প্রতিবেদকঃ
করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে যেন এক নিরব লড়াই চলছে। রাজনীতিবিদ হিসেবে যেমন নিজেকে তিনি আড়ালে নিয়ে গেছেন, প্রশাসক হিসেবে তিনি সামনে এসেছেন। গত দুই মাসে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য, বিবৃতি, বিরোধী দলকে তিরষ্কার ইত্যাদি একেবারেই অনুপস্থিত। অন্যদিকে প্রশাসক হিসেবে তিনি রাজনীতিকে এক রকম উপেক্ষাই করছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু নয়, তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিতে দেখা যায় যে, রাজনৈতিক দলের প্রধান যখন সরকার প্রধান হয় তখন প্রশাসক হিসেবে তিনি একটি রাজনৈতিক বৃত্তর মধ্যেই আবদ্ধ থাকেন।রাজনৈতিক বিবেচনা থেকেই সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তাঁর প্রধান পরামর্শক হয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, তাঁর কর্মকাণ্ডের মধ্যে দলের স্বার্থ প্রাধান্য পায়। দল যেন কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং দলকে নিয়েই তিনি সরকার পরিচালনা করতে চান। আর একারণেই অনেক সময় সরকার এবং দল একাকার হয়ে যায়।
এর ফলে দলের নেতা-উপনেতা থেকে শুরু করে পাতিনেতারা পর্যন্ত ক্ষমতার দূর্দান্ত দাপট দেখাতে শুরু করেন। স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষমতাসীন নেতাদের ক্ষমতাও প্রশাসক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার থেকে অনেক বেশি হয়ে যায়। দলই হয়ে যায় কর্তৃত্ববান ক্ষমতাবান, দলের নেতারা সবকিছুর উর্ধ্বে উঠে যান। কিন্তু বাংলাদেশে তাঁর ব্যতিক্রম ঘটছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নিয়ে শেখ হাসিনা যেন দুটো সত্ত্বায় আবির্ভূত হয়েছেন। একটি রাজনীতিবিদ শেখ হাসিনা এবং অন্যটি প্রশাসক শেখ হাসিনা। এই দুই সত্ত্বার ভেতর প্রকাশ্য এবং শীতল লড়াই দৃশ্যমান।
শেখ হাসিনা রাজনীতিবিদ হিসেবে যেমন দলকে ভালোবাসেন, দলের কর্মসূচীতে উপস্থিত হন।রাজনৈতিক বক্তব্য রেখে বিরোধী দলকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। আবার সরকার প্রধান হিসেবে তিনি ততটাই নিরপেক্ষ, নির্মোহ। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যেন রাজনৈতিক কর্তৃত্ব গ্রহণ করতে না পারে বা প্রশাসনের উপর খবরদারি করতে না পারে সেই দিকেও নজর রেখেছেন। তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের শুরু থেকেই তাঁর এই দুটি সত্ত্বার পরিষ্কার রূপ পাওয়া গেলেও করোনা সঙ্কটের সময় এটা আরো প্রবল আকার ধারণ করেছে।
তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণ করে শেখ হাসিনা রাজনীতিবিদ হওয়ার থেকে একজন প্রশাসক হিসেবে বেশি উপস্থিত হন। তিনি প্রথমেই যখন সংসদীয় দলের বৈঠক করেন, সেখানে তিনি ঘোষণা করে দেন যে, দলের কেউ দূর্নীতি, অনিয়ম করলে সহ্য করা হবেনা এবং দূর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে তিনি শূন্য সহিষ্ণুতা ঘোষণা করেন। তিনি বলে দেন যে, দলের কোন নেতাকর্মী যদি খারাপ কাজ করে, তাহলে তাঁর শাস্তি পেতেই হবে। অনেক নেতাকর্মী এটাকে ‘বাত কি বাত’ মনে করছিলেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তিনি শুদ্ধি অভিযান শুরু করলেন এবং তিনি পছন্দ করে দুজনকে ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক করেছিলেন, তাঁদেরকেই ছাঁটাই করে দিলেন। ছাঁটাই করে দিলেন তাঁর অত্যন্ত প্রিয়ভাজন হিসেবে পরিচিত যুবলীগের চেয়ারম্যানকে। স্বেচ্ছা সেবকলীগের সভাপতিকেও তিনি বাদ দিতে কূণ্ঠাবোধ করলেন না।
কাজেই রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁর যেমন দল দরকার, সংগঠন শক্তিশালী করা দরকার; আবার প্রশাসক হিসেবে দরকার একটি নির্মোহ অবয়ব। সেই নির্মোহ অবয়ব তৈরি করতে গিয়ে তিনি আওয়ামী লীগের উপরেই শুদ্ধি অভিযান করলেন এবং আওয়ামী লীগেরই নেতাকর্মীদের উপর খড়গ চালালেন। এখানেই রাজনীতিবিদ শেখ হাসিনাকে প্রশাসক শেখ হাসিনার কাছে পরাজিত হতে হলো।
এরপরে যখন করোনাকাল শুরু হলো, তখন আমরা দেখলাম যে, রাজনীতিবিদ শেখ হাসিনা যেন মৃতপ্রায়, আর প্রশাসক শেখ হাসিনা যেন উজ্জীবিত, আলোকিত এবং মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিকৃতি। প্রশাসক শেখ হাসিনা বলেই দিলেন যে, যে যে দল করুক না কেন, দলমত নির্বিশেষে সবাই যেন ত্রাণের টাকা পায় এবং এই করোনা লড়াইয়ের দীর্ঘদিনে শেখ হাসিনাকে একটিবারের জন্যেও বিরোধী দলের নাম উচ্চারণ করে সমালোচনা করতে দেখা যায়নি।
বরং তিনি বলেছেন যে, যারা সরকারের সমালোচনা করছেন, তাঁদের উচিত নিজেদেরকে ত্রাণ সাহায্য দেওয়া। এই করোনা সঙ্কটে রাজনীতিবিদ শেখ হাসিনা প্রায় অনুপস্থিত। তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেই, জেলা পর্যায়ে দলের নেতাকর্মীদের সাথে তিনি ভিডিও কনফারেন্সে যে যোগাযোগগুলো করছেন তা দলীয় নেতা হিসেবে নয়, বরং সরকার প্রধান হিসেবে কথাবার্তা বলছেন, নির্দেশনা দিচ্ছেন।
আর সেই কারণেই এখন প্রশাসক হিসেবেই শেখ হাসিনা সামনে চলে এসেছেন। রাজনীতিবিদ শেখ হাসিনা যেন এখন আড়ালে অবগুন্ঠিত। তবে শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের শেষ কথা হলো রাজনীতি। রাজনীতিই শেখ হাসিনাকে একজন দক্ষ প্রশাসক বানিয়েছে, রাজনীতিই শেখ হাসিনাকে সরকার প্রধান বানিয়েছেন। কাজেই রাজনীতিবিদ শেখ হাসিনাকে অকার্যকর করে প্রশাসক শেখ হাসিনা কি ভালো থাকবেন?
সম্পাদনায় : সৈয়দ মনির || বাংলারদর্পন ||