Main Menu

চীন – রাশিয়া সূ-সম্পর্ক:  আমেরিকার জন্য বিপদ সংকেত ?

আনোয়ারুল হক আনোয়ার : গত এক দশক চীন – রাশিয়া মধুর সম্পর্ক বিরাজ করছে । আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে আমেরিকার শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে চীন – রাশিয়ার সক্রিয় অংশগ্রহন লক্ষনীয় । উভয় দেশ সামরিক ও অর্থনৈতিক  গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বলা যায় । দুই বছর পূর্বে রাশিয়ার অর্থনৈতিক মন্দা প্রতিরোধে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মস্কো সফরকালে ছয় হাজার কোটি ডলারের চুক্তির সুবাদে রুশ অর্থনীতির গতি ফিরে পেয়েছে । তখন থেকে ভ্লামিদির পুতিনকে আর পিছনে তাকাতে হয়নি । চীনা পণ্যে রুশ বাজার ছেঁয়ে গেছে তেমনিভাবে বিভিন্ন প্রকল্পে বিপূল অর্থ বিনিয়োগ করেছে বেজিং । অপরদিকে উভয় দেশ সামরিক তথ্য আদান প্রদানসহ সামরিক শক্তিতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে । চীন – রাশিয়া নিয়ে দারুন টেনশনে অাছে  অামেরিকা। অনেক চেষ্টা করেও চীন-রাশিয়ার বন্ধুত্বে ফাটল ধরাতে পারেনি । কয়েকদিন পূর্বে চীন শক্তিশালী ক্ষেপনাস্ত্র মোতায়েন করে রুশ সীমান্তে । আর তাতেই ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে আমেরিকা রাশিয়ার জন্য মায়াকান্না শুরু করে । রুশ সরকারও মার্কিন চালাকী বুঝতে পেরে পাল্টা যুক্তি দেখায় যে, রুশ সীমান্তে চীনা ক্ষেপনাস্ত্র মোতায়েন করে বেজিং ভাল কাজটি করেছে । রুশ সামরিক কর্মকর্তার অনাকাঙ্খিত উক্তি মার্কিন শিবিরকে হতাশ করে । তখন থেকে চীন – রাশিয়া সম্পর্ক নিয়ে ওয়াশিংটন প্রায় নিশ্চুপ ।

 

চীন – রাশিয়ার সূ-সম্পর্ক তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মাধ্যে স্ব:স্থি বিরাজ করছে । বিশেষ করে অধিকাংশ মুসলিম দেশ মহাখুশী । উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্বের পর আমেরিকা ও বৃটেন মুসলিম দেশ ও জাতির সর্বনাশ করেছে । ফিলিস্তিন ও বসনিয়া থেকে শুরু করে সর্বশেষে সিরিয়া ও ইরাকে আইএস এর উল্থান সব কিছু আমেরিকা ও বৃটেনের সৃষ্টি । নাইন ইলেভেনে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে কথিত সন্ত্রাসী হামলার অন্তত দেড় দশক পূর্ব আমেরিকা ও বৃটেন বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশ নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করে । যার অংশ হিসেবে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার উড়িয়ে দেয়া হয় । এরপর সিরিজ অাকারে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেনসহ কয়েকটি মুসলিম দেশকে বাছাই করে  প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে সামরিক অাগ্রাসন অথবা গৃহযুদ্ব সৃষ্টি শুরু করা হয় ।  ষড়যন্ত্র এখানে থেমে নেই শেষতক আইএস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম দেশ ও জাতি ধ্বংশের নীল নকসা পরিচালিত হয় । কিন্তু সিরিয় গৃহযুদ্বে রাশিয়া ও চীনের অংশগ্রহনের সুবাদে এ যাত্রায় মার্কিনীদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ  হয় । গত তিন দশক ধরে আমেরিকার সাথে ইরানের বৈরী সম্পর্ক বিরাজ করছে । আইএসএর মাধ্যমে ইরাক ও সিরিয়া পদানত করতে পারলে শেষতক ইরান ছিল পরবর্তী টার্গেট । আপাতত মার্কিনীদের সে পরিকল্পনাও তিমিরেই থেকে গেছে । বিশ্বে ৬০ টি মুসলিম দেশের মধ্যে অন্তত ৪৮ টি  মুসলিম দেশ এখন আর আমেরিকাকে বিশ্বাস করেনা । কথায় ও কাজে অমিল থাকায় এসব দেশে মার্কিনীদের আজকাল সন্দেহের চোখে দেখছে । মুসলমানদের সবচে সর্বনাশ করেছে আমেরিকা এটা সর্বজনবিদিত । দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বৃটেন। অামেরিকা যে সব মুসলিম দেশে সামরিক অাগ্রাসন চালিয়েছে তার অন্যতম দোসর ছিল বৃটেন।  সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ, বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার এবং টনি ব্লেয়ার ছিল মুসলমানদের প্রধান দুশমন। এরা ফিলিস্তিন, বসনিয়া, অাফগানিস্থান ও ইরাকে ১৫ লাখ মুসলিম হত্যাকারী হিসেবে চিহৃিত হয়ে থাকবে। পরিতাপের বিষয় হাতেগোনা কিছু মুসলিম দেশ মার্কিনী তথা পশ্চিমাদের পক্ষে নির্লজ্জ দালালি করছে । আফগান, ইরাক, সিরিয়া ও লিবিয়ায় কেন আগ্রাসন পরিচালিত হয়েছিল কিংবা আইএস কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তাদের উদ্দেশ্য কি ছিল সেটা অাজ অার কারো অজানা নয়।

 

রুশ – চীন বন্ধুত্বের সুবাদে মার্কিনীরা এখন আর কোন দেশে সামরিক আগ্রাসন চালাতে সাহস করবেনা । বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলো অনেকটা নিরাপদ বলা চলে । তবে দূর্ভাগ্য হলে সত্য যে, উপসাগরীয় রাজা বাদশারা তাদের প্রভূ আমেরিকাকে খুশী রাখতে ব্যস্ত রয়েছে । চীন, রাশিয়া ও ইরানের বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ১৬টি শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি রয়েছে । এসব ঘাঁটির ব্যয়ভার উপসাগরীয় দেশগুলো বহন করছে । উপসাগরীয় তেল সম্পদের ৬০% আমেরিকা নিয়ে যাচ্ছে । এছাড়া সামরিক সমরাস্ত্র রফতানী ও ব্যবসা বানিজ্য খাতে মার্কিনীরা  বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে । এক কথায় উপসাগরীয় দেশগুলো হচ্ছে মার্কিনীদের ”সোনার ডিম” । আশার কথা, রুশ – চীন সীসাঢালা সম্পর্ক, সামরিক শক্তিতে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে শক্তিশালী দেশ হিসেবে আর্বিভূত, ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসএর পতন ত্বরান্বিত হওয়ায় কুয়েত সরকার নড়েচড়ে বসেছে । তারা এখন ইরানের সাথে আলোচনা তথা সম্পর্ক উন্নয়নের কথা ভাবছে । উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে যদি ইরানের সূ-সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাহলে সেটাও চীন – রাশিয়ার সূ-সম্পর্কের প্রতিফলন  । গত সাড়ে চার বছর পশ্চিমাদের জন্য সিরিয়া ছিল নিষিদ্ব । সিরিয়ায় আইএসএর পতন শুরু হলে পশ্চিমা কুটনৈতিক, সাংবাদিক ও স্বেচ্ছাসেবীরা এখন দামেস্কে যাতায়ত করছে ।

 

এতদিন মার্কিনীরা সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ছিল । ফলে সিআইএ বিশ্বজুড়ে দাবড়িয়ে ছড়ি ঘুরিয়েছে । সে ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়া ছিল মার্কিনীদের বিপরীতে অনেকটা অনগ্রসর । চীন কিংবা রাশিয়া এককভাবে মার্কিনীদের সমকক্ষ হতে বহু বছর লেগে যাবার কথা । তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মার্কিনীদের বিপরীতে অবস্থানের পাশাপাশি উভয় দেশ সামরিক শক্তি সামর্থ অর্জনের দিকে ঝুঁকছে । চীন ও রাশিয়ার সাথে ইরান, উত্তর কোরিয়া ও সিরিয়া রয়েছে । এক সময়ের মার্কিন মিত্র ফিলিপাইন চীন – রুশ বলয়ে চলে গেছে । এছাড়া মধ্য আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশ, আফ্রিকা মহাদেশের ১০ টি প্রভাবশালী দেশ, দক্ষিন পূর্ব এশিয়ার ৩/৪ টি প্রভাবশালী দেশ, ইয়েমেন, লেবাননের শক্তিশালী  হিজবুল্লাহ সংগঠন এবং হামাস চীন – রুশ বলয়ে রয়েছে । অদুর ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ মার্কিনীদের পরিত্যাগ করে চীন – রুশ বলয়ে সমবেত হলে অবাক হবার কিছু থাকবেনা । উদীয়মান শক্তি চীনের শিল্প সাম্রাজ্য , অর্থনীতি ও সামরিক অগ্রযাত্রা কয়েক দশক অব্যাহত থাকবে । ততদিনে আমেরিকা অনেক পিছিয়ে পড়বে এমনকি বেশ কিছু বন্ধু দেশ হারাবে । অপরদিকে পরাশক্তি রাশিয়াও তার অর্থনৈতিক খাতে সমৃদ্বি অর্জনের পাশাপাশি সামরিক শক্তিতে মার্কিনীদের অতিক্রম করবে ।

 

চলতি দশক চীন – রুশ জামানা শুরু হয়েছে । তবে সর্বক্ষেত্রে পরিপূর্ণতা লাভ করতে আরো বছর পাঁচেক লেগে যাবে । এসময় চীন ও রাশিয়া সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে  । ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে ইউরোপীয় মিত্ররা দ্বিধাদ্বন্ধে ভূগবে এমনকি কোন কোন ইস্যুতে সম্পর্কের টানাপোড়ন শুরু হবে । উপরে মার্কিন মিত্র কিন্তু পর্দার অন্তরালে চীন ও রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের বিকাশ ঘটাবে বেশ কিছু দেশ । এশিয়ায় মার্কিনীদের উপর আস্থা হারাবে অনেকে এমনকি ভূলক্রমেও যদি চীনের সাথে যুদ্ব বাঁধে তা হলে মার্কিন ও তার মিত্র সেনার মৃতদেহ বহনের জন্য কফিন সংকট দেখা দিবে । চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লামিদির পুতিন রাষ্ট্র পরিচালনায় বেশ বিচক্ষন । প্রচার বিমুখ, স্বল্পভাষী এবং অগাধ ধৈর্যের অধিকার উভয় প্রেসিডেন্ট প্রতিনিয়ত আমেরিকার হাড়ির খবরও রাখেন । বিশ্বব্যাপী মার্কিনীদের কিভাবে আধিপত্য রোধ করা যায় সেটাও ভাল জানেন চীন – রুশ প্রেসিডেন্ট । এক কখায় যেখানে মার্কিন স্বার্থ সেখানে রুশ – চীন আঘাত প্রত্যক্ষ করছে বিশ্ববাসী । এসব  বিষয় বিচার বিশ্লেষন করলে দেখা যায়, বিশ্বে মার্কিন শত্রুর সংখ্যা বৃদ্বি পাচ্ছে । চীন – রাশিয়ার পাশাপাশি এখন উত্তর কোরিয়া  এবং ইরানও ওয়াশিংটনকে হুমকি দিচ্ছে । এক দশকে এভাবে আরো ৪/৫ টি দেশ মার্কিনীদের হুমকি প্রদান করলে এক সময় আমেরিকা আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হবে। সুতরাং চীন – রুশ আধিপত্যের নিকট শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে ব্যর্থ প্রেমিকের ন্যায় এক সময় মার্কিনীদের মুখে শোনা যাবে “ আমার যাবার সময় হলো – দাও বিদায় “ ।

 

লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *