মরুভূমির তাঁতী এবং ধানমন্ডির ধান চাষী বৃত্তান্ত !

 

গোলাম মাওলা রনি : ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক  ওবায়দুল কাদেরের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্যে রঙ্গপ্রিয় বাঙালি বহুকাল পরে ব্যাপক বিনোদন লাভের সুযোগ পেয়েছেন। ক্ষমতার পদ লেহনকারী মধুমাছিদের দৌরাত্ম্যে জনাব কাদের নিশ্চয়ই ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে পড়েছেন। চারিদিকে নাম সর্বস্ব সংগঠনের বাড়াবাড়ি এবং তথাকথিত হাইব্রিডদের দাপটে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভিতরে এবং বাইরে যে বড় বড় ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে তা দলটির সাধারণ সম্পাদক বুঝতে পেরেছেন এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিজের খেদোক্তি ঝেড়েছেন।

রাজধানীর সবচেয়ে পুরনো এবং ঐতিহ্যবাহী অভিজাত এলাকার নাম ধানমন্ডি, যেখানকার বেশির ভাগ স্থায়ী বাসিন্দা ষাটের দশক থেকে ধনাঢ্য জীবনযাপনে অভ্যস্ত। এমনতরো এলাকায় কৃষক লীগের শাখা অফিস প্রসঙ্গে জনাব কাদেরের জিজ্ঞাসাÑ ‘ধানমন্ডিতে এ যুগে ধান চাষ হচ্ছে এমন খবর তো আমাদের জানা নেই!’ অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসা ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকার বাসিন্দাদের অর্থনৈতিক জীবনে এমন কি মড়ক লাগল কিংবা তাদের মানসিক বৈকল্য এমন কোনো স্তরে কি পৌঁছাল যাতে করে বাসিন্দাদের কিছু অংশ আজ ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্য লাভের জন্য কৃষক লীগের একটি ওয়ার্ড কমিটিতে নাম লেখানোর জন্য নিজেদের বা বাপ-দাদাদের ষাট/সত্তর বছরের পেশা এবং আভিজাত্যের অহমিকা ত্যাগ করে কৃষক হওয়ার দৌড়ে শামিল হলো?

জনাব কাদের আরও বলেছেন যে, ক্ষমতার স্বাদ-আহলাদের রস আস্বাদনের জন্য ফন্দিবাজেরা কুয়েত, আরব আমিরাত প্রভৃতি মরুভূমির দেশে তাঁতী লীগের শাখা খুলে বসেছেন। তিনি মরুভূমির উতপ্ত পরিবেশে কি করে তাঁতী লীগের বয়ন শিল্পীবৃন্দ বাংলার হারিয়ে যাওয়া তাঁতী এবং তাঁতশিল্পের রক্ষাকারী হিসেবে কাপড় বুনছেন তা জানার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। জনাব ওবায়দুল কাদের হয়তো আরও জানতে চান যে, তাঁতী লীগের বয়ন শিল্পীরা কি আরব দেশের ললনাদের জন্য বস্ত্র তৈরি করেন নাকি বঙ্গ ললনাদের জন্য!

ইউরোপ-আমেরিকা, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার কসমো পলিটান শহরগুলোতে শ্রমিক লীগের শাখা অফিস নিয়েও জনাব ওবায়দুল কাদের হাইব্রিডদের চামচামি এবং তেলবাজিতে যারপরনাই বিরক্ত হয়েছেন। একটি সিল এবং প্যাড সম্বলিত নাম সর্বস্ব ভূইফোঁড় সংগঠনের নামে আওয়ামী লীগকে কলংকিত করার বিষয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, এসব আর বরদাশত করা হবে না। জনাব কাদেরের খেদোক্তি এবং হুঁশিয়ারিমূলক বিবৃতি সাম্প্রতিক সময়ে পত্রপত্রিকা এবং সামাজিক মাধ্যমগুলোতে প্রচারের পর লোকজন ব্যাপক বিনোদন লাভ করেছেন। কথাগুলো শুনতে বেজায় ভালো। কিন্তু এগুলোর একটিও যে তিনি বাস্তবায়ন করতে পারবেন না তা প্রায় পুরোপুরি নিশ্চিত।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ফায়দা লোটার প্রবণতা মারাত্মকভাবে বেড়ে গিয়েছে। খুব অল্প সময়ে যেনতেন প্রকারে অঢেল অর্থকড়ির নিরাপদ লুটপাট, নির্বিচারে প্রতিপক্ষকে ঠেঙানোর অলিখিত অধিকার এবং নির্ভিকচিত্তে অকাম-কুকাম করার অবাধ সুযোগ লাভের জন্য সুবিধাবাদী পা-ারা হাইব্রিড দলবাজ হিসেবে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোতে ভিড় জমায়। এদের দৌরাত্ম্য এবং তেলবাজির হাত অনায়াশে ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করে যাতে করে সৎ, ত্যাগী এবং পরীক্ষিত নেতা কর্মীবৃন্দ সহজেই কোণঠাসা হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের কড়া হুঁশিয়ারি হতাশাগ্রস্তদেরকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে সত্য কিন্তু বেশিরভাগ মানুষজনই মনে করেন যে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জনাব কাদেরের আসলে খেদোক্তি প্রকাশ ছাড়া কিছুই করার নেই। কারণ তেলবাজ হাইব্রিডদের অধিক্ষেত্র এবং ক্ষমতার শেকড় আরও গভীরে!

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *