Main Menu

কিবরিয়া হত্যা : বিচার না পাওয়ার হতাশায় ১৩ বছর ★ বাংলারদর্পন

 

ডেস্ক রিপোর্ট :

১৩ বছর আগের প্রকাশ্যে জনসভায় ৯০ দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থনীতিবিদ শাহ আ স ম কিবরিয়া হত্যার বিচারের অপেক্ষায় কেটে গেল ১৩টি বছর। কবে এই বিচার শেষ হবে, দোষীরা সাজা পাবে-সেই অপেক্ষায় কিবরিয়া ভক্ত, নিহতদের স্বজন আর আহতরা। কিন্তু একেকটি বছর পার হচ্ছে আর হতাশা, ক্ষোভ বাড়ছেই।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার মতো বিএনপি-জামায়াত জোট সরাকারের আমলে এই মামলাটিও ভিন্নখাতে নেয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রকৃত আসামিদেরকে বাঁচিয়ে অন্যদেরকে ফাঁসানোর প্রমাণ মেলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। আর বাদী এবং কিবরিয়া পরিবারের আপত্তির কারণে মামলাটি তদন্ত হয়েছে তিন বার।

আর তদন্তেই কেটে যায় সাত বছর। এর পরের ছয় বছরেও আসামিপক্ষের নানা কৌশলের কারণে বিচার শেষ করা যায়নি। যদিও মামলা দ্রুত শেষ করার জন্য পাঠানো হয়েছিল দ্রুত বিচার আদালতে। তবে কবে শেষ হবে, সে বিষয়েও কিছু বলতে পারছেন না আদালত সংশ্লিষ্টরা।

এই ঘটনায় করা হত্যা মামলাটি সিলেটের দ্রুত বিচার আদালতে বিচারাধীন। বিস্ফোরক মামলাটিও বিচারের জন্য প্রস্তুত হয়েছে।

মামলাটি দ্রুত শেষ করতে হবিগঞ্জ জেলা দায়রা জজ আদালত থেকে সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয় ২০১৫ সালের ১১ জুন। বিচারক অভিযোগ গঠন করে ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করেন।

এই মামলায় ৩২ জন আসামির মধ্যে জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান ও তার তিন সহযোগীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। আর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১০ জন কারাগারে। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তার উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরীসহ সাত জন পলাতক। আর সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীসহ ১২ জন জামিনে আছেন।

মামলাটি কেন শেষ করা যাচ্ছে না-জানতে চাইলে সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি কিশোর কুমার কর  জানান, ‘এই মামলার বেশিরভাগ আসামি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্য মামলায় বন্দী। আবার হবিগঞ্জ থেকে সাক্ষীদেরও আদালতে সময় মত হাজির করা যাচ্ছে না। আর গত ছয় মাস ধরে সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি, কারণ বিচারক ছুটিতে বিদেশে।’

আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিক ধার্য আছে। ১৭১ জন সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্তÍ ৪৩ জনের সাক্ষ্য শেষ হয়েছে বলেও জানান কিশোর কুমার।’

আহতরা ক্ষুব্ধ –

হবিগঞ্জের সংসদ সদস্য আবু জাহির ওই হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন।  তিনি বলেন, ‘আমি বেচে থাকার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। ভারতে গিয়ে চিকিৎসা করে সুস্থ হলেও এখনও আমার গায়ে গ্রেনেডের শত শত স্পিøন্টার রয়ে গেছে, পায়ে স্টিল লাগানো। এই মামলার বিচার কবে শেষ হবে, আমি সেই অপেক্ষায়।

স্ক্র্যাচে ভর দিয়ে চলেন আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল্লাহ সরদার। তিনি বলেন, ‘সেদিন বিকট শব্দের পর আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। কিছুই মনে ছিল না আর। দীর্ঘ চিকিৎসায় সুস্থ হলেও কোনভাবে চলাফেরা করি।’

আহত কুদ্দুছ মিয়া বলেন, ‘আমরা অনেক কষ্টে আছি। সেই দিনের কথা ভাবলে এখনও ভয় লাগে।’

নিহত আব্দুর রহিমের স্ত্রী আফিয়া খাতুন জানান, ‘মৃত্যুর আগে আসি স্বামী হত্যার বিচার দেখে যেতে চাই।’

নিহত ছিদ্দিক আলীর ছেলে কুদ্দুছ মিয়া বলেন, ‘আমার গোটা পরিবার হতাশ। এই মামলা কবে শেষ হবে জানতে চাই।’

বর্বর হামলা ও হেলিকপ্টার পাঠাতে বিএনপি সরকারের অনীহা

১৩ বছর আগের রক্তাক্ত ঘটনাটি এখনও মানসপটে তাজা। প্রকাশ্য জনসভায় গ্রেনেড হামলা করে হত্যা করা হয়েছে দেশবরেণ্য একজন অর্থনীতিবিদকে। আর তাকে হত্যার জন্য চালানো হামলায় প্রাণ যায় আরও চার জনের।

২০০৪ ও ২০০৫ সালে বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর একের পর এক হামলা হয়েছে। হামলার ধরণগুলো যুদ্ধক্ষেত্রের মতো। আর এমন একটি হামলা হয় ২০০৫ এর ওই বছরের ২৭ জানুয়ারি। হবিগঞ্জের বৈদ্যেরবাজারে বিকালে জনসভা করতে গিয়েছিলেন প্রিয়মুখ কিবরিয়া। কিন্তু ফিরেছেন রক্তাক্ত হয়ে।

কিবরিয়া ছাড়াও সেদিন প্রাণ হারান আওয়ামী লীগের চার জন নেতাকর্মী। আহত হন হবিগঞ্জ-৩ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আবু জাহিরসহ অন্তত ৭০ জন নেতাকর্মী।

আহতরা এখনও কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। বিভীষিকাময় সেই দিনের কথা মনে করে আজও আঁৎকে উঠেন তারা।

আকারে ছোটখাটো কিবরিয়া আসলে ছিলেন একজন মহীরুহের মতো। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত অর্থমন্ত্রী ছিলেন তিনি। ২০০১ সালে হবিগঞ্জ-৩ আসন থেকে নির্বাচিত হন তিনি। মানুষটি সাধারণ জনগণের সাথে সহজেই মিশতে পারতেন বলে তাঁর জনসভা ছিল কানায় কানায় পূর্ণ।

বক্তব্য শেষে যখন তিনি মঞ্চ থেকে নেমে সহকর্মীদের নিয়ে বৈদ্যের বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গেইটে আসেন তখনই দিনের আলো নিভে প্রায় সন্ধ্যা। হঠাৎ করেই বিকট শব্দ। হুড়োহুড়িতে চারদিকে গগনবিদারী চিৎকার।

গ্রেনেডের আঘাতে অনেকেই ক্ষতবিক্ষত। খবর পেয়ে দূরে থাকা লোকজন ছুটে আসে ঘটনাস্থলে। কিবরিয়াসহ আহতদের নিয়ে ছুটে যান হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে।

মুখে মুখে খবর ছড়িয়ে পড়ে গোটা শহরে। হাসপাতালে তখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ঘটনার আকস্মিকতায় চিকিৎসকরাও তখন হতবিহ্বল। কিবরিয়ার রক্তক্ষরণ কোন ভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছিল না। স্থানীয় প্রশাসন ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে যোগাযোগ করা হয় হেলিকপ্টারের জন্য। কিন্তু সে সময়ের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার হেলিকপ্টার পাঠাতে রাজি হয়নি।

বাধ্য হয়ে কিবরিয়া ও হবিগঞ্জ-৩ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আবু জাহিরকে ঢাকা পাঠানো হয় অ্যাম্বুলেন্সে। কিন্তু ঢাকায় আনার পর চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন কিবরিয়াকে। স্তম্ভিত হয়ে পড়ে গোটা জাতি। হরতাল অবরোধে হবিগঞ্জ শহর কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

হামলায় কিবরিয়ার ভাতিজা শাহ মনজুরুল হুদা, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রহিম, আবুল হোসেন ও সিদ্দিকও আলী প্রাণ হারান।

সাত বছর ধরে তদন্তে যা যা ঘটেছে

হামলার পরদিন হবিগঞ্জ আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আবদুল মজিদ খান হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন। কিন্তু জোট সরকারের আমলে অন্য অনেক মামলার মতো এই মামলাটিও ভিন্নখাতে নেয়া হয়।

সিআইডির তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সি আতিকুর রহমান মামলাটি তদন্ত করে ১০ জনের বিরুদ্ধে ওই বছরের ২০ মার্চ অভিযোগপত্র দেন। এতে তৎকালীন জিয়া স্মৃতি ও গবেষণা পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আবদুল কাইয়ুম, জেলা বিএনপির কর্মী ও ব্যাংক কর্মকর্তা আয়াত আলী, কাজল মিয়া, জেলা ছাত্রদলের সহ-দপ্তর সম্পাদক সেলিম আহমেদ, জিয়া স্মৃতি গবেষণা পরিষদ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সাহেদ আলী, বিএনপি কর্মী তাজুল ইসলাম, জয়নাল আবেদীন জালাল, ইউনিয়ন বিএনপি নেতা জমির আলী, ওয়ার্ড বিএনপি নেতা জয়নাল আবেদীন মোমিন ও ছাত্রদল কর্মী মহিবুর রহমানকে অভিযুক্ত করা হয়। আব্দুল কাইয়ুমকে স্বীকারোক্তির জন্য ৪৭ দিন রিমান্ডে নেন তদন্ত কর্মকর্তা।

কিন্তু এই অভিযোগপত্র সাজানো অভিযোগ করে ২০০৬ সালের ৩ মে নারাজি দেন মামলার বাদী আবদুল মজিদ খান। সিলেট দ্রুত বিচার আদালতে আবেদন খারিজ হলে ১৪ মে তিনি হাইকোর্টে আপিল করেন। এরপর ঘটে নানা ঘটনা।

সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম আরেক দফা তদন্ত করে ২০১১ সালের ২০ জুন আরও ১৪ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেন। তখন আসামি করা হয় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নানকেও, লস্কর ই তৈয়বা সদস্য আব্দুল মজিদ কাশ্মীরি, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজ উদ্দিন, মহিউদ্দিন অভি, শাহেদুল আলম দিলু, সৈয়দ নাঈম আহমেদ আরিফ, ফজলুল আলম মিজান, মিজানুর রহমান মিঠু, মোহাম্মদ আব্দুল হাই, মোহাম্মদ আলী, মুফতি সফিকুর রহমান, বদরুল এনায়েত, মো. বদরুল ও বদরুল আলম মিজানকে।

২০১১ সালের ২৮ জুন কিবরিয়ার স্ত্রী আসমা কিবরিয়া হবিগঞ্জ বিচারিক আদালতে এই অভিযোগপত্রেও না-রাজি দেন।

আসমা কিবরিয়া বলেন, অভিযোগপত্রে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, চারদলীয় অন্যান্য মন্ত্রী ও নেতা কর্মীদের যোগসাজস ও হরকাতুল জিহাদের সহায়তায় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, সিলেটের মেয়র বদর উদ্দিন কামরানের উপর দুই দফা হামলা, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা হকের বাসায় গ্রেনেড হামলা, বৃটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর গ্রেনেড হামলা, সুরঞ্জিত সেনের জনসভায় গ্রেনেড হামলা ও কিবরিয়ার উপর বৈদ্যের বাজারে গ্রেনেড হামলার কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু বাবর ছাড়া জোট সরকারের মন্ত্রীদের অন্য কারো নাম অভিযোগপত্রে নেই। তাই তা যথাযথভাবে তৈরি হয়নি।

পরে মামলাটি সিলেটে পাঠানো হয়। আর ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি আরও তদন্তের নির্দেশ দেন সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক দিলীপ কুমার বণিক।

২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর হবিগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম রোকেয়া আক্তারের আদালতে তৃতীয় সম্পূরক অভিযোগপত্র দেন সিলেট অঞ্চলের তৎকালীন সিনিয়র এএসপি মেহেরুন নেছা পারুল। এতে নতুন ১১ জনকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এরা হলেন সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌর মেয়র জি কে গউছ, বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী, মুফতি আব্দুল হাই, মুফতি তাজ উদ্দিন, মুফতি সফিকুর রহমান, মোহাম্মদ আলী, বদরুল, মহিবুর রহমান, কাজল আহমেদ, হাফেজ ইয়াহিয়া।

আগের অভিযোগপত্রে নাম আসা ইউসুফ বিন শরীফ, আবু বক্কর আব্দুল করিম ও মৃত আহছান উল্লাহকে অব্যাহতির আবেদনও করা হয়। ৩ ডিসেম্বর অভিযোগপত্রে ত্রুটির কথা উল্লেখ করে সংশোধিত অভিযোগপত্র দেয়ার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। আর ২১ ডিসেম্বর এই সংশোধিত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আদালত।

২৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে ৩৫ জনকে আসামি ও ১৭১ জনকে সাক্ষী করেন তদন্ত কর্মকর্তা মেহেরুন নেছা পারুল।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *