ছবি বিভিন্ন জাতীয় ইংরেজি, বাংলা দৈনিক পত্রিকায় ছাপানোর ব্যবস্থা করে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে প্রতিটি পত্রিকার জন্য ৩ হাজার টাকা করে দাবি করেন তিনি। ওইদিন (১৯শে ফেব্রুয়ারি) বিকালে শাহবাগস্থ পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে গিয়ে দেখা যায়, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র’র সহযোগিতায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য চিকিৎসক, গার্মেন্ট ব্যবসায়ী, পৌরসভার ওয়ার্ড কাউন্সিলর, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ ৩০ জনের হাতে সম্মাননা তুলে দেন সাবেক একজন বিচারপতি। তবে, অনুষ্ঠানের আয়োজকদের কাছে সম্মাননাপ্রাপ্তদের নাম-ঠিকানা ও কোন বিশেষ অবদানের জন্য পুরস্কার দেয়া হচ্ছে- এমন বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তারা কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি। এমনকি অনুষ্ঠান শেষে সম্মাননাপ্রাপ্তদের ৩০ জনের মধ্যে অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো কথা বলতে রাজি হননি। সম্মাননা ও পদক পাওয়া চট্টগ্রামের বোয়ালমারি পৌরসভার কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র-১ মো. মুজিবুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য আমাকে সম্মাননা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কিছুদিন আগে ওই সংগঠনের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছিল- আমাকে এ পুরস্কার দেয়া হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সম্মাননা দেয়া সংগঠনের কেউ তার কাছে কোনো অর্থ বা অন্য কিছু দাবি করেননি। অনুষ্ঠানের আয়োজক হিসেবে গণআজাদী লীগের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে গণআজাদী লীগের সভাপতি এসকে শিকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মানবজমিনকে তিনি বলেন, আমরা ওইদিন গণআজাদী লীগের পক্ষ থেকে ৩ জন ভাষা সৈনিক ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় পুরস্কারপ্রাপ্তদের পদক ও সম্মাননা দিয়েছি। সেখানে অন্য কোন অ্যাওয়ার্ড বা পদক আমরা দিইনি। আর বাংলাভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র নামে যে সংগঠনের কথা বলা হচ্ছে ওইদিন তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। এ বিষয়ে যেহেতু এখন জানতে পেরেছি। আমরা খোঁজ নেবো। ভবিষ্যতে যাতে এমন না হয়, সে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিভিন্ন দিবসে পদক বা সম্মাননা দেয় এমন বেশকিছু ভূঁইফোড় সংগঠনের নেতা বা সমন্বয়কারীদের সঙ্গে কথা হয়। পদক প্রাপ্তির নিয়মনীতির বিষয়ে জানতে চাইলে ওইসব সংগঠনের কয়েকজন নেতা ও সমন্বয়কারী জানান, মেইল আইডি দিলে একটি আমন্ত্রণ পত্র পাঠানো হয়। এরপর নাম-ঠিকানা, ছবি ও কোন বিষয়ের উপর পদক নেয়া হবে, এই তথ্য সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতাদের জানাতে হবে। তাদের নিজস্ব নির্বাচনী বোর্ড এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে। তবে, পদক পেতে হলে অন্তত ৩০ হাজার টাকা খরচ করতে হবে। এই অর্থ সংগঠনের নেতা, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি, অনুষ্ঠানের খরচ হিসেবে ব্যয় হবে। আর অনুষ্ঠানে যদি মন্ত্রী বা বিশিষ্টজন আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে আসেন তাহলে খরচের পরিমাণ বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হবে পদক বা সম্মাননা প্রত্যাশীকে। ‘শেরে বাংলা স্মৃতি পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন রাজধানীর বিভিন্ন মিলনায়তনে প্রায়ই দেশের বিভিন্ন এলাকার জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন পেশাজীবীকে সম্মাননা ও অ্যাওয়ার্ড দেয়। সংগঠনের সমন্বয়কারী আমিনুল ইসলাম। নিজেকে তিনি পরিচয় দেন একটি প্রচারণা সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে। আলাপকালে তিনি জানান, আমরা অনেককেই পদক বা সম্মাননা দিয়েছি। যে কোন ‘সিস্টেম’ অবলম্বন করে আমরা পদক দিতে পারি। তবে, এজন্য অন্তত ৫টি পত্রিকায় সংবাদ প্রচারের খরছ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং সংগঠনের খরচ দিতে হবে। সংগঠনের সর্বনিম্ন খরচ ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা বলে জানান তিনি। এই সংগঠন কি ধরনের অ্যাওয়ার্ড দেয়-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা সাধারণত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে পদক দিয়ে থাকি। এছাড়া শেরে বাংলা স্মৃতি পদক, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, ওসমানী স্মৃতি পদক, মাদার তেরেসা সম্মাননা, ইন্দিরা গান্ধী সম্মাননা বেশি দেয়। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, মাদার তেরেসা ও শেরে বাংলা পদকের চাহিদা বেশি। কোন ধরনের ব্যক্তিরা পদকের জন্য যোগাযোগ করেন- এমন প্রশ্নে আমিনুল ইসলাম বলেন, মফস্বল এলাকার সমাজসেবক, উঠতি ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি হতে ইচ্ছুক জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ের রাজনীতিবিদ, অখ্যাত চিকিৎসক, আইনজীবী, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নামসর্বস্ব পত্রিকার সাংবাদিকরা পদকের জন্য তাদের সঙ্গে চুক্তি করেন। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে এ রকম একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, ওই অনুষ্ঠানে ২০ জনের হাতে পদক ও সম্মননা তুলে দেয়া হবে। অনুষ্ঠানে সরকারের একজন মন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজন বিশিষ্টজন উপস্থিত থাকবেন।

 

সুত্র মানবজমিন।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *