নিজস্ব প্রতিনিধি , রাউজান :
রাউজানের একটি আলোকিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠেছে উপজেলার পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের উত্তর গুজরা গ্রামে ছায়া-সুুনিবিড় পরিবেশে অবস্থিত ১৪৫ নং উত্তর গুজরা ডাঃ রাজা মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব মফিজুর রহমান সওদাগরের মেঝ সন্তান, শিক্ষা অন্তপ্রাণ ব্যক্তি হিসেবে এলাকায় পরিচিত লিয়াকত আলী চৌধুরীর ব্যক্তি অর্থায়নে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো কিছু উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর বিদ্যালয়টি আধুনিক শিক্ষার একটি অনন্য পাঠশালা হিসেবে গড়ে উঠেছে। সম্প্রতি বিদ্যালয় পরিদর্শণে গিয়ে দেখা গেছে, আধুনিক শিক্ষার সবটুকু সুগোগ-সুবিধা বিদ্যমান রয়েছে এই শিক্ষা প্রতিষ্টানে।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির বিদ্যুৎসাহী সদস্য সাংবাদিক নেজাম উদ্দিন রানা বলেন, ১৯৭৪ সালে এলাকার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্টীর মাঝে শিক্ষার আলো ছড়ানোর লক্ষ্যে নিয়ে ১৯৭৪ সালে এলাকার অত্যন্ত সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ডাঃ রাজা মিয়ার নামে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্টা করেন তারই সুযোগ্য পুৃত্র তৎকালীন সময়ের অত্র এলাকার মধ্যে ম্যাট্রিক পাশ করা আলহাজ্ব মফিজুর রহমান সওদাগর। পৈত্রিক ৫৭ শতক জায়গার উপর বিদ্যালয়টি প্রতিষ্টার পর থেকে এলাকার পিছিয়ে পড়া বিশাল জনগোষ্টী শিক্ষার ছোঁয়া পেতে শুরু করে।
বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পূর্বে এলাকায় শিক্ষিত লোকের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। সেই সময়ে এলাকার বেশীর ভাগ পরিবার সন্তানদের লেখাপড়ার পরিবর্তে কৃষিকাজে মনোনিবেশ করতেন। কাছাকাছি কোনো বিদ্যালয় না থাকায় অধিক দূরত্বে সন্তানদের লেখাপড়ার করানোর প্রতি অনাগ্রহ ছিল অধিকাংশ পরিবারের। তন্মধ্যে যারাই লেখাপড়ার প্রতি বেশী আগ্রহী ছিল তাদেরকে কাদাপথ মাড়িয়ে প্রায় এক কিলোমিটার দুরের গুজরা শ্যামাচরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কিংবা তারও দ্বিগুণ দুরত্বে অবস্থিথ বিনাজুরী নবীন উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে লেখাপড়া করতে হতো। হাইস্কুলের গন্ডি পার হওয়ার পর দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে রাউজান কলেজে গিয়ে লেখাপড়া করতে হতো। তৎসময়ে গ্রামীণ সড়কগুলির এতই দুরাবস্থা ছিল যে কোনোরকমে প্রাইমারীর গন্ডি অতিক্রম করার পর লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহই হারিয়ে ফেলতো কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। বর্ষাকালে গ্রামের কাদাসিক্ত মেঠোপথে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে তটস্থ থাকতো বেশীরভাগ পরিবার। এলাকার মানুষ শিক্ষার দিক দিয়ে দিনদিন পিছিয়ে পড়ছে দেখে পিতার নামে বিদ্যালয় প্রতিষ্টার উদ্যোগ নেন এলাকার তৎসময়ের একমাত্র ম্যাট্রিক পাশ করা যুবক মফিজুর রহমান। প্রতিষ্টার পর থেকে এলাকার মানুষের সার্বিক সহযোগিতা নিয়ে দীর্ঘদিন স্কুলের ব্যয় নির্বাহ করেছেন। শুধু তাই নয় ১৯৯১ সালে প্রলয়ংকারী ঘূর্নিঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া বিধ্বস্ত স্কুল পূণঃমেরামত করে আবার শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনেন তিনি। বিদ্যালয় প্রতিষ্টার পর দীর্ঘসময় বিদ্যালয়ের খরচ সামলাতে গিয়ে অনেক প্রতিকূল অবস্থা সামলাতে হয়েছে তাকে। শেষে তাঁর দীর্ঘ সময়ের প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হলে বিদ্যালয় নিয়ে তার স্বপ্নের অগ্রযাত্রা আরো বেগবান হয়। পরবর্তী সময়ে বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হয়ে রাউজানের সাংসদ এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী বিদ্যালয়ে নতুন ভবন বরাদ্দ দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্টানটির আধুনিকায়নে বিশেষ অবদান রাখেন। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্টার পর থেকে এলাকায় শিক্ষার হার ফি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজকে বিদ্যালয়ের অনেক কৃতি শিক্ষার্থী দেশ-বিদেশে ভালো প্রতিষ্টানে কর্মরত আছেন। শুধু তাই নয় অজপাঁড়াগায়ের এই শিক্ষা প্রতিষ্টানটি আজ পুরো এলাকায় শিক্ষার একটি আলোকবর্তিকা হয়ে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে রেখেছে এক সময়ের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্টীকে।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আইয়ুব আলী সওদাগর ও সহ সভাপতি, পশ্চিম গুজরা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক বলেন, বর্তমানে ডাঃ রাজা মিয়া স্কুলটি একটি আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্টানে গড়ে উঠার পেছনে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্টাতা আলহাজ্ব মফিজুর রহমান সওদাগরের মৃত্যুর পর তারই সুযোগ্য সন্তান লিয়াকত আলী চৌধুরী তার প্রতিবছর বিদ্যালয়টির অবকাঠামোসহ নানাবিদ উন্নয়নমূলক কাজে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে বিদ্যালয়টিকে উপজেলার একটি আলোকিত শিক্ষা প্রতিষ্টান হিসেবে গড়ে তুলেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এগার লক্ষ টাকার অধিক ব্যয় সাপেক্ষে বিদ্যালয়ের সুদৃশ্য তোড়ণ, সীমানা প্রাচীর, মাঠ সম্প্রসারণ, শহীদ মিনার, সততা স্টোর, জাতীয় পতাকা উত্তোলণের ফ্লাটফর্ম, বিদ্যালয়ের চতুপার্শ্বে বাগান সৃজন, বিদ্যালয়ের প্রতিষ্টাতার নামে একটি আধুনিক পাঠাগার নির্মাণ, পাঠাগার ও বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষের জন্য আসবাবপত্র নির্মাণসহ বেশ কিছু উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন করেছেন। তন্মধ্যে স্কুলের অভিভাবক আর এলাকার কিছু প্রবাসী ৭৮ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছেন এবং রেলপথ মন্ত্রনালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী একলক্ষ টাকা তাৎক্ষণিক অনুদান দিয়ে বিদ্যালয়ের চলমান উন্নয়নে অশেষ অবদান রাখায় লিয়াকত আলী চৌধুরীকে ধন্যবাদ জানান এবং বিদ্যালয়ের উন্নয়নে সার্বিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়াও সেন্ট্রাল বয়েজ অব রাউজান এবং মানবতার কল্যাণে এসো কিছু করিসহ বেশ কিছু সংগঠনের উদ্যোগে বিদ্যালয়ে শিক্ষাউপকরণ বিতরণ করা হয়।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মরিয়ম বেগম বলেন, বর্তমানে বিদ্যালয়ে প্রাক প্রাথমিকসহ সবমিলিয়ে দেড়শত জন শিক্ষার্থী অধ্যায়নরত আছেন। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্টাতার পরিবারবর্গ এবং এলাকার কিছু শিক্ষা অন্তপ্রাণ ব্যক্তির সার্বিক সহযোগিতায় বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীর মাঝে উন্নতমানের পরিচয়পত্র প্রদান, স্কুল ডায়েরী, স্কুল ব্যাগ,স্কুল ড্রেস, বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা উপকরণ প্রদান করা হয়ে থাকে। ফলে একজন আদর্শ শিক্ষার্থীর যে উপকরণগুলো প্রয়োজন তার প্রত্যেকটি উপকরণ বিদ্যালয় থেকে বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। আর যার বার্ষিক পরীক্ষা, শিক্ষা সমাপনী এবং বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্ব সহকারে বিদ্যালয়ের সুনাম বয়ে আনছে তাদের পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে পুরষ্কৃত করার মধ্য দিয়ে উৎসাহ বাড়ানো হচ্ছে। শুধু তাই নয়