Main Menu

সোনাগাজীতে শিক্ষক কামরুলের প্রচেষ্টায় পাল্টে গিয়েছে স্কুলের দৃশ্যপট!

 

মুঃ ইব্রাহিম আল সোহাগ>>

শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করে নেয়া দরকার, শিক্ষকতা কোনো পেশা নয়; এটা ব্রত। শিক্ষকতার প্রতি যদি আপনার ভালোবাসা না থাকে, তাহলে সেটি আপনার নিকট পেশা ছাড়া আর কিছুই নয়। সবাই ভালো ছাত্র হয় না, তবে সবাই ভালো মানুষ হতে পারে’- শিক্ষার লক্ষ্য হলো ভালো মানুষ তৈরি করা। আর মানুষ (ভালো মানুষ) গড়ার মূল দায়িত্ব শিক্ষকগণের উপর ন্যস্ত। যিনি শিক্ষক তিনি সর্বস্থানেই একজন শিক্ষক- এ কথাটা স্মরণ রাখা দরকার। শিক্ষককে অবশ্যই একজন আদর্শ শিক্ষক হতে হবে।

 

কামরুল ইসলাম একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষুদ্র শিক্ষক। অবশ্যয় ক্ষুদ্র বলা এই অর্থে যে- আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ছোট শিক্ষক বা প্রাধান্য কম দিয়ে থাকি। তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও নিজের পেশা কে তিনি পেশা মনে করেননি কখনো। স্কুল কে ভালবেসে, স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের ভালবেসে প্রতিনিয়ত শ্রম দিয়ে যাচ্ছে স্কুলের কাজে। তার কাছে নিজের ব্যক্তিগত কাজ থেকেও স্কুলের কাজটায় বেশি প্রাধান্য পেয়ে থাকে। স্কুলের কাজ ছাড়া ব্যক্তিগত কাজে কখনো তিনি সময় নষ্ট করেন না। তাছাড়া স্কুলের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি বাড়িও ফিরেন না।

প্রতিদিন যথাসময়ে স্কুলে এসে, স্কুলের চারদিকের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ দেখে নেন। এরপর স্কুলের পরিষ্কারের কাজ করেন ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে। অনেক সময় নিজ হাতে ঝাড়ু নিয়ে স্কুল পরিষ্কার করতেও দেখা যায় তাকে। এর পর শুরু হয় স্কুলের সকাল বেলার ছোট ছেলেমেয়েদের পাঠদান। ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের তিনি অনেক আদর করে শ্রেনি কক্ষে পাঠদান করিয়ে থাকেন। যেখানে শিক্ষকদের দেখলে ছাত্রছাত্রীরা ভয় পেয়ে থাকে, সেখানে উনার কোলে চড়েও পাঠদান করতে দেখা যায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের। এ যেন শিক্ষক নয়, বাবার কাছে ছেলে মেয়েরা পড়ালেখা শিখছে।

 

দেখা যায়- প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি ৭০% এর বেশি থাকেনা। কিন্তু উনার একান্ত প্রচেষ্টায় এস্কুলে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতির সংখ্যা ৯০-৯৫%। এর কারণ জানতে গিয়ে দেখা যায়- যেসব ছাত্রছাত্রী এক বা দুই দিনের বেশি সময় স্কুলে অনুপস্থিত, ঐসব ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকদের তিনি স্কুলে ডেকে ছাত্রছাত্রীর স্কুলে অনুপস্থিতির কারণ জানতে চান অথবা স্কুলে অনুপস্থিত ছাত্রছাত্রীদের বাড়িতে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের স্কুলে ফিরিয়ে আনেন। ছাত্রছাত্রীদের তিনি যেমন ভালবাসেন তেমন শাসনও করেন। ছাত্রছাত্রীরা রাতে বাড়িতে পড়ালেখা করছে কিনা তা দেখতে রাতের আধারে উপস্থিত হয়ে যান ছাত্রছাত্রীদের বাড়িতে। তাছাড়া গরিব মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের নিজের টাকায় খাতা কলম দিয়ে ও প্রাইভেট পড়িয়ে থাকেন।

 

স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের তিনি শুধু পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। পাঠদানের পাশাপাশি তিনি ছাত্রছাত্রীদের নাচ-গান, খেলাধুলা, ছড়া-কবিতা, কৌতুক, শরীর চর্চার শিক্ষা দিয়ে থাকেন। তাছাড়া তিনি ছোট ছেলেমেয়েদের স্কুলে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ও পায়খানা থেকে ফিরে সাবান ব্যবহার, পরিষ্কারপরিচ্ছন্নতা, নিয়মানুবর্তিতা এবং সদা সত্য কথা বলার শিক্ষা দিয়ে থাকেন।

 

স্কুলের ফলাফলের কথা বলতে গেলে দেখা যায়- শতভাগ পাশের রেকর্ড রয়েছে এই স্কুলে। কামরুল ইসলাম যোগদানের পর থেকে স্কুলের পুরো চিত্রই যেন পাল্টে যায়। উনার একান্ত প্রচেষ্টায় এই স্কুল থেকে ছাত্রছাত্রীরা বৃত্তি লাভ করছে। পিএসসিতে জিপিএ-৫ তো প্রতি বছরই পেয়ে থাকে এই স্কুল। পরিক্ষীর্থীদের তিনি রাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়ানো ও স্কুলে এনে স্পেশাল ভাবে তাদের কেয়ার করার ফলে স্কুলের ফলাফল যেন পাল্টে গিয়েছে। স্কুলের এত ভাল ফলাফলে অভিভাবক সহ এলাকার লোকজনের মুখে শুনা যায় কামরুলের প্রচেষ্টার অপরুপ প্রশংসা।

 

সোনাগাজী উপজেলার ৬নং চর চান্দিয়া ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের জমাদার বাজারে অবস্থিত উত্তর পশ্চিম চর চান্দিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কামরুল ইসলাম। তিনি দীর্ঘদিন এই স্কুলে সহকারি শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। কিন্তু কয়েক বছর ধরে স্কুলের প্রধান শিক্ষক পদ খালি থাকায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন সততা ও নিষ্ঠার সাথে। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন স্কুলের অন্যান্য শিক্ষকদের সাথেও। অন্যান্য শিক্ষকরা মহা খুশি উনার আচার ব্যবহার ও স্কুলের প্রতি ভালবাসা দেখে। সহকর্মীদের সাথে এত বেশি সক্ষতা খুব বেশি চোখে পড়েনা।

 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়- মরহুম স্কুল শিক্ষক মৌলভী নুর ইসলামের ছেলে কামরুল ইসলাম। মৌলভী নুর ইসলাম ও এক সময় এই স্কুলে শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর শিক্ষকতার আদর্শ নিয়ে এগিয়ে চলছে মাষ্টার কামরুল ইসলাম। কামরুলের স্কুলের প্রতি এইরকম ভালবাসা গ্রামের প্রতিটি লোকের জানা। স্কুল ও ছাত্রছাত্রীদের প্রতি এই রকম উদার মন মানসিকতার প্রশংসা করেন সমাজের প্রতিটি মানুষ। সবার একটায় কথা যদি দেশের প্রতিটি শিক্ষক উনার মত করে স্কুল ও ছাত্রছাত্রীদের প্রতি আন্তরিক হত, তাহলে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আরো গতিশীল হত।

 

 

 

 






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *