Main Menu

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস|| ডঃ অাবুল কালাম অাজাদ হত্যা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা থানার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের ছেলে আজাদ ছাত্রজীবনে বরাবরই অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত গণিতে রেকর্ড ভাঙ্গা নম্বর নিয়ে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে স্বর্ণপদক পান। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আজাদ ফ্লাইং অফিসারের পদমর্যাদা নিয়ে অধ্যাপক হিসেবে তৎকালীন পাকিস্তান বিমান বাহিনী একাডেমীতে যোগ দেন।

সেখান থেকে প্রশিক্ষণের জন্য তাঁকে যুক্তরাজ্যে পাঠানো হয়। বিমান বাহিনীতে তাঁর মেধা এবং কৃতিত্ব অবাঙ্গালীরা ভালো চোখে দেখেনি। এজন্যে তাঁর চাকুরির মেয়াদ তারা হঠাৎ শেষ করে দেয়। নিরুপায় হয়ে তিনি তখন ঢাকায় পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সভাপতির কাছে চাকুরীর সন্ধান চেয়ে চিঠি লেখেন। চিঠির উত্তরে তিনি সাক্ষাৎকারের সুযোগ পান এবং পরে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারী মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন।

একসময় তিনি জগন্নাথ মহাবিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যক্ষ ছিলেন। সেখান থেকে তিনি গণিত শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ হিসেবে উন্নয়ন বিজ্ঞান ও কারিগরি বিদ্যা শিক্ষন কেন্দ্রে (আই, এ, এস, টি, টি) যান। সেখানে তিনি বৎসর খানেক ছিলেন। অধ্যাপনা জীবনে আজাদ বৃত্তি নিয়ে আর একবার যুক্তরাজ্যে যান। এবার তিনি ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী, মেঘবিজ্ঞানে ডক্টরেট এবং তরল পদার্থ সম্পর্কিত বলবিজ্ঞানে ডিপ্লোমা নেন।

এছাড়া গণিতশাস্ত্রে পাণ্ডিত্যের জন্যে তিনি লন্ডনের রাজকীয় আবহাওয়া বিজ্ঞান সমিতি, যুক্তরাজ্যের ফলিত গণিত সমিতি এবং বোস্টনের আবহাওয়া বিজ্ঞান সমিতির ফেলো নির্বাচিত হন। ম্যানচেস্টারে তিনি কিছু দিন সার্বক্ষণিক অধ্যাপক ছিলেন। সার্বক্ষণিক এবং স্থায়ী অধ্যাপকের পদও তাঁকে দেয়া হয়। কিন্তু মা, ভাইবোনদের কথা ভেবে তিনি ফিরে আসেন।

অস্বাভাবিক পরিস্থিতির দরুন যুদ্ধের আগে কয়েকদিন আজাদের সাথে আমি যোগাযোগ করতে পারিনি। হঠাৎ তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর পেলাম ১৭ই ডিসেম্বর। আমি সেদিন পাড়ার মুক্তি যোদ্ধাদের সম্বর্ধনার আয়োজনে ব্যস্ত।

কাজের চাপে সেদিন আজাদের বাসায় যেতে পারিনি, শুধু মুক্তিবাহিনীর কাছে আজাদের সন্ধানের জন্য অনুরোধ জানিয়েছি। পরদিন তার বাসায় যাওয়ার উপক্রম করছি, তখনই এলো সেই শেষ খবর। আজাদ ফিরেছেন। কিন্তু নিষ্প্রাণ, ক্ষতবিক্ষত দেহে, রায়েরবাজারের বধ্যভূমি থেকে। খবরটি শোনামাত্র আমার স্ত্রী কাঁদতে শুরু করেছিলেন।

তাঁকে নিয়ে কোনক্রমে আজিমপুরের দায়রা শরীফের দিকে ছুটছিলাম। আজাদের বাসা দরগার ভেতরে। সেই দরগার মর্যাদাহানি করে বদর বাহিনীর পাঁচটি খুনী ১৫ই ডিসেম্বর সকালে তাদের বাসায় ঢুকে পড়ে। প্রথমে তারা আজাদের সামনে রিভলবার ধরে তাঁকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে অকারণ তল্লাসী চালায়।

তারপর নিরপরাধ আজাদকে বাসি মুখে ধরে নিয়ে যায়। ছোট বোনটি তখন তাদের পায়ে ধরেছিল। মা, বার বার তাদের বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, বাবা তোমরা বাঙ্গালী, তোমরাও আমার ছেলে, ওকে তোমরা ছেড়ে দাও। কিন্তু কেউ তাঁর কথা শোনেনি, নরপশুরা এই নারীকে প্রতিবারই প্রচণ্ড ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে।

সেদিন তিন ঘণ্টার জন্য সান্ধ্য আইন উঠে যায়। তখন আজাদের ছোট ভাই ‘ইভনিং পোস্ট’ –এর সম্পাদক হাবিবুল বাশার, বড় ভগ্নিপতি ইস্টার্ন নিউজ এজেন্সির মালিক গোলাম রসুল আজাদের সন্ধান নেওয়ার জন্যে নানাভাবে চেষ্টা করেন। কিন্তু কোন ফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত তাঁকে পাওয়া গেল ১৭ই ডিসেম্বর বিকেলে, ডঃ রাব্বি সহ আরো কয়েকজন জ্ঞানীগুণীর লাশের পাশে।

-আতোয়ার রহমান
দৈনিক বাংলা, ৭ই জানুয়ারী, ১৯৭২
.
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র ৮ম খণ্ড ৫০৮-৫০৯ নং পৃষ্ঠা থেকে বলছি
শিরোনামঃ হানাদার বাহিনীর সহযোগী আল-বদরদের হত্যার শিকার কয়েকজন
সূত্রঃ ১৯৭৩ সালের জাতীয় দিবসে সাপ্তাহিক বিচিত্রার বিশেষ সংখ্যা
সংগ্রহীত ছবিঃ শহীদ বুদ্ধিজীবী ডঃ আবুল কালাম আজাদ ।
.

.






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *