শেখ কামালের ব্যাংক ডাকাতির অপবাদ : নেপথ্যে জাসদ ও গণকণ্ঠের প্রতিঘাত 

 

গোলাম মাওলা রনি>>

ঘটনাটি শুনেছিলাম বিএনপির এক নেতার কাছে। যিনি ছিলেন বিএনপির সাবেক মন্ত্রী এবং একই সঙ্গে শেখ কামালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।  শেখ কামাল মানে জাতির জনকের জ্যেষ্ঠ পুত্র। বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক এবং আবাহনী ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা। ছিলেন প্রচন্ড বন্ধুবৎসল এবং সব সময়ই বন্ধুদের মধ্যমণি হয়ে থাকতেন। জাতির জনকের পুত্র কিংবা প্রধানমন্ত্রীর পুত্র হিসেবে তথাকথিত ইগো কখনোই তাঁর ছিল না। বরং অসাধারণ একটি সারল্য তাঁকে বন্ধুদের কাছে সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ বা ব্যবসা-বাণিজ্যের পার্থিব ভেদবুদ্ধি কিংবা কূটকৌশল কখনোই তাঁর ছিল না। কিন্তু ইতিহাসের কুখ্যাত কতিপয় চক্রান্তকারীর সীমাহীন ছলনাময় চক্রান্তের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক ডাকাতির অপবাদ রটানো হয়েছিল এবং তা এখনো ক্ষেত্রবিশেষে বার বার বঙ্গবন্ধু পরিবারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়।

 

আসলে সেদিন কী ঘটেছিল? প্রত্যক্ষদর্শী সেই বিএনপি নেতা যিনি কিনা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, তাঁর বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে উঠেছিল প্রেক্ষাপটটি। শেখ কামাল সেদিন আড্ডা দিচ্ছিলেন কয়েক বন্ধুকে নিয়ে। রাত তখন আনুমানিক ৯টা কি সাড়ে ৯টা। আজকের বেক্সিমকো গ্রুপের অন্যতম কর্ণধার সালমান এফ রহমান যিনি কিনা শেখ কামালের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, ফোন করলেন হঠাৎ করেই। অর্থাৎ সেই রাতে। জানালেন নতুন একটি ভক্স ওয়াগন কোম্পানির মাইক্রোবাস কিনেছেন। টেলিফোনের এ প্রান্তে শেখ কামাল খুশিতে লাফ দিয়ে উঠলেন এবং সালমান রহমানকে অনুরোধ করলেন গাড়িটি একটু পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। উদ্দেশ্য নতুন গাড়িতে চড়ে ঢাকা শহরটি একটু চক্কর দেওয়া। অনুরোধমতে গাড়িটি এল রাত আনুমানিক ১০টার দিকে। উপস্থিত বন্ধুরা শেখ কামালকে প্রস্তাব করলেন পুরান ঢাকার চিনুর বিরিয়ানির দোকানে গিয়ে বিরিয়ানি খাওয়ানোর জন্য। যেই কথা সেই কাজ, শেখ কামাল আরও দু-তিন বন্ধুকে ফোন করলেন এবং ফোন করলেন বিএনপির এই নেতাকেও। তিনি প্রথমে অস্বীকার করলেন। কিন্তু নতুন ভক্স ওয়াগন গাড়িতে চড়া এবং চিনুর বিরিয়ানির লোভ সামলাতে পারলেন না। বললেন যাওয়ার সময় এলিফ্যান্ট রোডে তাঁর বাসার সামনে থেকে তাঁকে তুলে নেওয়ার জন্য।

 

রাত সাড়ে ১০টায় এলিফ্যান্ট রোড থেকে তাঁকে তুলে শেখ কামাল ও তাঁর বন্ধুরা কাকরাইল, জোনাকী সিনেমার সামনের রোড দিয়ে ফকিরেরপুল হয়ে গুলিস্তান এবং   গুলিস্তান হয়ে বংশাল যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। অর্থাৎ রাতের নিরিবিলি ঢাকায় নতুন গাড়িতে চড়ার আনন্দ উপভোগ। এভাবেই তাঁরা কাকরাইল মোড় পর্যন্ত এগোলেন। বিপত্তি বাধল মোড় পার হওয়ার পরই। এই বিপত্তি নিয়ে কিছু বলার আগে তৎকালীন রাজনীতি নিয়ে সংক্ষিপ্ত কিছু না বললেই নয়।

 

বঙ্গবন্ধু সরকারকে সমূলে বিনাশ করার জন্য যেসব দেশি-বিদেশি প্রবল প্রতিপক্ষ কাজ করছিল তাদের মধ্যে মরহুম সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি বা নকশালেরা অন্যতম। এরা মূলত আন্ডারওয়ার্ল্ডে থেকে অপতৎপরতা চালাত। তখনকার নকশালীদের গুম, হত্যা, ডাকাতির বীভৎস রূপ এবং অস্ত্রের ঝনঝনানি সারা দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। অন্যদিকে জাসদ নামক রাজনৈতিক দলটির গণবাহিনীর তৎপরতা ছিল আরও ভয়াবহ। তারা রাজনীতি করত জাসদের নামে, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাত ‘গণবাহিনী’র নামে এবং অপপ্রচার চালাত ‘গণকণ্ঠ’ নামে তাদের মালিকানায় প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকার মাধ্যমে। আজকের মাননীয় মন্ত্রী জনাব হাসানুল হক ইনু, মহাজোটের এমপি মঈনউদ্দিন খান বাদল প্রমুখ ছিলেন জাসদ গণবাহিনীর লিডার, যাদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি সমূলে বিনাশ করা।

 

জাসদ গণবাহিনীর অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা সন্ধ্যার পর ঢাকার অলিগলিতে বের হয়ে পড়ত এবং খুন, রাহাজানি, ডাকাতি, অপহরণের মাধ্যমে সরকারকে অচল করার চেষ্টা চালাত। সরকারও সর্বশক্তি দিয়ে এদের দমনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। রক্ষীবাহিনী ও পুলিশের বিশেষ টিম সারা রাত গণবাহিনীর গুন্ডাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চালাত। বীর মুক্তিযোদ্ধা এসপি মাহবুব উদ্দিন আহমদ তখন পুলিশের কয়েকটি টিম পরিচালনা করতেন। গণবাহিনী এবং নকশালদের দমন করার জন্য এসপি মাহবুবের টিমগুলোর আবার পরিচিতি হতো টিম লিডারের নামানুসারে, একটি টিমের নাম ছিল ‘কিবরিয়া বাহিনী’। আমরা যে রাতের কথা বলছি সেই রাতে কাকরাইল পল্টন এলাকায় টহলের দায়িত্বে ছিল এই কিবরিয়া বাহিনী। তারা সাদা পোশাকে সশস্ত্র অবস্থায় প্রাইভেট গাড়িতে ঘুরত মূলত গণবাহিনী বা নকশালীদের ধরার জন্য। সন্দেহভাজন কাউকে দেখলেই চ্যালেঞ্জ করত এবং ক্ষেত্রবিশেষে গুলি চালাত।

 

শেখ কামাল ও তাঁর বন্ধুরা যখন কাকরাইল মোড় পার হলেন তখন সামনে একটি প্রাইভেট কারে কয়েকজন সশস্ত্র লোককে দেখতে পেলেন। তাঁরা মনে করলেন প্রাইভেট কারটি হয়তো গণবাহিনীর গুন্ডাদের বা নকশালীদের। মাইক্রোবাসটি প্রাইভেট কারের চেয়ে উঁচু এবং উজ্জ্বল হেড লাইটের কারণে শেখ কামাল ও তাঁর বন্ধুরা গাড়ির আরোহীদের দেখতে পাচ্ছিলেন। অন্যদিকে গাড়ির আরোহী সাদা পোশাকধারী পুলিশের কথিত কিবরিয়া বাহিনীর সদস্যরা মাইক্রোবাসের উচ্চতার কারণে ভেতরের আরোহীদের দেখতে পাচ্ছিলেন না। কাকরাইল মোড় পার হয়ে শেখ কামালদের গাড়ি যখন নাইটিঙ্গেল রেস্তোরাঁ অতিক্রম করছিল তখন তাঁদের তারুণ্যময় অ্যাডভেঞ্চারে পেয়ে বসল। তাঁরা মনে করলেন সামনের গাড়িটি গণবাহিনী বা নকশালীদের। ভুলে গেলেন চিনুর বিরিয়ানির কথা। ভাবলেন কোনোমতে যদি ওই সন্ত্রাসীদের ধরা যায় তাহলে সারা দেশে হয়তো একটি ধন্য ধন্য রব পড়ে যাবে।

 

তাঁরা গাড়িটি ধাওয়া করলেন। রাত তখন ১১টা। অন্যদিকে প্রাইভেট কারে বসা কিবরিয়া বাহিনীর সদস্যরা মাইক্রোবাসের আরোহীদের মনে করলেন গণবাহিনীর সন্ত্রাসী। পুলিশের গাড়ি হঠাৎ মতিঝিল থানার মধ্যে ঢুকে পড়ল। তাঁদের অনুসরণ করে শেখ কামাল ও তাঁর বন্ধুরাও মতিঝিল থানা কম্পাউন্ডে ঢুকে পড়লেন। এরপর পুলিশ সদস্যরা গাড়ি থেকে নেমে এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে লাগলেন মাইক্রোবাসে বসা শেখ কামাল ও তাঁর বন্ধুদের ওপর। সবাই মারাত্মক জখম হলেন কেবল বিএনপির এই নেতাটি ছাড়া। এরই মধ্যে পুলিশ বাহিনী যখন বুঝতে পারল আসল ঘটনা তখন আহতদের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো।

 

বঙ্গবন্ধু পরিবার তখন জানে না ঘটনা সম্পর্কে। রাত আনুমানিক ৩টার দিকে বিএনপি নেতাটি ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবনে ঢুকে শেখ জামালকে খবরটি দিয়ে পুনরায় ঢাকা মেডিকেলে চলে এলেন।পর দিন দুপুরে বঙ্গবন্ধু ডেকে পাঠালেন বিএনপির নেতাটিকে। তিনি যখন পৌঁছালেন তখন বঙ্গবন্ধু খাচ্ছিলেন। আজকের প্রধানমন্ত্রী খাবার টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে জাতির পিতাকে খাওয়াচ্ছিলেন। ছেলের বন্ধুর দিকে তাকিয়ে তিনি হুঙ্কার ছাড়লেন-ভদ্রলোকের ছেলেরা কি রাত ১১টার সময় বাইরে বের হয়। ব্যস! আর যায় কোথায়! শেখ কামালের বন্ধুটি ভয়ে থরথর করে কাঁপতে শুরু করলেন। বঙ্গবন্ধু লক্ষ করলেন তাঁর ছেলের বন্ধুর মানসিক অবস্থা। আর কিছু বললেন না। শুধু হুকুম করলেন- এই বস, হাসু ওকে ভাত দে। ওই দিনের খাবারের মেনু ছিল শাক, ডাল আর কৈ মাছ। নেতাটি ভীতসন্ত্রস্ত এবং বিহ্বল হয়ে খাওয়া শুরু করলেন। কিন্তু গিলতে পারছিলেন না। বঙ্গবন্ধু লক্ষ্য করলেন এবং আজকের প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে বললেন- হাসু, ও তো শুধু শাক খাচ্ছে। মাছ খাচ্ছে না। ওকে মাছ খেতে বল। জননেত্রী শেখ হাসিনা জানতেন যে তাঁর ভাইয়ের এই বন্ধুটি মাছের কাঁটা বেছে খেতে পারেন না। তাই তিনি উত্তর করলেন ঠিক আছে, আমি ওর মাছের কাঁটা বেছে দিচ্ছি।

 

এবার আমার কান্নার প্রসঙ্গে বলি। এই কাহিনী শোনার পর আমার মনে পড়ছিল আমার কলেজপড়ুয়া ছেলে এবং তার বন্ধুদের কথা। পিতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু যে উদারতা ও বিশাল মনের অধিকারী ছিলেন আমি কি তার ধারে কাছেও কোনো দিন যেতে পারব? অবশ্যই না। অন্যদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কী অপরিসীম মমতায় তাঁর ভাই এবং তাঁর বন্ধুদের ভালোবাসতেন, তা একবিংশ শতাব্দীর পাষাণহৃদয় কল্পনাও করতে পারবে না। শেখ কামালের স্মৃতি কি তাঁকে এখনো কাঁদায় কিংবা শেখ কামালের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে যখন তিনি তাঁর মৃত ভাইয়ের ছবি খুঁজে ফেরেন তখন তাঁর আহত মন কেমন করে! কিংবা শেখ কামালের সেই বন্ধুদের কেউ কেউ যখন তাদের হাসু আপাকে সমালোচনা করেন তখন তাঁর কেমন লাগে! যা হোক, এর পর দিন জাসদের রাজনৈতিক মুখপত্র দৈনিক গণকণ্ঠ ফলাও করে ব্যানার হেড সংবাদ প্রচার করল যে, শেখ কামাল সদলবলে বাংলাদেশ ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়েছিল এবং পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে হাসপাতালে। অস্থির বাঙালিরা কোনো বাছবিচার না করেই প্রোপাগান্ডায় গা ভাসাল এবং এখনো ভাসাচ্ছে।

 

মহামতি আলেকজান্ডার তার সেনাপতি সেলুকাসকে বলেছিলেন- বড়ই বিচিত্র এই দেশ! তাই না সেলুকাস? আজকের এই দিনে আমরা যাদের সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্য করে মন্ত্রী-এমপি বানাচ্ছি- এ দৃশ্য দেখলে নিশ্চয়ই আলেকজান্ডার বাকরুদ্ধ হয়ে পড়তেন। এমনকি জ্ঞান হারানোর সম্ভাবনাও ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *