ঢাকা : রাজনীতিতে নতুন ধারা ও অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি সম্বলিত রূপকল্প তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলেনে এসেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আজ বুধবার বিকাল ৪ টা ৫৫ মিনিটে রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে সংবাদ সম্মেলন শুরু হয়।
এতে ‘ভিশন-২০৩০’ নামের এ রূপকল্পে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, বিরোধী দল থেকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও ডেপুটি স্পিকার পদ, ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা, মাথাপিছু আয় পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার, প্রবৃদ্ধি দুই অংকে নেয়া, দেশীয় বিনিয়োগে নানা সুযোগ-সুবিধাসহ আড়াই শতাধিক দফা তুলে ধরছেন বিএনপি চেয়ারপারসন।
এছাড়া বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও বন্দি অবস্থায় অমানবিক নির্যাতনের অবসান ঘটানো, আটক অবস্থায় মৃত্যুর তদন্ত, উচ্চআদালতে বিচারক নিয়োগে আইন, ন্যায়পাল গঠন, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা ও তদারকি বাড়ানো, বিদেশে অর্থ পাচার বন্ধ, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা, প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরানো, পুলিশের এএসআই ও কনস্টেবলদের ওভারটাইম ও রেশনের মাধ্যমে খাদ্যপণ্য দেয়ার পাশাপাশি সমমূল্যের অর্থ দেয়াসহ সার্বিক সুবিধা দেয়ার বিষয়গুলো ভিশন ২০৩০ এ থাকছে।
জানা গেছে, আগামীতে ক্ষমতায় গেলে বিএনপি কী কী করবে, তার একটি দলীয় কর্মপরিকল্পনা নিয়েই তৈরি করা হয়েছে এ ভিশন। এর আগে, গত সোমবার রাতে ও মঙ্গলবার দুপুরে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে খসড়া চুলচেরা বিশ্লেষণ করে এ ভিশন চূড়ান্ত করা হয়।
আসুন দেখে নেওয়া যাক বিএনপির রুপকল্প ভিশন-২০৩০ এর কয়েকটি চুম্বক অংশ:
সংবাদ সম্মেলনে ভিশন-২০৩০ এর ঘোষণার শুরুতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘বিএনপি গণভোট ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার করবে। জাতীয় সংসদকে সকল জাতীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা হবে। জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কিত বিষয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হবে।’
১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর সংবিধান সংশোধন করে বিএনপি যে ধারা চালু করেছিল, সেই ব্যবস্থাই এখন ‘স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসনের’ জন্ম দিয়েছে বলে জানিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘তার দল ক্ষমতায় গেলে এই সংবিধান সংশোধন করে ক্ষমতায় ভারসাম্য আনবে।’
তিনি বলেন, ‘ আওয়ামী লীগের ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর সংবিধানের পঞ্চদশ ও ষষ্ঠদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোট ব্যবস্থা বাতিল, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, সংসদ বহাল রেখে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান প্রবর্তন, সংবিধানের কিছু নির্ধারিত বিষয় সংযোজন, পরিবর্তন, রহিতকরণ, কিংবা অন্য কোনও পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য করার বিধান প্রবর্তন, উচ্চ আদালতের বিচারকদের অভিশংসনের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের ওপর ন্যস্তকরণের বিধানসহ কয়েকটি অগণতান্ত্রিক বিধান প্রণয়ন করেছে। বিএনপি এসব বিতর্কিত অগণতান্ত্রিক বিধান পর্যযালোচনা ও পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার করবে।’
সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া বলেন, ‘বিএনপি মুক্তযুদ্ধের মূলমন্ত্র বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে জাতিকে পৌঁছাতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণ স্বপ্ন দেখেছিল। সেই স্বপ্ন ছিল ন্যয় বিচার, মানবিক মর্যাদা ও সাম্যের। জনগণের এই স্বপ্ন আজও সফল হয়নি। স্বৈরশাসন ও দুঃশাসনের যাতাকলে স্বপ্নগুলো চুরমার হয়ে গেছে। আজ আমাদের সকলকে সম্মিলিতভাবে সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য নতুন করে শপথ নিতে হবে।
খালেদা জিয়া বলেন, ‘গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নয়ন শ্রেয় এই ধারণা নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করার অপচেষ্টা বিএনপি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিহত করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি জণগণের হাতেই রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দিতে চায়। আমরা ওয়ান ডে ডেমোক্রেসিতে বিশ্বাসী নই। জনগণের ক্ষমতাকে কেবল ভোট দেওয়ার দিনে আবদ্ধ রাখতে চাই না।’
ভারতীয় সংসদীয় পদ্ধতির আদলে বাংলাদেশের সংসদে উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। একে তিনি বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থা সংস্কারের অংশ বলছেন।
সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্তও পর্যালোচনার ঘোষণা দেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর সংবিধানের পঞ্চদশ ও ষষ্ঠদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোট ব্যবস্থা বাতিল, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, সংসদ বহাল রেখে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান প্রবর্তন, সংবিধানের কিছু বিষয় সংশোধন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ এবং সংবিধানের কতিপয় ধারা, উপধারা সংশোধনের অযোগ্য করার বিধান প্রবর্তন, উচ্চ আদালতের বিচারকদের অভিসংশনের ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্তকরণের বিধানসহ কয়েকটি অগণতান্ত্রিক বিধান প্রণয়ন করে। বিএনপি এসব বিতর্কিত ও অগণতান্ত্রিক বিষয়াবলী পর্যালোচনা ও পুনঃপরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার করবে।’
খালেদা আরও বলেন, ‘জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কিত বিষয়ে বিরোধী দল সমূহের সাথে আলোচনা করা হবে। পাবলিক একাউন্টস কমিটি ও পাবলিক আন্ডারটেকিং কমিটির সভাপতিত্ব বিরোধী দলের সদস্যদের ওপর অর্পণ করা হবে।’
তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিল করা হবে বলে মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘বিএনপি গ্রহণযোগ্য সমালোচনাকে সমর্থন করে। ক্ষমতায় গেলে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল করা হবে।’
এছাড়াও খালেদা জিয়া সাংবাদিকদের উপর হয়রানিমূলক বিভিন্ন আইন বাতিল করা হবে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি এ বিষয়ে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা হবে বলে জানান খালেদা।
বিতর্কিত ৫৭ ধারা আইনটি বাতিল করে নতুন আইন করার কথা এর আগে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও জানিয়েছেন। এছাড়া সাগর-রুনিসহ সব সাংবাদিক হত্যার বিচার করা হবেও বলে জানান তিনি।
বিএনপির রূপকল্প ‘ভিশন-২০৩০’ এর পূর্ণাঙ্গ বিবরণী জানতে এখানে ক্লিক করুন ।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, তরিকুল ইসরাম, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, লে. জে. (অব). মাহবুবুর রহমান, এম কে আনোয়ার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, ড. আবদুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
উপদেষ্টাদের মধ্যে আমান উল্লাহ আমান, আতাউর রহমান ঢালী, ড. সুকোমল বড়ুয়া, অধ্যাপক তাজমেরী ইসলাম, এ জেড মোহাম্মদ আলী, হাবিবুর রহমান হাবিব, জয়নাল আবেদীন ফারুক, আবুল খায়েল ভূইয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
অপরদিকে, অা’লীগের সাধারন সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপির রূপকল্প ধার করা, এটি জাতির সাথে প্রতারণা:
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০- অন্য দলের কাছ থেকে ধার করে নেয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। আজ বুধবার সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
এসময় তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার এই ভিশন-২০৩০ একটি ফাঁকা প্রতিশ্রুতির ফাপাঁনো রঙিন বেলুন; এই বেলুন অচিরেই চুপসে যাবে। জাতির সাথে একটি তামাশা ও প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।
তিনি আরও বলেন, ‘পরের মেধাসত্ব চুরি করা একটি নৈতিক অপরাধ। এটা এক ধরনের পলিটিক্যালি ডিসঅনেস্টলি একটি রাজনৈতিক দল কতটুকু দেউলিয়া হলে অপর একটি রাজনৈতিক দলের দেওয়া আইডিয়া এবং থট্স নির্লজ্জভাবে চুরি করতে পারে। বিএনটি ইমিটেট করতে পারে। কিন্তু ইনোভেট করতে পারে না।’
ওবায়দুল কাদের বলেন, “আপনারা জানেন, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষে বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনা বাঙালি জাতির সামনে ‘ভিশন-২০২১’ তথা রূপকল্প-২০২১ উপস্থাপন করেছিলেন। ইতোপূর্বে কোন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য কোন ধরনের রোডম্যাপ উপস্থাপন করেনি। জনগণ ২০০৮ সালে নিরঙ্কুশভাবে জননেত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ‘ভিশন-২০২১’ তথা ডিজিটাল বাংলাদেশ-এর ওপর আস্থা স্থাপন করে আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছে। বাংলাদেশের জনগণ নিরবচ্ছিন্নভাবে গত ৯ বছর ধরে প্রত্যক্ষ করেছে একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য কি ‘ভিশন’ থাকা উচিত। জননেত্রী শেখ হাসিনা শুধু কাগজে কলমে নয়, স্বপ্নে নয়, বাস্তব অর্থেই তার ভিশন-২০২১ বাস্তবায়ন করে চলছেন। যার প্রতিফলন দেশের আজকে সার্বিক উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে। এই ভিশন-২০২১ এর কারণেই আজ বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম বাংলাদেশের এই অগ্রগতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ আজ একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েছে।”
সম্পাদনা/ এমএ