Main Menu

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস || শহীদুল্যাহ কায়সারকে হত্যা

সৈয়দ মনির অাহমদ >>>
‘এমনিতে শহীদুল্লাহ কায়সার খুব কথা বলতেন। কিন্তু যেদিন যুদ্ধ শুরু হলো সেদিন থেকে তিনি চুপ। সারাদিন টেনশনে থাকেন। যুদ্ধের আগে তাঁকে অনেকে বাড়ী ছেড়ে চলে যেতে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু তিনি রাজী হননি। কারণ তিনি ব্যস্ত ছিলেন একটি উপন্যাস রচনায়। তাই তিনি বলতেন, ‘যুদ্ধ আমাকে দেখতে হবে। কারণ তথ্যগুলো আমার উপন্যাসে লাগবে।’

চৌদ্দই ডিসেম্বর। সকাল বেলায় দেখা গেল বিদেশী দূতাবাসের নম্বর প্লেট লাগানো একটি গাড়ী এসে শহীদুল্লাহ কায়সারের বাড়ী থেকে একটু দূরে দাঁড়ালো। অনেকক্ষণ গাড়ীটা সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর একসময় চলে গেল।

সকাল ন’টা-দশটার দিকে সদরী ইস্পাহানীর টেলিফোন।

‘কি করবো কায়সার সাহেব?’

কায়সার সাহেব তাঁকে অভয় দিলেন।

বেলা তখন তিনটা। বারান্দায় স্ত্রীর সাথে বসে আছেন তিনি। এমন সময় দেখলেন টুপি মাথায় একটি লোক এক দৃষ্টে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। এ দেখে তাঁর স্ত্রী বললেন, ‘তুমি ভিতরে যাও, দেখনা লোকটা কিভাবে তাকিয়ে আছে।’

সন্ধ্যে ছ’টা। শহীদুল্লাহ কায়সার বসে বসে খবর শুনলেন। এক সময় চাকরকে ডেকে বললেন, আমার জন্য দু’টো রুটি বানিয়ো।

শহীদুল্লাহ কায়সার প্রায়ই স্ত্রীকে বলতেন, দেখো আমাকে যে কোন সময় নিয়ে যেতে পারে। সুতরাং সব সময় আমার জন্য কিছু কাগজ-কলম আর সিগারেট রেখে দেবে। আর কিছু টাকা। শহীদুল্লাহ কায়সার আর বলতেন, ‘আমি একজন সাংবাদিক। তারা আমাকে যাই করুক মারবার সাহস পাবে না।’

চাকরকে তিনি রুটি বানাবার কথা বলেছেন এমন সময় দরোজায় ধাক্কা। মিলিটারী এসেছে।

মিলিটারী এসেছে এ সংবাদ পেয়েই তিনি ইস্পাহানীকে টেলিফোন করলেন। কি কথা হয়েছে কেউ জানে না। শুধু দেখা গেল সংক্ষিপ্ত কথা শেষ হওয়ার পর তিনি চুপচাপ টেলিফোন রেখে দিচ্ছেন।

আলবদররা এদিকে দরজা ধাক্কাচ্ছে। তিনি বললেন দরজা খুলে দাও। একথা বলে উপরে বেডরুমে গেলেন; স্ত্রীকে বললেন, ‘শিগগির আমাকে কিছু টাকা দাও।’ বলে তিনি প্যান্ট পরতে লাগলেন। তাঁর স্ত্রী তখন বললেন, ‘টাকা দিতে বলে তুমি যাচ্ছো কই?’ শহীদুল্লাহ কায়সার বললেন, ‘না একটু ভালো পোশাক পরে নেই।’

স্ত্রী তাঁকে ঘরের বাইরে যেতে দেবেন না। কিন্তু তিনি যাবেনই। স্ত্রীকে বললেন, ‘আমাকে না পেলে ওরা বাসার সবাইকে মারবে।’

ইতিমধ্যে যিনি দরজা খুলে দিয়েছেন, তাকে আলবদররা সিঁড়ির কাছে বেঁধে রেখে সোজা দোতলায় উঠে তাঁর বেডরুমে ঢুকে পড়লো।

বেডরুমটা বেশ বড়। অন্য এক দরজার কাছে শহীদুল্লাহ কায়সার দাঁড়িয়ে। ঘরের মাঝামাঝি তাঁর স্ত্রী। আলবদররা ঘরে ঢুকে শহিদুল্লাহ সাহেবকে দেখতে পেলো না। তাঁর স্ত্রীকে একলা ঘরে দেখে তারা বেরিয়ে যাবার উদ্যোগ করলো। এমন সময় পর্দার কাছ থেকে শহীদুল্লাহ কায়সার সামনে এসে দাঁড়ালেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনারা কাকে চান?’

‘আপনার নাম কি?’ তারা পাল্টা জিজ্ঞেস করলো।

‘শহীদুল্লাহ কায়সার।’

সঙ্গে সঙ্গে তাঁর হাত ধরলো। ‘আপনার সাথে কথা আছে।’ বলে তারা তাঁকে বারান্দায় নিয়ে এলো।

এদিকে বাসা জুড়ে হৈচৈ চীৎকার। আলবদররা তাঁকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে।

এমন সময় শহীদুল্লাহ কায়সার কঠিন কণ্ঠে বললেন, ‘আমি তো যাচ্ছিই। আপনারা আমার হাত ধরবেন না।’ এ বলে তিনি একবার পিছন ফিরে সবাইকে দেখাতে চাইলেন। কিন্তু আলবদররা তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি।”
.
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র ৮ম খণ্ড পৃষ্ঠা নং ৫০৬-৫০৭
শিরোনামঃ হানাদার বাহিনীর সহযোগী আল-বদরদের হত্যার শিকার কয়েকজন
সূত্রঃ ১৯৭৩ সালের জাতীয় দিবসে সাপ্তাহিক বিচিত্রার বিশেষ সংখ্যা।
fb_img_1481602164083
সংগ্রহীত ছবিঃ শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সার।
.






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *