নুর উল্লাহ কায়সার:
নানা সমস্যায় শম্বুক গতিতে চলছে ফেনীর উপকূলীয় অঞ্চল সোনাগাজীতে স্থাপিত মিল্কভিটা’র কার্যক্রম। চিকিৎসার অভাবে গরু মহিষ মরে যাওয়া, উৎপাদিত দুধের বাজার দর না পাওয়া, চাহিদা মত ঋন সুবিধা না থাকায় দিন দিন অচলাবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি গুলোতে। এসব সমস্যায় অনেকেই খামার ব্যবস্থাপনার পেশা পাল্টিয়ে অন্য পেশায় কাজ শুরু করেছেন। যারা দুগ্ধ উৎপাদনে জড়িত রয়েছেন তারাও দুশ্চিন্তায় দিনাতিপাত করছেন।
জানা যায়, ২০০৮ সালের ১২ জানুয়ারী সোনাগাজী পৌর সভার চরগনেশ গ্রামে একটি দ্বোতলা বাড়ি ভাড়া নিয়ে বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড (মিল্কভিটা) দুগ্ধ শীতলীকরণ কারখানা স্থাপন করে। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সোনাগাজীর সন্তান সিএস করিম এবং সেনাবাহিনীর লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর প্রচেষ্টায় মিল্কভিটাটি চালু হওয়ায় ওই অঞ্চলে একের পর এক গরু ও মহিষ খামারী গড়ে ওঠতে থাকে। খামারীদের নিয়ে উপকূলীয় সোনাগাজীতে গড়ে ওঠে ৩২টি দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি। শর্ত অনুযায়ী কমপক্ষে একটি দুধেল গাই, ১০ টাকার শেয়ার ও ১ টাকার ভর্তি ফি দিয়ে অন্তত ৬ শতাধিক খামারী এসব সমিতির সদস্য পদ লাভ করে। সমিতির সদস্যপদ টিকিয়ে রাখতে হলে বছরে সর্ব নি¤œ ১৫০ কেজি দুধ মিল্কভিটাতে সরবরাহ করার বিধান সবাই পালন করতো।
সদস্যরা মিল্কভিটা কর্তৃপক্ষ বিনামূল্যে দুগ্ধদানকারী গরু-মহিষের চিকিৎসা, কম দামে ওষুধ ও খাদ্য সরবরাহ, কৃত্রিম প্রজনন সুবিধা ও খামারিদের ঋণ দানসহ বিভিন্ন প্রকারের প্রেষণা অব্যাহত রাখতেন। এসব সুবিধা ভোগ করে একদিকে খামারীরা প্রচুর লাভবান হতেন অন্যাদিকে সহজেই দুধ সংগ্রহ করে টার্গেট পূরণ করতে পারতেন কর্তৃপক্ষের। নগদ অর্থের বিনিময়ে দুধ বিক্রি করতে পারায় স্বচ্ছন্দেই থাকতেন খামারীরা।
কিন্তুু দিন যেতে যেতে ক্রমেই দূর্বল হয়ে পড়ে ৫ হাজার লিটার দুধ প্রক্রিয়াজাত করনের ক্ষমতা সম্পন্ন মিল্কভিটা কারখানাটি। চাহিদামতা সেবা দিতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে খামারীরা। উৎপাদন খরচের তুলনায় দুধের দাম কম হওয়ায় ক্রমেই নিস্ক্রীয় হতে শুরু হয়েছে দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি গুলো। প্রতিষ্ঠার ৮ বছর পরও পরিধি না বেড়ে দিন দিন লোকসান গুনতে শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিদিন ৪ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ ও প্রক্রীয়াজাতকরনের টার্গেটে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ৭ থেকে ৮শ লিটারের বেশি দুধ সংগ্রহ করতে পারছেনা।
খামারীরা জানায়, বর্তমান খোলা বাজারে প্রতি লিটার দুধের দাম ৭০-৮০ টাকা হলেও মিল্কভিটা কর্তৃপক্ষ খামারীদের দেয়া দুধের প্রকার ভেদে দাম দেন ৩২ থেকে ৫৮ টাকা। তাদেরকে নায্য মূল্যে গরু খাদ্য সরবরাহ করার কথা থাকলেও সেটি কাগজে কলমেই রয়ে গেছে। এছাড়াও স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ প্রদান, গাভীর সুপেয় পানীয় জলের জন্য গভীর নলকুপ স্থাপন ও পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহের কথা থাকলেও এসব সুবিধা বঞ্চিত এ এলাকার খামারীরা।
উত্তর চরচান্দিয়া দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি নাসির উদ্দিন অপু জানান, কারখানায় দুধ নিয়ে গেলে স্বল্প পরিসরের এ কার্যালয়ে খামারীদের দাঁড়ানোরও জায়গা থাকেনা। এখনও ঘাস চাষের জন্য প্রতিশ্রুত কোন জমি বরাদ্ধ পাননি এখানকার খামারীরা। এছাড়াও কারখানাটিতে প্রধান ভ্যাটেনারী সার্জনের পদটি দীর্ঘদিন যাবত শুন্য রয়েছে। ফলে পশুর জটিল কোন রোগ দেখা দিলে খামারীদের ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের পশু হাসপাতালে যেতে হয়। কিন্তুু ওই হাসপাতালেও নেই কোন ওষুধ। এখান থেকে শুধুমাত্র ব্যবস্থাপনা পত্র পেয়েই সন্তুুষ্ট থাকতে হয় খামারীদের। এসব কারনে ইতিমধ্যে দুগ্ধ খামারী ও কৃষকদের মধ্যে নানা ধরনের হতাশা দেখা দিয়েছে। দিন দিন লোকসান বাড়ায় অনেকেই দুগ্ধ খামার ব্যবস্থাপনা থেকে নিজেকে ঘুটিয়ে নিয়ে অন্য পেশায় কাজ করছেন।
এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা হয় ব্যবস্থাপক মোঃ মাঈন উদ্দিন আহম্মেদের সাথে। তিনি জানান, কারখানাটির পরিধি বাড়াতে ইতিমধ্যে চরচান্দিয়া ইউনিয়নের ভূঞার বাজার এলাকায় ২০ শতক ভূমি কেনা হয়েছে। এখানে ভ্যাটেনারী সার্জন না থাকলেও খামারীদের গবাদি পশুর চিকিৎসা দিতে ৩ জন চিকিৎসক কাজ করছেন। প্রতিষ্ঠানের আওতায় গঠিত সমিতির সদস্যদেরকে অষ্টেলিয়া থেকে আমদানীকৃত উন্নত জাতের ঘাষের পর্যাপ্ত পরিমান বীজ বিতরণ করা হচ্ছে। শুরুতে প্রতিটি গাভী কেনার জন্য ৫০ হাজার টাকা ঋন দেয়া হলেও বর্তমানে ৭৫ হাজার টাকা ঋন দেয়া হচ্ছে। আগামীতে প্রতিটি গাভী কেনার জন্য ১ লক্ষ ২০ টাকা পর্যন্ত ঋন দেয়া হবে বলে জানান এ কর্মকর্তা। বাজার মূল্য থেকে কম দামে দুধ কেনার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা মূলত দুধে বিদ্যমান চর্বি ও অন্যান্য উপাদানের অনুপাতেই দুধের দাম নির্ধারন করি। এ ক্ষেত্রে বাজারের মূল্যের সাথে দামের সমন্বয় করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়না।