Main Menu

নোয়াখালীর রাজাকার মোহাম্মদ আলী বিচারের আওতায় আসেনি

মোঃ ইমাম উদ্দিন সুমন,  নোয়াখালী প্রতিনিধি:
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে পাকিস্তানের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলসামস্রা নৃশংস ভাবে হত্যা করে ৩০ লক্ষ বাঙালী আর সম্ভ্রমহানী করেছে ২ লক্ষ মা বোনের। তারই ধারাবাহিকতায় হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন নোয়াখালী জেলা ব্যাপী রাজাকার হানাদারদের নির্যাতনের শিকার হয়েছে শত শত নিরস্ত্র বাঙালী জনতা। আর এই কুখ্যাত রাজাকারদের অনেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হয়েছে, অনেকেই আবার দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। কিন্তু তাদের মধ্যে মোহাম্মদ আলী ওরফে আগরা মিয়া নামে এক রাজাকার এখনো দেদার্সে তার অশুভ কর্মকান্ড তথা মানবতা বিরোধী কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। রাজাকার মোহাম্মদ আলী নোয়াখালী জেলার কবিরহাট উপজেলার সুন্দলপুর ইউনিয়নের পূর্ব রাজুর গাঁও গ্রামের মৃত মুকবুল আহাম্মদের ছেলে।
অনুসন্ধানে জানাযায়, কুখ্যাত রাজাকার মোহাম্মদ আলী ১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন সময় পাকিস্তানিদের দোসর হয়ে নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার স্থানীয় মিয়ারহাট বাজার সংলগ্ন গীরেন্দ্র মন্দার বাড়ি, হরিবাবুর বাড়ি, পাল বাড়ি, বনমালির বাড়ি, তেলী বাড়িসহ অসংখ্য হিন্দু বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে, লুটপাট ও তান্ডব লীলা চালায় বলে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ। ওই সময় পাকিস্তানি সৈন্যদের নিয়ে এসে তাদের বন্দুক দিয়ে নিজ হাতে তেলী বাড়ির বল্লার বাপ নামে এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে গুলি করে নৃশংস ভাবে হত্যা করে এই রাজাকার মোহাম্মদ আলী। ১৯৭১ সালে দেশব্যাপী যুদ্ধ চলাকালীন সময় রাজাকার মোহাম্মদ আলী তার বাহিনী নিয়ে যুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমিনের বাড়িতে হামলা চালালে প্রাণভয়ে বাড়ির লোকজন অন্যত্র পালিয়ে যায়। এই সুযোগে এই কুখ্যাত রাজাকার মোহাম্মদ আলী তাদের বাড়ি লুট করে, এমনকি হালের গরু নিয়ে পাকিস্তানি ক্যাম্পে জবাই করে উল্লাস ও উন্মাদনায় মেতে উঠে। রাজাকার মোহাম্মদ আলী ছিল স্থানীয় লোকজনের কাছে একজন আতঙ্ক, সে রাস্তা দিয়ে হাটার সময় ফাঁকা গুলি করতো, মানুষকে ভয় দেখিয়ে বাড়ি ঘর লুটপাট করতো। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবতা বিরোধী অপরাধে অপরাধিদের বিচারের আওতায় আনলেও এই কুখ্যাত রাজাকার মোহাম্মদ আলী ওরপে আগরা মিয়া প্রতাপশালী হওয়ায় সে বিচারের আওতায় আসেনি। এলাকাবাসী এই কুখ্যাত রাজাকার মোহাম্মদ আলীর বিচার চায়।
এ বিষয়ে স্থানীয় এলাকার বয়োবৃদ্ধ নুরেজ্জামান খোকন মেম্বার জানান, যুদ্ধকালীন সময় আমি তরতাজা যুবক। বয়স তখন ২৬। চোখের সামনে অনেক নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষকে মরতে দেখেছি। ওই সময় রাজাকার বাহিনীর প্রধান হিসেবে কাজ করতো মোহাম্মদ আলী। সে পাকিস্তানি সৈন্যদের নিয়ে মানুষের বাড়ি ঘরে আগুন দিতো ও লুটপাট করতো। আজ সেই মানবতা বিরোধী অপরাধ করেও বহাল তবিয়তে রয়েছে এবং বর্তমানেও সে মানুষের উপর নির্যাতন করে চলেছে। আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেও মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম উঠেনি। সময়ের পরিসরে রাজাকাররা দেশ পরিচালনা সহ অনেক অন্যায় নির্যাতন করছে। এই রাজাকার মোহাম্মদ আলীর নির্যাতন এখনো থেমে নেই। অন্যের জমি জোর পূর্বক দখল, জাল জালিয়াতি করে মিথ্যা দলীল সৃজন, হেন কোন অপরাধ নেই যা সে করতে পারে না। যুদ্ধকালীন সময় লুটপাট করা অর্থ দিয়ে আজ সে প্রতাপশালী হয়েছে। অর্থের দম্ভে নিরীহ মানুষের উপর অত্যাচার করছে। বর্তমান সরকার স্বাধীনতার স্বপক্ষের, তাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম চলছে। আমি মনে করি কুখ্যাত রাজাকার মোহাম্মদ আলী মানবতা বিরোধী অপরাধ করেছে, তার কঠিন বিচার হওয়া দরকার।
আরেক মুক্তিযোদ্ধা বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত রুহুল আমিন বাচ্চু অভিযোগ করেন, তিনিও মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। অস্ত্রের ভারে নইয়ে পড়ে কয়েকবার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তবুও পিছপা হননি যুদ্ধকালীন সময়ে দেশ মাতৃকার টানে। তিনি বলেন, এই রাজাকার মোহাম্মদ আলী আমার আপন চাচাতো ভাই হলেও সে ছিল স্বাধীনতা বিরোধী। আপন পর বাদ বিচার চিলনা তার কাছে। পাকিস্তানিদের দোসর হয়ে লুটপাট নির্যাতন করতো নিরস্ত্র বাঙালীর উপর। যুদ্ধকালীন সময় রাজাকার মোহাম্মদ আলী আমার চোখের সামনে তেলী বাড়ির বল্লার বাপকে গুলি করে হত্যা করে। আমাদের বাড়ি লুট করে এমনকি আমার হালের গরুটি নিয়ে সে পাকিস্তানি ক্যাম্পে জবাই করে আনন্দ উল্লাস করে। সে এখনো মানুষের উপর অন্যায়, অত্যাচার ও নির্যাতন করে চলেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ এই কুখ্যাত রাজাকার মোহাম্মদ আলীকে মানবতা বিরোধী অপরাধে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দিয়ে আমাদের মত মুক্তিযোদ্ধাদের হৃদয়ে শান্তি দিন।
স্থানীয় এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সহকারী সুলতান আহাম্মদ জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে আমিও স্বশস্ত্র যোদ্ধা ছিলাম। দেশ স্বাধীন হয়েছে, আমি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নেই, তাতে আমার কোন দুঃখ ও নেই। দুঃখ শুধু একটাই, রাজাকার মোহাম্মদ আলী মানবতা বিরোধী অপরাধ করেও বিচারের আওতায় আসেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকূল আবেদন অন্যান্য মানবতা বিরোধী অপরাধীদের সাথে রাজাকার মোহাম্মদ আলীর ও বিচার হোক। কেননা যুদ্ধের পর তৎকালীন বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম হাজী ইদ্রিস সাহেব রাজাকার মোহাম্মদ আলী, রাজাকার তোতলা কবির, রাজাকার লেদুমুন্সী ও রাজাকার আবুল কাশেমকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সাধারণ ক্ষমতা করেন। তারপর থেকে অন্য রাজাকাররা নিষ্কৃয় থাকলেও থেমে নেই রাজাকার মোহাম্মদ আলীর অন্যায়, অত্যাচার ও দস্যুতা। সে জাল দলীল সৃজন করে জোর খাটিয়ে মানুষের সম্পদ দখল করছে। তার অর্থ দাম্ভির্য ও শয়তানি শক্তির কাছে সাধারণ মানুষ অনেকটাই জিম্মি। তাই মানবতা বিরোধী অপরাধী হিসেবে রাজাকার মোহাম্মদ আলীর শাস্তি হওয়া দরকার। তবেই কলঙ্গ মুক্ত হবে মুক্তিযোদ্ধারা।
আরেক সক্রীয় মুক্তিযোদ্ধা বয়োবৃদ্ধ অসুস্থ জসিম উদ্দিন চিশতী কান্না জড়িত কন্ঠে এই প্রতিবেদককে জানান, চোখের সামনে ভেসে উঠছে নৃশংস অত্যাচারের চিত্র। রাজাকার মোহাম্মদ আলী পাকিস্তানি সৈন্যদের নিয়ে এলাকায় তান্ডব চালালে শত শত মানুষ দিক বি দিক ছুটাছুটি করেছে। ফাঁকা গুলির শব্দে স্তব্দ হয়ে যায় গোটা এলাকা। প্রাণ ভয়ে এলাকা ছেড়ে মা বোনেরা পার্শ্ববর্তী এলাকায় আশ্রয় নেয়। এই রাজাকার মোহাম্মদ আলী কয়েকটি হিন্দু বাড়িসহ মানুষের বাড়ি ঘরে লুটপাট ও তান্ডবলীলা চালায়। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরেও তার চরিত্র বদলায়নি। এখনো মানুষের উপর নির্যাতন করছে। দেশ স্বাধীনের পরে মরহুম হাজী ইদ্রিস সাহেব সাধারণ ক্ষমা করার পরই প্রথমে ছবিরপাইক মৌজার হাজী ইদ্রিসের জমি আত্মসাৎ করে সে। এরপর ধাপে ধাপে এলাকার সাধারণ মানুষের জায়গা জমি জাল দলীলের মাধ্যমে বাহুবল দিয়ে জোর খাটিয়ে দখল করেছে। তার অর্থ শক্তি ও শয়তানি বুদ্ধির কাছে আমরা নিরুপায়। সাধারণ মানুষতো দূরের কথা সম্মানের ভয়ে আমরাও তার বিরোধীতা করিনা। অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের মত আমিও তার বিচার ও শাস্তি দাবী করছি।
স্থানীয় এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত বাবুল মিয়া জানান, যুদ্ধকালীন সময় আমার বয়স ১৩ বছর ছিল। রাজাকার মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে রাজাকররা আমাকে পাকিস্তানি ক্যাম্প ধরে নিয়ে যায়। বহু নির্যাতন চালায় আমার উপর। পরে আমার বড় ভাই মমিনুল হক বাটু ও এলাকাবাসী গিয়ে আমাকে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করে। আমার দেখা মতে মোহাম্মদ আলী একজন কুখ্যাত রাজাকার, লুটপাট ও নির্যাতনকারী। আমি তার শাস্তি দাবী করি।
আরেক ক্ষতিগ্রস্ত ও মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী ফয়েজ আহাম্মদ জানান, মোহাম্মদ আলী নিরীহ মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। তার ভয়ে ও আতংঙ্কে এলাকাবাসী ছিল আতংঙ্কিত। সে রাস্তা দিয়ে হাটতে মানুষকে ভয় দেখাতো এবং ফাঁকা গুলি করতো। সে তেলী বাড়ির বল্লার বাপকে গুলি করে হত্যা করে। সে বহু হিন্দু বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে লুটপাট করেছে। এখনো সে থেমে নেই, মানুষের উপর নির্যাতন করছে। আমি এই কুখ্যাত রাজাকার মোহাম্মদ আলীর বিচার দাবী করি।
সুন্দলপুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি আবুল খায়ের আবুল মিয়া জানান, আমি যতদুর শুনেছি মোহাম্মদ আলী একজন রাজাকার ছিলেন। তার সাথে আরো কয়েকজন রাজাকার এই এলাকায় ছিলো। এরা নিরীহ মানুষের উপর অত্যাচার করতো। দুঃখ জনক হলেও সত্য এই সকল রাজাকাররা এখনো সরকারী সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করে।
এ বিষয়ে রাজাকার মোহাম্মদ আলীর সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মমিন বিএসসি আমার সম্পর্কে জানেন। আমি তাকে নিয়ে আপনার সাথে বসবো।
পরে জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মমিন বিএসসির সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মোহাম্মদ আলী একজন রাজাকার ছিলেন। দেশ স্বাধীনের পর স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা তাকে ধরে নিয়ে মারধর করলে সে ওখানে পায়খানা করে দেয়। সেই থেকে সে ওই এলাকায় আগরা মিয়া নামে পরিচিত।
স্থানীয় সুন্দলপুর ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি নুরুল আমিন রুমি জানান, মোহাম্মদ আলী একজন রাজাকার ছিলেন এটি নিশ্চিত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে কোন আপোষ নেই, সে যে দলেরই হোক। আপনারা আপনাদের লেখনীর মাধ্যমে সত্য ঘটনা তুলে আনবেন এটি আমি আশা করি।
এককথায় অশুভ শক্তির ছত্রছায়ায় রাজাকার মোহাম্মদ আলী দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। করছে অসহায় মানুষের উপর অত্যাচার, নির্যাতন। তার সাথে যোগ হয়েছে জাল জালিয়াতির চক্র। তারা মানুষের দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে রাজাকার মোহাম্মদ আলীর সহযোগীতায় মানুষের জমি জমা গ্রাস করে নিচ্ছে। এলাকায় ভূমি দস্যূ নামে অনেক খ্যাতি রয়েছে রাজাকার মোহাম্মদ আলীর। বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আর্ন্তজাতিক বিশেষ ট্রাইবুন্যালের মাধ্যমে কুখ্যাত রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইতিমধ্যে অনেককেই ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। আবার অনেকেই বিচারাধীন, থেমে নেই বিচার পক্রিয়া। দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যালের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দিয়ে একদিকে যেমন বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টি করে অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারদের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনে। এরই ধারাবাহিকতায় মানবতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধী মোহাম্মদ আলীর বিচার কেন হবেনা সেটি এখন নোয়াখালীবাসীর প্রশ্ন!






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *