Main Menu

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যু : বৃহৎ শক্তিবর্গ নীরবতার কারন কি ?

 

 

আনোয়ারুল হক আনোয়ার : মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুতে বৃহৎ শক্তিবর্গের আচরণ বেশ সন্দেহজনক ।  রোহিঙ্গা মুসলমানের দূ:র্দিনে তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ইরান তাৎক্ষনিকভাবে এগিয়ে এসেছে । অপরদিকে বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশ ও ইউরোপে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে । রোহিঙ্গা ইস্যুতে কঠোর অবস্থান না দিয়ে উপসাগরীয় কতিপয় দেশ কয়েক মিলিয়ন ডলার সহায়তার ঘোষনা দিয়েছে । প্রশ্ন উঠেছে, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুতে বৃহৎ শক্তি বিশেষ করে আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ভারত, বৃটেন, জার্মানী ও ফ্রান্সসহ প্রভাবশালী দেশ নীরব কেন ? কেনইবা মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের টার্গেট করা হয়েছে?  বছরের পর বছর রোহিঙ্গাদের হত্যা ও বিতাড়ন করা হচ্ছে – তবুও বৃহৎ শক্তিবর্গের টনক নড়ছেনা কেন ? পরমানু শক্তিধর মুসলিম দেশ পাকিস্তান কিংবা প্রভাবশালী অপরাপর মুসলিম দেশ সোচ্চার হচ্ছেনা কেন ? এছাড়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কিংবা ওআইসি তামাশা দেখছে ? রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের উপর বাড়তি চাপ কেন ? মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য দূর্যোগ বয়ে আনছে কিনা ? কেউ কেউ মিয়ানমার আক্রমন করার কথা বলছে – আবার কেউ কেউ তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার সমন্বয়ে মিয়ানমারের বিরুদ্বে সামরিক শক্তি প্রয়োগের গুরুত্ব দিচ্ছে । ফলে এসব বিষয় বিশ্লেষনে সময়ের প্রয়োজন । তাই সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করছি ।

 

৭/৮ দশক পূর্বেও মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা হত্যা নির্যাতনের শিকার । তবে সেটা পাড়া মহল্লায় সীমাবদ্ব ছিল । ১৯৮০ থেকে রোহিঙ্গাদের উপর হত্যা নির্যাতন শুরু হয় । ১৯৭৭ – ৭৮ সালের দিকে সামরিক জান্তা জেনারেল নে উইন এর ইন্ধনে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নরনারী হত্যা করা হয় । ১৯৭৮ সালে সামরিক জান্তার হিংস্রতা আরো বৃদ্বি পায় । এসময় শত শত রোহিঙ্গা নরনারীর মৃতদেহ নাফ নদীতে ভাসতে থাকে । বিষয়টি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গোয়েন্দা সূত্রে অবগত হন । পরে নাফ নদীর এপাশে ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ তিনি এক ব্রিগেড সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দেন । মিয়ানমার সামরিক জান্তা জেনারেল নে উইন সেনা মোতায়েনের বিষয়টি জাতিসংঘ মহাসচিবকে অবহিত করেন । জাতিসংঘ মহাসচিব প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে টেলিফোনে সেনা মোতায়েনের বিষয়টি জানতে চান । তখন জিয়াউর রহমান বলেন, এটা রুটিন মাফিক সমাবেশ । সেনা জওয়ানরা নাফ নদীর তীরে পিকনিক করতে গিয়েছে । ঘটনার পর পরই মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রোহিঙ্গা হত্যা বন্ধে বাধ্য হয় । কথাটা এজন্য উল্লেখ করলাম যে, অনেকের প্রশ্ন, বাংলাদেশ কেন মিয়ানমার আক্রমন করেনা । সকলের জানা উচিত যে, তখনকার পরিস্থিতি আর বর্তমান পরিস্থিতি আকাশ পাতাল ফারাক । শুধু বর্তমান সরকার নয় – বরং যে কোন দল অাজ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কিছু করার নেই । আমাদের বুঝতে হবে, এটা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ বিশেষ ।

 

এবার পরাশক্তির রহস্যজনক নীরবতা প্রসঙ্গে আসা যাক :- এক সময় বার্মা তথা বর্তমান মিয়ানমার প্রায় নি:সঙ্গ ছিল । তখন চীন মিয়ানমারকে আলগে রেখেছিল । ১৯৭৭ সালের দিকে চীনা খনিজ বিজ্ঞানীরা মিয়ানমারের রাখাইনসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় তেল ও গ্যাসের বিশাল ভান্ডার আবিস্কার করেন । এরপর থেকে চীন মিয়ানমারে উপর জেঁকে বসেছে । মিয়ানমারে একটি সামুদ্রিক বন্দর নির্মাণ এবং সে দেশে চীনা নৌ-বাহিনীর অবস্থান সূ-দৃঢ় করা ছাড়াও বিভিন্ন প্রকল্পে চীন শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে । অপরদিকে বৃটেনের দুলিয়াতিতে পশ্চিমা বিশ্ব মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সাথে আপোষ রফায় উপনীত হয় । আপোষরফার সুবাদে মিয়ানমার থেকে আন্তর্জাতিক অবরোধ তুলে নেয়া হয় । উল্লেখ্য, পশ্চিমাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন এবং অবরোধ প্রত্যাহারের নেপথ্যে কাজ করেছে অং সাং সুচি । ইতিমধ্যে মার্কিন স্যাটেলাইট থেকে সংগৃহীত তথ্যে মিয়ানমারে তেল গ্যাস সম্ভবনার বিষয়টি নিশ্চিত হয় । এরমধ্যে ৩৬ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের রাখাইন রাজ্যে তেল ও গ্যাসের বিশাল মজুত খুঁজে পায় । রাখাইন রাজ্যে তেল গ্যাস প্রাপ্তির পাশাপাশি প্রদেশটি ঘিরে শত শত শিল্প কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহন করেছে বৃহৎ শক্তিবর্গ । ফলে রাখাইন রাজ্যে চীন, আমেরিকা, ভারত ও ইসরাইলী কোম্পানিগুলো হুমড়ি খেযে পড়ছে । উল্লেখ্য, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ট । সুতরাং আর্থিকভাবে লোভনীয় রাজ্যটি রোহিঙ্গাশূন্য করার পদক্ষেপ নিয়েছে বর্বর জান্তা।  মিয়ানমারের অসভ্য শাসকগোষ্ঠী এবং হিংস্র বৌদ্ব ভিক্ষু নামধারী কুলাঙ্গাররা এখন সেটাই বাস্তবায়ন করছে । আগামী ২০১৮ সালের মধ্যে রাখাইন রাজ্য মুসলিম রোহিঙ্গামুক্ত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে ।

 

যেহেতু পরাশক্তির শোন্যদৃষ্টি এখন মিয়ানমারের অফুরন্ত খনিজ সম্পদের উপর । সেহেতু মিয়ানমারের আদি বাসিন্দা রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন ও আমেরিকা নিশ্চুপ । রাশিয়ার তিনটি কোম্পানী মিয়ানমারের সাথে আলাপ আলোচনা করছে । বৃটেনের দুইটি তেল ও গ্যাস কোম্পানি অচিরেই মিয়ানমারের সাথে চুক্তিবদ্ব হবে । এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলাদেশের পাশ্ববর্তী ও অকৃত্রিম বন্ধু ভারত রোহিঙ্গা ইস্যুতে নীরব কেন?  কিংবা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মিয়ানমার সফর কেন ? উত্তর হচ্ছে, ভারতের সাথে পাক – চীনের বৈরী সম্পর্ক বিদ্যমান। নরেন্দ্র মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমেরিকাসহ পাশ্চাত্যের সাথে সূ-সম্পর্ক গড়ে তোলে । মিয়ানমারে চীনের উপস্থিতি ভারত সহজে মেনে নিতে পারছেনা উপরোন্ত ভারতের তেল গ্যাস কোম্পানী সে দেশে বিপূল অর্থ বিনিয়োগ করেছে । চীন ও পাকিস্তানের প্রভাব ঠেকাতে মিয়ানমারে পশ্চিমা এবং ভারতীয় লবিং সক্রিয় রয়েছে । অপরদিকে চীন, রাশিয়া, ইসরাইল, উত্তর কোরিয়া ও ভারত মিয়ানমারে সমরাস্ত্র রফতানী করছে । পরমানু শক্তিধর একমাত্র মুসলিম দেশ পাকিস্তান পরিচালিত হচ্ছে চীনা দিক নির্দেশনায় । সুতরাং রোহিঙ্গা ইস্যুতে পাকিস্তান থেকে জোরালো কিছু আশা করা যায়না । মধ্যপ্রাচ্যসহ শক্তিশালী মুসলিম দেশ নীরব কেন ? মধ্যপ্রাচ্যের তেল গ্যাস সমৃদ্ব মুসলিম দেশগুলোর বেশীরভাগ পাশ্চাত্য নির্ভর । ফলে মেরুদ্বন্ডহীন শাসকরা পাশ্চাত্যকে সর্বদা খুশী রাখতে এক পায়ে অবস্থান করছে।

 

একটা জনপ্রিয় প্রবাদ হচ্ছে, সারাদিন গুনিয়া দেখি – সন্ধা হলে পাঁচ । অর্থাৎ যাহা লাউ – ঘুরেফিরে তাহাই কদু । রোহিঙ্গা ইস্যুতে অমুসলিম দেশগুলোর অবস্থা এমনই । মোদ্দাকথা, মুসলমানদের দূর্ভোগ মুসলমানররা ঐক্যবদ্ব হয়ে মোকাবেলা করতে হবে । এখানে অন্য কোন শক্তি এগিয়ে আসার কোন সম্ভাবনা নেই বললে চলে । মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যু গোটা মুসলিম জাতির বিবেককে সজোরে আঘাত হানছে । তথাপি লোভ লালসা ও ভোগ বিলাসে নিমজ্জিত রয়েছে অধিকাংশ মুসলিম শাসক । এখানে একটা কথা বলে রাখা প্রয়োজন – রোহিঙ্গা ইস্যু তথা লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরনার্থীর বাড়তি চাপ বাংলাদেশকে এককভাবে বহন করতে হচ্ছে । এছাড়া মিয়ানমারে অফুরন্ত তেল গাস আবিস্কার, বৃহৎ শক্তিবর্গের অানাগোনা, সামরিক শক্তির মহড়া এবং রোহিঙ্গা শরনার্থী কেন্দ্র করে আগামীতে বাংলাদেশ হুমকির সন্মুর্খীন হবার অাশংকা করছি । এমনিতেই পার্বত্য চট্রগ্রামে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৎপর রয়েছে । এসব সন্ত্রাসীকে মদদ দিচ্ছে মিয়ানমারসহ কতিপয় দেশ । সুতরাং বর্তমান সরকারকে ধৈর্য্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে । অপরদিকে বিশ্বে যতদিন মুসলমানরা আগোছালো থাকবে – তাতে করে তাদের দূর্ভেোগ আরো বৃদ্বি পাবে । এতে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নাই ।

 

লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার এবং আন্তর্জাাতিক বিশ্লেষক।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *