সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী :
কুমিল্লার বিশাল এলাকাজুড়ে রয়েছে দেশের প্রধান জাতীয় মহাসড়ক ঢাকা-চট্টগ্রামের একশত কিলোমিটার অংশ। এর বাইরে রয়েছে কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের প্রায় ৪২ কিলোমিটার অংশ। সরকার ২০১৫ সালের আগষ্ট মাসে মহাসড়কে সিএনজি অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধের পর মহাসড়কের আশপাশের এলাকার কমপক্ষে ৮ টি উপজেলার লাখ লাখ জরসাধারণের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। মহাসড়কে সিএনজি অটোরিকশা চলাচল বন্ধের পর পিক-আপ, লেগুণা, মাইক্রোবাস জনসাধারণের জন্য আশির্বাদ হয়ে আসলেও অজ্ঞাত কারণে বর্তমানে সেগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে বিআরটি’এর বক্তব্য গাড়িগুলো সড়কে চলাচলের জন্য অনুমতি বা কাগজপত্র নেই, হাইওয়ে পুলিশের বক্তব্য এসকল যানবাহন যাত্রী পরিবহনে বৈধ না। কথা হচ্ছে তাহলে সাধারন মানুষের চলাচলের বাহন কোনটা? আমাদের মাতো নি¤œ আয়ের দেশের মানুষদের পক্ষেতো আর প্রত্যেকের গাড়ি কেনার সামর্থ নেই। প্রতিদিন কুমিল্লার মহাসড়কের পাশে থাকা বিভিন্ন উপজেলা যেমন, দাউদকান্দি, চান্দিনা, কুমিল্লা সদর, সদর দক্ষিণ, চৌদ্দগ্রাম, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, দেবিদ্বার, মুরাদনগর থেকে হাজার হাজার মানুষ এক স্থান থেকে অন্যস্থানে যাতায়াত করছে। সড়কজুড়ে পর্যাপ্ত যাত্রীবাহী বাস না থাকায় অধিকাংশের যাতায়াতের প্রধান বাহন ছিল লেগুণা, পিক-আপ, মাইক্রোবাস। সিএনজি অটোরিকশা বন্ধের পর বাধ্য হয়ে মানুষ মালামাল পরিবহনের ছোট ছোট পিক-আপ, লেগুণায় বাধ্য হয়ে যাতায়াত শুরু করে। কিন্তু হঠাৎ করে মহাসড়কে চলাচলরত এসকল যানবাহনের বিরুদ্ধে হাইওয়ে পুলিশ ধরপাকড় শুরু করলে এক নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়। এতে সন্ধ্যার পর থেকে মানুষের যাতায়াত একেবারেই কমে যায়। কর্মজীবি বা ব্যবসায়ীরা তাদের দোকান-পাট বন্ধ করে সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি শুরু করে। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সাধারন মানুষ। বেশ কয়েক মাস ধরে এই অবস্থার সৃষ্টি হলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন জনদুর্ভোগ লাঘবে কার্যকর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় প্রতিদিনই দূর্ভোগ বাড়ছে। কুমিল্লায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে চৌদ্দগ্রাম, সদর দক্ষিণ, কুমিল্লা সদর, বুড়িচং, চান্দিনা ও দাউদকান্দির ১’শ কিলোমিটার সড়কপথ। এর পাশে ময়নামতি সেনানিবাস এলাকা থেকে কুমিল্লা- সিলেট মহাসড়কের বুড়িচং, দেবীদ্বার, মুরাদনগর ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার আরো প্রায় ৪২ কিলোমিটার সড়ক পথ। প্রতিদিন মানুষ নানা প্রয়োজনে একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাতায়াত করছে । স্বল্প দুরত্বের যাতায়াতে এতদিন জনপ্রিয় বাহন ছিল সিএনজি অটোরিকশা। ২০১৫ সালের আগষ্টে সরকার সারাদেশের বেশ কিছু মহাসড়কে সিএনজি অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করে। কুমিল্লার ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কও এর আওতায় পড়ে। এরপর থেকেই বলতে গেলে শুরু হয় জনদুর্ভোগ। কুমিল্লা মহানগরী থেকে প্রতিদিন বুড়িচং, চান্দিনা, দাউদকান্দি, দেবিদ্বার, চৌদ্দগ্রাম, সদর দক্ষিণ এমনকি মহাসড়কের পাশে সদর উপজেলার বিভিন্নস্থানের স্কুল-কলেজগামী হাজার হাজার শিক্ষার্থী, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অনেক শিক্ষক যাতায়াত করেন। এছাড়াও নগরীর বাইরে থেকে প্রতিদিন শত শত বিভিন্ন ব্যবসায়ী বা শ্রেনী পেশার মানুষও নগরীতে আসছেন, আবার ফিরেও যাচ্ছেন। তাছাড়া নিকটবর্তী জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর বা জেলার দাউদকান্দি, হোমনা, তিতাস, মেঘনা, মুরাদনগর, ব্রাহ্মণপাড়া, চৌদ্দগ্রাম, লাকসাম, বরুড়া, মনোহরগঞ্জ, নাঙ্গলকোট পাশের নোয়াখালীর সোনাইমুড় থেকেও প্রতিদিন শত শত রোগী আসছেন কুমিল্লা মেডিকেল কলেজসহ নগরীর বড় বড় বেসরকারী হাসপাতাল সমূহে। এক্ষেত্রেও আগে তাদের প্রধান বাহন ছিল সিএনজি অটোরিকশা। যা রোগীর পরিবারের জন্য অনেকটা সহনীয় বাহন ছিল। স্বল্প দুরত্বে দ্রুত ও ঝামেলা মুক্তভাবে যাতায়াতে সাম্প্রতিক সময়ে লোকজন পূবের্র সিএনজি অটোরিকশার ন্যায় বর্তমানে লেগুণা, পিক-আপ বা মাইক্রোবাসে যাতায়াতে অনেকটা মানিয়ে নেয়। তাছাড়া স্বল্প দুরত্বে যাতায়াতকারীদের বাসে উঠতেও ঝামেলা পোহাতে হয়। বাস কর্তৃপক্ষ যাত্রাপথ থেকে গন্তব্যের যাত্রীদের আসন দেওয়ার পর স্বল্প দুরত্বের যাত্রীদের দাড় করিয়ে ঠাসাঠাসি করে যাত্রী পরিবহন করেন। এতে নারী, শিশুসহ স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের চরমদুর্ভোগ পোহাতে হয়। ফলে কিছুটা অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে মানুষ স্বাচ্ছন্দে স্বল্প দুরত্বে পৌছতে লেগুণা, পিক-আপ বা মাইক্রাবাসে আরোহন করেন। সিএনজি অটোরিকশা নিষিদ্ধের পর যখন মানুষ বাধ্য হয়ে মালামাল পরিবহনের ছোট ছোট পিক-আপ’এ এক শ্রেনীর পরিবহন ব্যবসায়ী কাঠের টেবিল বসিয়ে যাত্রী পরিবহন শুরু করে তখন সাধারন মানুষের মৃদু আপত্তি থাকলেও প্রয়োজনের তাগিদে সেটা মানিয়ে নেয়। এরপর থেকে স্বল্প দুরত্বে চলাচলকারী মানুষের প্রধান বাহন লেগুণা, পক-আপ, মাইক্রোবাস। কিন্তু বিগত প্রায় ৩ মাস ধরে অজ্ঞাত কারনে হাইওয়ে পুলিশ মহাসড়কে লেগুণা, পিক-আপ চলাচলে নিষেধাজ্ঞাজারী করেন। কুমিল্লা মহানগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে নগরীর বাইরে বিভিন্ন স্কুল কলেজে চাকুরীরত একাধিক শিক্ষক জানান, নগরীর বাইরের বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বহন করা যানবাহন থাকলেও আমাদের কর্মস্থলে স্বল্প দুরত্বের স্থানগুলোর জন্য নেই কোন নির্দিষ্ট যানবাহন। ফলে আমরা প্রতিদিন অবর্নণীয় দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করি। একইভাবে নগরী ইষ্টার্ণ ইয়াকুব প্লাজাসহ বিভিন্নস্থানে দোকাট-পাট পরিচালনাকারী ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে যানবাহন স্বল্পতায় দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ফলে দ্রুত তারা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বাড়ির পথে ফিরে যান। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখিন হতে হচ্ছে তাদের প্রতিদিন। এদিকে প্রতিদিন কুমিল্লা বাস মালিক সমিতির পক্ষ থেকে স্বল্প দুরত্বে চলাচলে কিংবা নগরী থেকে ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট, নিমসার, চান্দিনা, কংশনগর, দেবিদ্বারসহ বিভিন্নস্থানে আসা যাওয়ায় কিছু বাস চলাচল করলেও সন্ধ্যার পর সেটা সীমিত হয়ে পড়ে। এতে সন্ধ্যার পর জনগণের দুর্ভোগ বাড়ে গন্তব্যে পৌঁছতে। এই যখন জনগণের দুর্ভোগ তখন প্রশাসন থেকেও আসছেনা কোন সমাধানের ব্যবস্থা। স্বল্প দুরত্বে চলাচলকারী লেগুণা, পিক-আপ ইত্যাদি যানবাহন চলাচল যদি অবৈধ হয়ে থাকে তবে বিগত বছরজুড়ে কিভাবে মহাসড়কে এগুলো চলাচল করেছে? সাধারন ভূক্তভোগী জনগণের দাবী দ্রুত নিরসন হোক এই দুর্ভোগের। এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুমিল্লা (পূর্বাঞ্চল) হাইওয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, বিআরটি’এ যদি লেগুণা, পিক-আপ যানবাহনের সড়ক, মহসড়কে চলাচলের অনুমতি দেয় তবে আমাদের কোন বাধাঁ নেই। এখন প্রশ্ন নিষিদ্ধের কারণে মহাসড়কে লেগুণা, পিক-আপ যাত্রী বহন করতে পারবেনা ভালো কথা, কিন্তু জনস্বার্থে কি বিষয়টা বিবেচনা করা যায় না? মহাসড়কে ট্রাক্টর, নসিমন, করিমন বা ভটভটি কোন কালেই চলাচলের অনুমতি ছিল না। প্রতিদিন মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা-সিলেট অংশের যত্রতত্র অবাধে চলছে শত শত এসকল ট্রাক্টর, নসিমন, করিমন, ভটভটি। সেগুলো কিভাবে চলাচল করছে হাইওয়ে পুলিশের নাকের ডগায়? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দায়িত্বশীল সুত্র জানায়, দেশের প্রধান জাতীয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলাচলকারী দ্রুতগতির যানবাহনের সাথে ময়নামতি হাইওয়ে ক্রসিং থানার সামনে দিয়ে প্রতিদিন শত শত ট্রাক্টর, নসিমন, ভটভটি চলছে দিব্যি। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে এসকল ট্রাক্টরের চালকরা অনেক সময় দ্রুতগতির যানবাহনের সাথে প্রতিযোগীতা করে পাল্লা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে। এখানে প্রশ্ন জনদূর্ভোগের কথা বিবেচনায় না রেখে লেগুণা, পিক-আপ বন্ধে যতটা হাইওয়ে পুলিশের আগ্রহ সেক্ষেত্রে ট্রাক্টর বা নসিমন, ভটভটির জন্য তারা কেন এতটা নিরব? নিষিদ্ধ যানবাহন চলাচল বন্ধে আইনের দৃষ্টিতে সঠিক হলে ট্রাক্টর, নসিমনের বেলায়ও সেটা দ্রুত কার্যকর করা হোক। পাশাপাশি জনগণের দুর্ভোগ লাগবে স্বল্প দুরত্বে চলাচলকারী হাজার হাজার মানুষের গন্তব্যে পৌছঁতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন দ্রুত বিকল্প যানবাহনের ব্যবস্থা করুক সাধারন মানুষের এটাই প্রত্যাশা।