নওগাঁ প্রতিনিধি :প্রকাশ- ১৩ নভেম্বর ১৬ :
নওগাঁর রাণীনগর সমাজ সেবা অফিসে ঘুষ দিলেই বয়স না হলেও পাওয়া যায় বয়স্ক ভাতার কার্ড এবং বিধবা না হলেও পাওয়া যায় বিধবা ভাতার কার্ড। বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত সুবিধা ভুগিরা। সরকারি বিধি মতে পুরুষের ক্ষেত্রে ৬৫ বছর এবং
মহিলাদের ক্ষেত্রে ৬২ বছরের নিচে কেউ বয়স্ক ভাতা পাওয়ার যোগ্য নয় কিন্তু এখানে তা মানা হয় না। এই সুবিধা পাবার কথা সমাজের অসহায়, গরীব ও অস্বচ্ছল মানুষদের কিন্তু বেশির ভাগ স্বচ্ছল মানুষরাই ভোগ করছেন এই সুবিধাগুলো। বর্তমানে উপজেলার সমাজ সেবা অফিস দীর্ঘদিন যাবত নাসরিনসহ কতিপয় কর্মচারীর হাতে জিম্মি হয়ে আছে। গ্রামে গ্রামে মেম্বার, চেয়ারম্যান, স্থানীয় নেতা, এক জন
পুরুষ ও মহিলার দ্বারা তৈরি করেছেন এক সিন্ডিকেট চক্র। তাদের পছন্দমতো ব্যক্তিদের
অর্থের বিনিময়ে দেওয়া হয় এই সব ভাতার কর্ড।
যাদের মাধ্যমে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা দিলেই বিধবা না হলেও বিধবা ভাতার এবং বয়স না হলেও বয়স্ক ভাতার কার্ড প্রদান করা হয়।
ঘুষ না দিলেই হয়রানীর শিকার হতে হয় এখানে আসা অসহায় মানুষদের। আজ নয়তো কাল এভাবে ঘুরানো হয় দিনের পর দিন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় ইউপি সদস্যরা জানান, আমরা কি করবো। সমাজ সেবা অফিসে ঘুষ না দিলে কোন কাজ হয় না আর ঘুষ না দিলেই দেখায় হাজারটা অজুহাত। তাই আমরা বাধ্য হয়েই গরীব মানুষদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে তাদের ভাতার
ব্যবস্থা করে দিই।
সরেজমিনে বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে দেখা যায়,একই পরিবারের সকল সদস্য দীর্ঘদিন যাবৎ কোন না কোন ভাতার সুবিধা ভোগ করছেন। বয়স্ক ভাতা পাওয়ার যোগ্য বড় ভাইকে বাদ দিয়ে ঘুষের বিনিময়ে ছোট ভাই পাচ্ছেন বয়স্ক ভাতার টাকা। এমনও পরিবারে দেখা গেছে স্বামী পাচ্ছেন বয়স্ক ভাতা একই সঙ্গে স্ত্রীও পাচ্ছেন বিধবা ভাতার টাকা। কেউ প্রতিবন্ধী কিংবা পঙ্গু না হলেও পাচ্ছে প্রতিবন্ধী ভাতার সুবিধা। নাসরিন কে ঘুষ দিলেই এই অফিসে অসম্ভবকে করা যায় সম্ভব। উপজেলা সদরের পশ্চিম বালুভরা গ্রামের মোট
৭০ টি পরিবারের মধ্য ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবারই
বয়স্ক কিংবা বিধবা ভাতার সুবিধা ভোগ করে আসছেন দীর্ঘদিন যাবৎ। যে পরিবারের
অধিকাংশ মানুষই আর্থিক ভাবে সচ্ছল আর বসবাস করছে ইটের তৈরি বাড়িতে অথচ প্রকৃত সুবিধা ভুগিরা ঘুষ না দেওয়ার কারণে এই সব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
পশ্চিম বালুভরা গ্রামের মৃত-পবন আলীর ছেলে ময়েজ উদ্দিনের বয়স মাত্র ৩৫ বছর। সরকারি নীতি অনুসারে সে বয়স্ক ভাতা পাওয়ার যোগ্য না হলেও সে দীর্ঘদিন যাবৎ বয়স্ক ভাতার সুবিধা ভোগ করে আসছেন। একই গ্রামের মৃত- বাদেশের ছেলে আজিজার রহমান (৫০), মখলেছুর
রহমানের স্ত্রী মর্জিনা (৪০) সহ অনেকেই স্থানীয় অয়েন শাহের ছেলে আনিছুর রহমানের
মাধ্যমে সমাজ সেবা অফিসের নাসরিনকে ঘুষ দিয়ে বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতার কার্ড করে
নিয়েছে। একই গ্রামের মৃত-গোনা শাহের ছেলে
আফতাব হোসেন (৫০) পাচ্ছেন বয়স্ক ভাতা ও তার স্ত্রী মাজেদা (৪০) পাচ্ছেন বিধবা ভাতার টাকা। একই গ্রামের মৃত-বশির শাহের ছেলে গফুর শাহ
(৭৭) জানান, আমার আগে আমার মেয়ে কি করে
বয়স্ক ভাতা পায়? আমি সমাজ সেবা অফিসের নাসরিনের কাছে ৭ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে সম্প্রতি বয়স্ক ভাতার কার্ড পেয়েছি। কিন্তু
এখনো আমি বয়স্ক ভাতার টাকা হাত দিয়ে স্পর্শ করতে পারিনি বাবা। নাসরিন আমার ভাতার টাকা থেকে তার ঘুষের টাকা কেটে নিয়েছে। আমি তাকে ঘুষের বাকি বাইশত টাকার মধ্যে দুইশত টাকা কম দিলে সে আমার টাকা ছুড়ে
ফেলে দিয়েছে।
একই গ্রামের মৃত- চাঁদ শাহের ছেলে লজে ( ৬৫)
জানান, আমার ছোট ভাই বয়স্ক ভাতা পেয়েছে কিন্তু আমি স্থানীয় মেম্বারকে ৫হাজার টাকা দিতে পারিনি বলে আমার ভাতা হয়নি।
মৃত- আমির উদ্দিন ফকিরের ছেলে মোজাফ্ফর হোসেন ( ৬৫) জানান, শতবার আমি এই অফিসের নাসরিনের কাছে গিয়েছি কিন্তু কাজ হয়নি। সে আমার কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ঘুষ চায় কিন্তু আমি গরীব দিনমজুর এত টাকা ঘুষ দিব কোথায় থেকে। তাই আমার ভাতার কার্ড হয়নি। অথচ আমার ছোট ভাইয়েরা মেম্বারকে ঘুষ দিয়ে বয়স্ক ভাতার কার্ড করে নিয়েছে। উপজেলার কাশিমপুর ইউপি’র চকাদিন হিন্দুপাড়ার দিনমজুর শরিফুল ইসলামের শারীরিক প্রতিবন্ধী মেয়ে মোছা: মুহিনি আক্তার (৮) আট বছর পার হলেও আজ পর্যন্ত কোন প্রতিবন্ধী ভাতা পায় না। একই গ্রামের কমল কুমার দাস (২৮) ও সিমা দাস (২৪) দুই ভাই বোনই জন্ম থেকে শারীরিক প্রতিবন্ধি। সম্প্রতি কমল কুমার দাস প্রতিবন্ধি ভাতা পেলেও সিমা দাস এখনও পর্যন্ত কোন সুযোগ সুবিধা পায় না।
একই চিত্র উপজেলার অন্যান্য গ্রামগুলোতেও। বর্তমানে উপজেলায় এই অফিস সমাজ সেবা অফিস নামে পরিচিত নয় এটি নাসরিনের অফিস
নামেই সবার কাছে পরিচিত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অফিসের আরো অনেকে জানান, কোন ভালো কর্মকর্তা এসে এই নাসরিন ও তার সিন্ডিকেটের কাছে টিকতে পারে না। তারা উপড় মহলকে ম্যানেজ করে এখানে দীর্ঘদিন যাবত গরীব মানুষের রক্ত চুষে চাকরি নামের এই বাণিজ্য করে আসছেন। ঘুষ দিলেই কে পাওয়ার যোগ্য আর কে পাওয়ার যোগ্য নয় এটা নারসিনের কাছে কোন বিষয়ই নয়। এই বিষয়ে সমাজ সেবা অফিসের ইউনিয়ন সমাজ কর্মী মোছা: নাসরিন পারভীন জানান, প্রতিটি
ইউনিয়নে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি দল আছে। সেই দল আমাদের কাছে যে তালিকা দেন সে অনুসারে আমরা কার্ড বিতরন করি। তাদের দেওয়া তালিকা যাচাই-বাচাই করার অধিকার আমাদের নেই। আর অফিসে যা কিছু হয়ে থাকে তা এই অফিসের সবাই জানেন।
উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হারুনুর রশিদ বলেন, এই নাসরিন একজন অসৎ,লোভী ও দুর্নীতিবাজ কর্মচারী। তার কাছে আমরা জিম্মি হয়ে পড়েছি। উপজেলা পরিষদের একাধিক সমন্বয় সভায় এই মহিলাকে তার এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এই মহিলা এখানে দীর্ঘদিন চাকরি করার কারণে এই সব আত্মীয়করণ করার সুযোগ পাচ্ছে। অচিরেই এই মহিলাকে এই পরিষদ থেকে অপসারন করা অতিব প্রয়োজনীয় নইলে এই অপকর্মগুলো চলতেই থাকবে।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো: আনিছুর রহমান জানান, এই সব অনিয়ম-দুর্নীতি দীর্ঘদিন যাবত চলে আসছে। আমি অফিসের কর্মচারীদের হাতে জিম্মি। তাদের এই সব কাজ আমি করতে না চাইলে তারা আমাকে বিভিন্ন রকমের হুমকি-ধামকী ও ভয়ভীতি প্রদান করে। আমার চেয়ার ঠিক রাখা ও ভালো ভাবে চাকরি করার সুবাদে
আমি একা তাদের সঙ্গে পেরে উঠতে পারি না। এই অফিসে তারা দীর্ঘদিন যাবৎ চাকরি করার কারণে প্রতিটি ইউনিয়নে গড়ে তুলেছে মেম্বার, চেয়ারম্যান ও স্থানীয় নেতাদের সহযোগিতায় একটি চক্র যাদের দ্বারা তারা এই সব অনিয়ম ও দুর্নীতি করে আসছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোনিয়া বিনতে তাবিব জানান, আমার কাছে এই সব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তর মুলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।