Main Menu

আওয়ামী লীগের ঘরের ইঁদুর বাঁধ কাটছে

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী :

 

আওয়ামী লীগের একদল আত্মতুষ্ট নেতা ও এমপির ধারণা সাধারণ নির্বাচনের আর দু’মাসও বাকি না থাকলেও বিরোধী দলগুলো এখনও ঘর গোছাতে পারেনি। বিএনপি ফাঁকা কর্মসূচি দিচ্ছে এবং ফাঁকা আওয়াজ ছাড়ছে। যুক্তফ্রন্টের দুই শীর্ষ নেতার একজন হাঁটুর চিকিৎসায় ব্যস্ত। অন্যজনও অসুস্থ এবং বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যের ব্যাপারে দোমনা। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী প্রচারণায় আগে থেকেই মাঠে আছে এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বের কোনো চ্যালেঞ্জ দেশে নেই। তার বিকল্প কোনো নেতৃত্বও নেই। সুতরাং তাদের আর পায় কে? তারা তো নির্বাচনে এমনিতেই জিতে আছেন।

এই ধারণাটা যে কত বিপজ্জনক, সে সম্পর্কে শেখ হাসিনা নিজেও সচেতন এবং মার্কিন মুল্লুক থেকে দেশে ফিরেই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন তিনি- ‘আত্মসন্তুষ্টি আওয়ামী লীগের পতন ডেকে আনবে।’

আওয়ামী লীগের একশ্রেণীর মন্ত্রী, নেতা, এপিদের কর্ণকুহরে এই সতর্কবাণী পৌঁছাচ্ছে কি? তারা দীর্ঘকাল ক্ষমতায় আছেন। কিন্তু জনগণের কাছে পৌঁছাতে পেরেছেন কি? তাদের আস্থা ধরে রাখতে পারছেন কি?

গত জুলাই মাসে দেশে এসেছিলাম। তখন কোটা পদ্ধতি বাতিল ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশ উত্তাল। কিন্তু বিস্মিত হয়ে খেয়াল করেছি জনগণের যত রোষ মন্ত্রী, এমপি ও আমলাদের বিরুদ্ধে, তত রোষ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নয়।

তিনি বিদেশে যেমন প্রশংসিত, তেমনি দেশেও। শক্তি প্রয়োগ না করে, আরও রক্ত না ঝরিয়ে তিনি একবার যেমন বিডিআর বিদ্রোহ ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মোকাবেলা করেছেন, এবারও তেমনি নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজপথে নামা বিশাল কচিকাঁচাদের সমাবেশকে রক্তচক্ষু দেখিয়ে দমন করার চেষ্টা করেননি, স্নেহ ও সহানুভূতি দ্বারা তাদের ঘরে ফিরে যেতে প্রণোদিত করেছেন। এই আন্দোলনকে বিপথগামী করার জন্য বিএনপি-জামায়াতের অপচেষ্টা সফল হয়নি।

শেখ হাসিনার শত্রুরাও এখন স্বীকার করছেন, তার পিতা বঙ্গবন্ধু অতি অল্পসময়ের মধ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের পথে এগিয়ে নিয়েছিলেন; কিন্তু দেশের প্রকৃত উন্নয়ন হয়েছে শেখ হাসিনার আমলে। তার আমলের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধু এশিয়ার কোনো কোনো দেশকে নয়, ইউরোপের কোনো কোনো দেশকেও হারাতে চলেছে। এ কথা এখন স্বীকার করছে বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘও। তারা শুধু একটি কথাই বলছেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এতদিনে আরও উন্নতি লাভ করত, এমনকি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি দেশকে ছাড়িয়ে যেত, যদি দেশটিতে দুর্নীতির বিশাল পাহাড় তৈরি না হতো। অনেকের মতে, শুধু দুর্নীতি নয়, ক্ষমতার অপব্যবহার, অপশাসন, সন্ত্রাস এবং অনাচারও দেশটির অগ্রগতি ঠেকিয়ে রেখেছে। আর এর প্রাদুর্ভাব বর্তমানে আওয়ামী লীগের একশ্রেণীর নেতা, মন্ত্রী ও এমপিদের মধ্যে বেশি। মালয়েশিয়ার অভাবিত উন্নতি ঘটানোর জন্য মাহাথির মোহাম্মদকে তার নব্বই-ঊর্ধ্ব বয়সে জনগণই আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছে।

সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে অভাবিত অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটানোর জন্য সাধারণ মানুষ কী করত? আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করারই সাহস দেখাত না বিএনপি-জামায়াতের মতো কোনো দল। কিন্তু না, শুধু বিএনপি-জামায়াত আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করার জন্য মাঠে নামেনি; জনগণ কর্তৃক বারবার প্রত্যাখ্যাত, অসুস্থ, অক্ষম, বৃদ্ধ এবং ঘরের কোণে আশ্রয় নেয়া একদল নেতাও আবার ঘর ছেড়ে দলবদ্ধ হয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছেন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে হটানোর উদ্দেশ্য নিয়ে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সাধারণ মানুষকে নির্যাতনের অভিযোগও তোলার সুযোগ তারা পেয়েছেন। এই অভিযোগগুলো যে একেবারে অসত্য, তা নয়। জুলাই মাসে যখন দেশে ছিলাম, একশ্রেণীর মন্ত্রী, এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অসংখ্য গুরুতর অভিযোগ শুনেছি। সব অভিযোগ বিশ্বাস করিনি। আমার সাংবাদিক জীবনের অভিজ্ঞতা হল, অনেক ভালো মানুষেরও চরিত্র হননে বিএনপি-জামায়াতের প্রোপাগান্ডা মেশিন অত্যন্ত দক্ষ। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় নেতাদের যারা চরিত্র হনন করতে পারে, আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতা, মন্ত্রী, এমপিরা তাদের টার্গেট হবেন, তাতে আর বিস্ময়ের কী আছে!

কিন্তু একটা ব্যাপার আমাকে কিছুটা শঙ্কিত করেছে। আওয়ামী লীগের একশ্রেণীর এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান ও নেতার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন তাদের এলাকারই সাধারণ মানুষের সঙ্গে আওয়ামী লীগেরই স্থানীয় নেতা ও কর্মীরাও। এই এমপিদের দ্বারা তারা শুধু উপেক্ষিত নয়, নির্যাতিতও। এই শ্রেণীর এমপিদের নির্যাতনে আওয়ামী লীগের অনেক পরীক্ষিত পুরনো কর্মী এখন পর্যুদস্ত। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানিও করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগে এখন নবাগতদের আধিপত্য। তারা নব্যধনী। অনেক এমপিও তাই। এলাকায় একাধিপত্য বহাল রাখার জন্য তারা আওয়ামী লীগের পুরনো নেতাকর্মীদের উপেক্ষা করে প্রয়োজনে বিএনপি, জামায়াতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে (বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যবসার সম্পর্ক) তুলেছেন এবং তাদের সাহায্যে এলাকায় লুটপাটের রাজত্ব চালাচ্ছেন। বিএনপি-জামায়াতের এই লোকরা নিজেদের আওয়ামী লীগার বলে পরিচয় দেন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্যে আওয়ামী লীগের প্রকৃত নেতাকর্মীদের ওপর অত্যাচার চালান। নির্বাচন এলে এরা তলে তলে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিরোধিতা করেন এবং নির্বাচনের দিন বুকে আওয়ামী লীগের ব্যাজ লাগিয়ে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে ভোট কেন্দ্রে ঢুকে বিএনপি প্রার্থীর ভোটবাক্সে ভোট দেন। এদের কারসাজিতেই আওয়ামী লীগের প্রকৃত প্রার্থীরা, যাদের নির্বাচিত হওয়া নিশ্চিত ছিল, তারাও পরাজিত হন এবং তখন দেশে একটি ধারণা গড়ে ওঠে যে, আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা নেই। অবাধ নির্বাচন হলে দলটি পরাজিত হবে।

একজন বা দু’জন নয়, আওয়ামী লীগের অসংখ্য এমপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছ থেকেই অভিযোগ শুনেছি যে, তারা বিত্তশালী বিএনপি-জামায়াত নেতাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এলাকায় দুর্নীতি ও অত্যাচার-অনাচারের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তাতে দুর্নাম হয় আওয়ামী লীগের। কিন্তু সাধারণ মানুষের সঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রকৃত ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা নির্যাতিত হন।

এমপিদের সঙ্গে একশ্রেণীর মন্ত্রীর বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ শুনেছি। কারও নাম করতে চাই না। কিন্তু একজনের নাম করতে হয়। তিনি রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক সাহেব। তার সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল, তিনি একজন রোমান্টিক, আমুদে চরিত্রের মানুষ এবং তরুণীভার্যা। আরও ভেবেছিলাম তিনি সম্ভবত তার এলাকার মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু তার বিরুদ্ধেই এলাকার মানুষের এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অভিযোগ অনেক। কারণটা কী? একটি সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে শেখ হাসিনার উচিত যেসব মন্ত্রী, এমপির বিরুদ্ধে জনগণের অভিযোগ আছে, তাদের সম্পর্কে একটি স্ক্রিনিং কমিটি গঠন করা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে নির্বাচনে এদের মনোনয়ন না দেয়া। বর্তমানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের যে বিশ্বখ্যাতি এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নে তার দল ও সরকারের যে প্রশংসিত ভূমিকা, তাতে রাজনৈতিক এতিমদের কোনো যুক্ত অথবা মুক্ত ফ্রন্টই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কিন্তু কথায় বলে ঘরের ইঁদুরই বাঁধ কাটে। এই ঘরের ইঁদুরদের সম্পর্কে তিনি শক্ত হোন, তাহলে এদের দমনের জন্য বিড়াল পুষতে হবে না।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *