শাল্লা, সুনামগঞ্জ থেকে : হাওরাঞ্চলবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী থাকি আর না থাকি, বঙ্গবন্ধুর মেয়ে হিসেবে সবসময় আপনাদের পাশে থাকবো।
রোববার (৩০ এপ্রিল) বেলা ১১টার দিকে সুনামগঞ্জের শাল্লায় অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হাওর এলাকা পরিদর্শন শেষে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী সেখানকার ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণও বিতরণ করেন। পরে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে দুপুর ১টা ২০ মিনিটে হেলিকপ্টারে করে ঢাকার উদ্দেশে শাল্লা ছাড়েন তিনি।
সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি জানি অতি বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে হাওর অঞ্চলের ধান নষ্ট হয়ে গেছে। সিলেট বিভাগের প্রতিটি জেলায় এবার কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সাধারণত এপ্রিল মাসে এ ধরনের দুর্যোগে হয় না। অকাল এ দুর্যোগ আপনাদের মোকাবেলা করতে হয়েছে। দুর্যোগ যে কোনো সময় আসতে পারে। দুর্যোগ মোকাবেলায় যা যা করণীয় আওয়ামী লীগ সরকার তা করবে। আমরা সবসময় আপনাদের পাশে আছি।
এ পর্যায়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমি বঙ্গবন্ধুর মেয়ে। প্রধানমন্ত্রী থাকি আর না থাকি বঙ্গবন্ধুর মেয়ে হিসেবে আমি সবসময় আপনাদের পাশে থাকবো।
তিনি হাওরে অকাল বন্যায় বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে বলেন, হাওরাঞ্চলে বাঁধ নির্মাণে কারও গাফিলতি আছে কিনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গাফিলতি প্রমাণ হলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।
ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম ঠিক মতো হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণে প্রশাসনের কর্মকর্তা ও স্থানীয় নেতাদের নির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত সব জেলায় ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছাচ্ছে কিনা, সেগুলো ঠিকমতো বিতরণ করা হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম-সচিবদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কাজে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
হাওরাঞ্চলবাসীর ভাগ্যোন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, হাওরাঞ্চলে ভিজিএফ কার্ড বিতরণ অব্যাহত থাকবে এবং ভবিষ্যতে তা আরো বাড়ানো হবে। যেসব কৃষক কৃষিঋণ নিয়েছেন তাদের সুদের হার অর্ধেকে নামিয়ে এনেছি। কৃষকদের কাছ থেকে বন্যার সময় ঋণের টাকা আদায় করা হবে না।
তিনি বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) উদ্দেশে বলেন, আমি এনজিওগুলোকে নির্দেশ দেবো, তারা যেন ঋণের টাকা আদায়ে কৃষকদের ওপর চাপ না দেয়।
হাওরাঞ্চলবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে আবাসিক স্কুল নির্মাণ করা হবে আরও বেশি। প্রয়োজনীয় সার ও কৃষি সহায়তা বাড়ানো হবে। কৃষি ঋণ অর্ধেকে নামিয়ে আনা হবে।
তিনি আরো বলেন, আমি যখন ১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী ছিলাম। তখনও বন্যা হয়েছিল। সেই সময় দুই কোটি মানুষ না খেয়ে থাকবে এমন কথা বলা হয়েছিল। আমি একটি মানুষকেও না খেয়ে থাকতে দেইনি। সবাই খাবার পেয়েছে। হাওর অঞ্চলে ধান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য জেলাগুলোতে ভালো ধান হয়েছে। এছাড়া সরকারের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার মজুদ রয়েছে। একটি মানুষও না খেয়ে থাকবে না। বিশ্বাস রাখবেন, আপনাদের যাতে কোনো কষ্ট না হয় সে চেষ্টা আমরা করবো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নদীর দু’কূল উপচে পানি ঢুকে পড়ে হাওরে। তাই আমরা নদী ডেজিং এর উদ্যেগ নিয়েছি। এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়ে যাবে। স্থায়ী বাঁধ নিমার্ণের জন্য পরিকল্পনা করতে হবে। সেজন্য প্রকৌশলীদের নিয়ে পরামর্শ করে কাজ করতে হবে। পানির নিচে কয়েকদিন পর্যন্ত থাকলেও নষ্ট হবে না এমন জাতের ধান আবিষ্কার করেছেন আমাদের দেশের গবেষকরা। পরীক্ষামূলক ভাবে সেটি চাষ করে যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। এরই মধ্যে লবণ ও খরা সহিষ্ণু ধানের জাত আবিষ্কার করা হয়েছে।
হাওরাঞ্চলে এক ফসলের চিন্তা না করে সরিষা, শাক-সবজিসহ বিভিন্ন মৌসুমী ফসল আবাদ করার পরামর্শও দেন প্রধানমন্ত্রী।
আগামী বছর ফসল ওঠার আগ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষদের সহায়তা দেয়া হবে। যেভাবে সরকার খোলা বাজারে (ওএমএস) ১৫ কেজি করে চাল বিক্রি করছে, সেটা অব্যাহত থাকবে। ধান নষ্ট হয়ে গেছে- এমন অজুহাতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করা হলে তা সহ্য করা হবে না বলেও হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।
এর আগে হেলিকপ্টারে করে সকাল ১০টায় শাল্লার শাহীদ আলী মডেল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এসে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। এরপর তিনি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হাওরাঞ্চল ঘুরে দেখেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন। তারপর মতবিনিময় করেন সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে।