শেখ আমিনুর হোসেন, সাতক্ষীরা ব্যুরো চীফ:
সাতক্ষীরায় জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা’র জেলা কমিটির আয়োজনে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় সরকারি আইনি সেবার ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।সোমবার বিকালে সাতক্ষীরা জেলা জজ আদালতের সম্মেলন কক্ষে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা’ এর জেলা কমিটি আয়োজিত সেমিনারে সাতক্ষীরার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ সাদিকুল ইসলাম তালুকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে তিনি বলেন,
সবার জন্য আইন, আর আইনের উর্ধ্বে কেউ নন, ‘আইনে আবেগের কোনো স্থান নেই। আইন তার গন্ডির মধ্যেই থাকে। সেখানে অশ্রু বিসর্জনেরও মূল্য নেই’। যে কেউ আইনের সেবা নিতে পারেন জানিয়ে তিনি বলেন সরকার দেশের নির্যাতিত অথচ দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া মানুষকে আইন সহায়তা দিয়ে আসছে। এজন্য আইনসেবা গ্রহীতার কোনো ব্যয় নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালের ২৮ এপ্রিল দরিদ্র মানুষকে আইন সহায়তা দেওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেন। দিনটি বাংলাদেশে জাতীয় আইন সহায়তা দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে । এতে উপকৃত হচ্ছেন নির্যাতিত দরিদ্র নারী পুরুষ শিশু ছাড়াও পাচারের শিকার, প্রতারনার শিকার এমনকি ফৌজদারি অপরাধের শিকার হওয়া পিছিয়ে পড়া মানুষ। হেল্প লাইন ১৬৪৩০ নম্বরে প্রতিদিন অসংখ্য নারী পুরুষ শিশু আইনি তথ্য সেবার জন্য ফোন করছেন জানিয়ে তিনি বলেন দেশে এ পর্যন্ত ৪১ হাজারেরও বেশি মানুষকে আইন প্রতিকার দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন ২০০৮ এর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে ‘রুপকল্প ২০২১ নামে তথ্য প্রযুক্তিভিত্তিক এক নতুন ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গিকার করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা ‘বিচারে প্রবেশাধিকার’ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিষয়টি একইভাবে ভূমিকা রেখেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
এ প্রসঙ্গে তথ্য উপাত্ত তুলে ধরে বলা হয় ২০১৮ এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩ লাখ ৪৭ হাজার ৬৭৭ জন বিচারপ্রার্থীকে বিনা খরচে সরকারি আইন সেবা দেওয়া হয়েছে। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ১৩ কোটি ১৭ লাখ ৩৯ হাজার ১৩৪ টাকা ক্ষতিপূরন আদায় হয়েছে। সাতক্ষীরার প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে সেমিনারে বলা হয় জেলায় ১৯৯৪ সাল থেকে এ যাবত আইনগত সহায়তা প্রদান কমিটির মাধ্যমে ৪২৫৮ টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে দৃশ্যমানভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে ১৩১৫ টি মামলা। প্রতি বছর গড়ে তিনশ’ মামলা হলেও চলতি বছর এমন মামলার সংখ্যা দুই হাজারের কাছাকাছি। এই মামলার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে উল্লেখ করে সেমিনারে আরও বলা হয় গ্রামে গ্রামে এই বার্তা পৌছে দিতে হবে । গরিব মানুষের মামলার ব্যয় সরকার বহন করবে বলে জানিয়ে দিতে হবে। এ জন্য আইনগত সহায়তার লক্ষ্যে জেলা উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্যানেল আইনজীবীরা এসব মামলা পরিচালনা করছেন। যে কোনো বিচারপ্রার্থী এই কমিটির সাথে যোগাযোগ করে তার আরজি পেশ করতে পারেন। সরকার সব খরচ বহন করবে।
সেমিনারে তিনি আরো বলেন, আইনে আপস করা যাবে না। তবে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে আদালতের বাইরে আইনজীবীরা যদি কোনো আপস করেন আদালত সেটি আনি গন্ডির মধ্যে বিবেচনা করতে পারে। আপস করার দায়িত্ব আদালতের নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সেমিনারে সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার সাজ্জাদুর রহমান বলেন, আইন সহায়তা দানে আরও প্রাকটিক্যাল হতে হবে। সর্বস্তরের মানুষকে এ ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলতে হবে। সাতক্ষীরায় এই সেবা দিন দিন বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন পুলিশ এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। সেমিনারে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অনিন্দিতা রায় বলেন, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটিগুলির কার্যক্রম মনিটর করতে হবে। তাদেরকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন জেলা প্রশাসন এ ব্যাপারে সব সহায়তা দিয়ে যাবে।
এ সময় আরও বক্তব্য রাখেন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এড. আবুল হোসেন, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব সভাপতি অধ্যক্ষ আবু আহমেদ, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব সাবেক সভাপতি সুভাষ চৌধুরী, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব সাবেক সাধারন সম্পাদক এম কামরুজ্জামান, সাবেক সাধারন সম্পাদক মমতাজ আহমেদ বাপী, প্রেসক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক গোলাম সরোয়ার, দৈনিক দৃষ্টিপাতের আবু তালেব মোল্লা, প্রেসক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য অসীম চক্রবর্তী, সাতক্ষীরা জেলা সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শেখ আমিনুর হোসেন, জেলা তথ্য অফিসার মোজাম্মেল হক প্রমূখ। তারা বলেন আইন সহায়তা কমিটি সম্পর্কে সাধারনের ধারনা পরিস্কার করতে গ্রাম পর্যায়ে যেয়ে আলোচনা করতে হবে। বিনা খরচে নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়ানোর কথা জানান দিতে হবে। এমনকি আইন সেবা গ্রহীতারা যাতে ন্যায় বিচার পান এবং তারা যাতে কারও প্রতারণার মুখে না পড়েন সে বিষয়ে নজর রাখতে হবে। বিশেষ করে আদালত চত্বরে এ ধরনের প্রতারকদের খপ্পর থেকে তাদের দুরে থাকতে হবে বলে উল্লেখ করেন তারা। এ ছাড়াও সেমিনারে চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তফা পাভেল রহমান, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক হোসনে আরা আক্তার , বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা ও এনজিও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ‘উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় সরকারি আইনি সেবার ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক সেমিনারে সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেন জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার যুগ্ম জেলা জজ মো.কেরামত আলি।