Main Menu

ফেনীর ছাগলনাইয়ায় গ্রামীণ জনপদে অনন্য পর্যটনকেন্দ্র

ফেনী (ছাগলনাইয়া) প্রতিনিধিঃ
‘শমসের গাজীর বাঁশের কেল্লা’একটি নিবিড় পল্লীতে যেন স্বপ্নের মতো আধুনিক নান্দনিক নির্মাণ শৈলী গাঁথুনিতে তৈরি করা ‘শমসের গাজীর বাঁশের কেল্লা’। বাঙালির হাজার বছরের লোকজ কৃষ্টি সংস্কৃতির অন্যতম লোকগাঁথা ‘বাঁশ শিল্প’। এই বাঁশ দিয়েই রীতিমতো পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করে দর্শনার্থীদের বিমুগ্ধ করে তুলেছেন মিরসরাই উপজেলার নিকটবর্তী ফেনীর ছাগলনাইয়ার জনৈক শিল্পমনা ব্যক্তিত্ব।

PTID-00085
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উন্নতমানের বাঁশের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয় এই ‘শমসের গাজীর বাঁশের কেল্লা’। বাংলার সর্বশেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ্দৌলার সময়কার ত্রিপুরার রাজা শমসের গাজীর নামেই নামকরণ করা হয় পর্যটন কেন্দ্রটির। এখানে সব চেয়ে ব্যতিক্রম সংযোজন হলো বর্তমান কীর্তিমান নান্দনিক ও টেকসই শিল্প কারখানার দেশ জাপানের গৃহ নির্মাণ শৈলী। আধুনিক বহুতল পাকা নির্মাণের পাশাপাশি আমাদের দেশীয় লোকজ বাঁশ দিয়ে তৈরি করা নান্দনিক শিল্প সংবলিত আবাসিক রিসোর্টটি যে কোনো দর্শনার্থীর চোখ ধাঁধিয়ে দেবে। দেশীয় বাঁশ দিয়ে নান্দনিক ঘরগুলোতে বাঁশের খাট, বাঁশের চেয়ার টেবিলসহ বাঁশের সব আসবাবপত্রে ভিন্ন রকমের আধুনিকতায় প্রাকৃতিক নান্দনিক শৈল্পিকতা সবাইকে হতবাক করে দেয়।

CHagl PTID-00087
বাঁশের এই রিসোর্টে একই সঙ্গে পারিবারিক ঘরোয়া পরিবেশে থাকা খাওয়ার আয়োজনে রয়েছে থাকার ঘর, ডাইনিং হল, পাঠ কক্ষ, মেহমান কক্ষ, চা কর্ণার, পানির ফোয়ারা, পাহাড়ি গাছপালার আবহ, পাশেই দৃষ্টিনন্দন লেক। লেকের ওপর একটি সুদৃশ্যময় পারাপার ব্রিজ। ব্রিজের পাশেই একটি ভাস্কর্য রিলাক্স স্ট্যাচু। রিলাক্স স্ট্যাচুটা দেখলেই হাঁটু গেড়ে শুয়ে থাকা যুবককে নিয়ে যে কেউ ভাবতেই বসে যাবেন। কি বোঝানো হলো এতে।
আবার পাহাড়ের ওপর থেকে সাদা শাড়ি পরা এক রমণী কলসি দিয়ে জল ঢালছে, যা থেকে সৃষ্ট ঝর্ণাধারা ও রহস্যে ঘেরা ভাবনার বিষয়। প্রবেশ পথে আরো রয়েছে বাংলার নবাবদের সেই প্রাচীন কীর্তিকে স্মরণ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ভাস্কর্য। যেন সেই নবাবী আমল থেকে বসে বসে বাঁশের কেল্লা পাহারা দিচ্ছে আজো। গ্রাম-বাংলার লোক সংস্কৃতির আরো অনেক উপকরণের সমন্বয়ে প্রায় ৫ একরের ওপর পুরো পর্যটনকেন্দ্রটি নির্মাণ করে এটি এক ধরনের চমকপ্রদ করে তোলার চেষ্টা করেছেন উদ্যোক্তা। বাঁশের রিসোর্টের বাইরে সুউচ্চ বাঁশের সারি। দেয়ালগুলোতে শুধুই বাঁশের দেয়ালি শিল্পকর্ম এবং প্রতিটি আসবাবপত্র বাঁশ দিয়ে তৈরি করা। সত্যিই অবাক করা কাণ্ড!
রিসোর্টের বাইরেও রয়েছে নানান শৈল্পিক আয়োজন, বাইরের বাগানের পাশের খোলা আঙিনার ধারে বাঁশের মাচা করে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি ঘর।
সেখানে যে কোনো সাহিত্য আড্ডা কিংবা মুক্ত অনুষ্ঠান আয়োজন করা যেতে পারে। পাহাড়ি ঘরটি মনোরম মঞ্চ সদৃশ। পাশে ছোট ছোট ফল গাছের বাগানের মাঝে মাঝে রয়েছে বসার ছোট ছোট বেঞ্চ, অপর পাশে লেকের পানিতে ঘুরে বেড়ানোর জন্য রয়েছে হাতে ঘোরানো বৈঠা দেয়া আসন পাতা সুদৃশ্য নৌকা। কেল্লার প্রবেশপথে সবার চোখে পড়বে ‘ঐকতান’ নামের একটি ঢোলক, তবলা, হারমোনিয়াম ও একতারা সংবলিত ভাস্কর্য।
বাঙালি গ্রামীণ জনপদ ও উপজাতীয়দের আদলে রয়েছে একটি টুকিটাকি কেনাকাটা ও চা কফির স্টল। এক পাশে এই কেল্লার প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের বাবা-মায়ের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রাখা দুটো কাঁচাঘরও অক্ষত রেখেছেন এখনো। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই ঘর দুটো প্রতিষ্ঠাতা ওয়াদুদ ভূঁইয়ার বাবা-মায়ের সময়কার কাচারিঘর ও গোলাঘর। গ্রামীণ জনপদের এই স্মৃতি তিনি জাদুঘরের মতোই কৃত্রিমতাবিহীন অক্ষত রাখার চেষ্টা করেছেন।
কেল্লার বাইরে রাস্তার ওপারে রয়েছে একটি স্মৃতিসৌধ আকারের ছোট্ট কবরস্থান। সেখানে শায়িত আছেন তার মা ও এক ভাই জানালেন রিসোর্টের উদ্যোক্তা।
এই বাঁশের কেল্লা ও শমশের গাজীর ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চাইলে কেল্লার উদ্যোক্তা পার্বত্য উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক এমপি ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, পর্যটনকেন্দ্রটি মূলত আমার বাবা-মা ও পূর্বপুরুষের স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা মাত্র।
তবে এত আধুনিক নির্মাণশৈলীতে বাঁশের কেল্লা কেন করলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার পূর্বপুরুষ তথা শমসের গাজীর ইতিহাস প্রায় ৪শ’ বছরের পুরনো ইতিহাস। বাংলার নবাব সিরাজ উদ্দৌলার আমলে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজা ছিলেন শমসের গাজী। আমার দাদাদেরও পরদাদা ছিলেন তিনি। সেই সূত্রে আমার দাদা এবং বাবাও অনেক সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন। কিন্তু তাদের নাম শুধু ইতিহাসেই রয়েছে। বাস্তবে ভারত সীমান্ত এলাকায় কিছু পৌরাণিক স্মৃতি ছাড়া কিছুই নেই।
তিনি আরো বলেন, আমার বাবা-মায়ের এই স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি সংরক্ষণ এবং একটি ঠিকানা এখানে রাখার চিন্তা করার পর থেকে কী রকমভাবে একটি ঘর করব তা ভাবছিলাম। আবার আমি এবং আমার পরিবারেরও হয়তো তেমন আসা হবে না।
কিন্তু একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হলে দর্শনার্থীরা এলে আমার ঘরটাও সজীব থাকবে, পাশাপাশি ঐতিহাসিক পূর্বপুরুষের নামটাও বাঁচিয়ে রাখা হবে। আর সেই ভাবনা থেকেই এই পর্যটনকেন্দ্রটি গড়ে তোলা। পাশে রয়েছে মায়ের সমাধিকে স্মৃতিসৌধের মতো সাজানো।
ত্রিপুরা রাজা শমসের গাজীর স্মৃতিতে গড়ে তোলা এই পর্যটন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াদুদ ভূঁইয়া ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে দু’বার পার্বত্য খাগড়াছড়ি আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি জানান, তার এই বাঁশের কেল্লার বাঁশ দিয়ে তৈরি রিসোর্টটি থাইল্যান্ড ও জাপানের বিভিন্ন শৈল্পিক রেস্ট হাউজের আদলে নির্মাণ করা হয়েছে। এর আর্কিটেক্ট হিসেবে কাজ করেছিলেন কানাডার লুই ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য প্রকৌশলী ‘সুরান না’। এশিয়া অঞ্চলের প্রাকৃতিক ধরনের ওপর নির্ভর করেই তিনি এই বাঁশের কেল্লার ডিজাইন করেছেন। এ জন্য দেশীয় বিভিন্নমানের বাঁশ সংগ্রহ করেছেন টাঙ্গাইলের মধুপুর ও পার্বত্য এলাকা থেকে। বড় সাইজের বাঁশগুলো মধুপুর আর ছোট আকৃতির বাঁশ (মুলি বাঁশ) পার্বত্য খাগড়াছড়ি থেকে আনা।
অবস্থান ও যাতায়াত: নান্দনিক এই ‘শমসের গাজীর বাঁশের কেল্লা’ ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার শুভপুর হয়ে জগন্নাথপুর সোনাপুর গ্রামে অবস্থিত।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এসে বারইয়ারহাট নামতে হবে। এরপর রামগড় রোড দিয়ে করেরহাট বাজার পেরিয়ে শুভপুর বাজারে গেলেই সোজা পূর্বদিকে একটি সরু সড়ক বেয়ে প্রায় ৩ কিলোমিটার সড়ক পার হলেই দেখা মিলবে এই বাঁশের কেল্লার। বারইয়ারহাট থেকে সিএনজি অটোরিকশাযোগে ভাড়া পড়বে ৪০-৫০ টাকা। আবার ফেনী শহর থেকে ছাগলনাইয়া হয়েও শুভপুর যাওয়া যায়। ভৌগোলিকভাবে এটি ভারত সীমান্তের অতি সন্নিকটেই অবস্থিত।
প্রবেশ: কেল্লার গেটে গেলেই ভেতরে প্রবেশ ফি লাগবে মাত্র ২০ টাকা। তবে অতিথি ও আগন্তুক মেহমানদের জন্য আবাসিক রিসোর্টের ভেতর শুধু আবাসিক অতিথিরাই অবস্থান করতে পারেন। দূর-দূরান্ত থেকে আসতে চাইলে এই নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করা যাবে ব্যবস্থাপক সায়েম ০১৮১৫-৩৮৫৩৭৫, মোজাম্মেল ০১৫৫২-৯২৬০০৯। আসার পূর্বে যোগাযোগ থাকলে দুপুরের খাবারসহ দর্শনার্থী টিমের সব আয়োজন করে থাকেন। পূর্ব থেকে বুকিং করা থাকলে আয়োজনে পাবে পরিপূর্ণতা।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *