Main Menu

ভেজাল খাদ্য ও আমাদের দায় | বাংলারদর্পন

নিউজ ডেস্ক :

এক সময় দুধে পানি মিশিয়ে বিক্রি করাই ছিল চরম অপরাধ। পানি মেশানো দুধকেই ভেজাল হিসেবেও গণ্য করা হতো। এখন দুধে জীবনঘাতী উপাদানও মেলে। শুধু দুধ নয় দেশে সামগ্রিক নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তাই আজ হুমকির মুখে। ভেজাল খাদ্যের কারণে আমাদের জীবন এখন প্রায় খাদের কিনারে।

খাদ্যে বিষক্রিয়ার ফলে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট তিন বছরের খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা করে ৫০ শতাংশ খাদ্যে ভেজাল পেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অস্ট্রেলিয়ার ওলিংগং বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে গবেষণা জরিপ করে দেখেছে যে, দেশের মোট খাদ্যের ৩০ শতাংশে ভেজাল রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার ৬৬ শতাংশ রেস্তোরাঁর খাবার, ৯৬ শতাংশ মিষ্টি, ২৪ শতাংশ বিস্কুট, ৫৪ শতাংশ পাউরুটি, ৫৯ শতাংশ আইসক্রিম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি। এসব খেয়ে দেশের মানুষ আর সুস্থ নেই। গোটা দেশটাই অসুস্থ হয়ে পড়ছে।

এমন চিত্র কতইনা ভয়ঙ্কর। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা। এটি জাতির জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি করতে ব্যর্থ হলে জাতির জীবনে ভবিষ্যতে অন্ধকার নেমে আসতে পারে। বিষাক্ত ও ভেজাল খাবার খেয়ে সুস্থ স্বাভাবিক জাতি গঠন করা যায় না। আর একটি জাতির মস্তিষ্ক সুষ্ঠু স্বাভাবিক না থাকলে হাজার উন্নয়নেও কোন লাভ হবে না। ভেজাল ও বিষযুক্ত খাদ্যের প্রভাব হতে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে অতি বিত্তবান কেউ রেহাই পাচ্ছে না। ভেজাল ও অনিরাপদ খাদ্যের প্রভাবে দেশে এক ধরনের নীরব হত্যা ও অসুস্থতার মহামারী চলছে।

খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, যারা জেনেশুনে খাবারে ভেজাল দেয়, তারা ক্রিমিনাল। নিরাপদ খাদ্যের জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়াধীন জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ‘নিরাপদ খাদ্য : স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দেশে অনেক ভালো ভালো আইন রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে এসব আইন প্রয়োগ করতে হবে।

এক গবেষণা পত্র বলছে, রাসায়নিক ও বিষাক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে প্রতিবছর ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন দুই লাখ মানুষ। দেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে প্রতি ঘণ্টায় মারা যাচ্ছে ১৭ জনের বেশি রোগী। বছরে মারা যাচ্ছে দেড় লাখ মানুষ। আর ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রতিবছর সর্বস্বান্ত হচ্ছেন দেশের শতকরা ৭০ ভাগ মানুষ। দেশে দুই কোটিরও অধিক লোক কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতি ঘণ্টায় অকালে মারা যাচ্ছে পাঁচজন। প্রতি বছর গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নিচ্ছে ৫ লাখ। বছরে প্রায় ২০ লাখ মানুষের জীবন কেড়ে নেয় অনিরাপদ ভেজাল খাদ্য।

ভেজাল রোধে শুধু নিরাপদ খাদ্য অধ্যাদেশ নয়, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে একাধিক আইন রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য তৈরি, বিপণন এবং জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রয়েছে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি আইন। এ আইনের ২৭২ ও ৭৩ ধারায় খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ এর ২৫ গ ধারায় খাদ্যে ফরমালিন মেশানোর সঙ্গে জড়িত ও বিক্রয়কারীদের বিরুদ্ধে এবং ভেজাল খাবার বিক্রয়ের জন্য মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে খাদ্যে ভেজাল মেশানো বা ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার বিক্রয়ের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। এছাড়া সরকার সম্প্রতি নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ নামে একটি আইন করেছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে প্রকাশিত স্বাস্থ্য বুলেটিন (২০১৪) এ উল্লেখ করা হয়েছে ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথের (আইপিএইচ) পরীক্ষাগারে ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালে মোট ২৮ হাজার ১৮৮টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়, যার ৪৯ শতাংশ ভেজাল মিশ্রিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালে আইপিএইচ যথাক্রমে ৬ হাজার ৩৩৮টি, ৫ হাজার ৭৪৯টি, ৫ হাজার ৮১২টি, ৫ হজার ৩২২টি এবং ৪ হাজার ৯৬৭টি খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ভেজালের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে যথাক্রমে ২ হাজার ৯৮২, ২ হাজার ৯৯০, ৩ হাজার ১৪৭, ২ হাজার ৫৫৮ এবং ২ হাজার ১৩৭টি নমুনায়। ২০১১ সালের পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি ভেজালের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যার মাত্রা ছিল ৫৪ দশমিক ৪ ভাগ। যদিও বর্তমানে এ হার কমে দাঁড়িয়েছে ৪৩ দশমিক ০২ ভাগে।

সরকার খাদ্যে ভেজাল রোধে জোরালো অভিযান শুরু করেছে। আমরা চাইব না এর কোন ব্যর্থ পরিণতি। আমরা নিরাপদ খাদ্য পেতে চাই; আমাদের সন্তানের মুখে তুলে দিতে চাই নিরাপদ খাদ্য। আপনার-আমার, এ রাষ্ট্র সম্মিলিতভাবে জেগে উঠুক ভেজালের বিরুদ্ধে। খাদ্যে ভেজালের বলি যেন আর কেউ না হোন এই আমাদের প্রত্যাশা। ‘ভেজাল দেব না, ভেজাল খাব না, ভেজাল কারবারীদের আর রক্ষা নেই’ এই হোক আমাদের স্লোগান।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *