মানিকগঞ্জ : ০৬ নভেম্বর ২০১৭ সোমবার।
হরিরামপুরের বাহাদুরপুরে পদ্মা নদীর সঙ্গে ইছামতি নদীর সংযোগস্থলে বাঁধ দেওয়ার কারণে পদ্মা, যমুনা, ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গাসহ অন্যান্য নদী ও খাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আর এ কারণে জেলার ঘিওর শিবালয় ও হরিরামপুরসহ অন্যান্য উপজেলার সঙ্গে নৌ-যোগাযোগসহ অনেক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন লাখো মানুষ। ফলে বড় ধরনের লোকসানের মধ্যে পড়েছে কৃষক, শ্রমিক,ব্যবসায়ী, জেলে, মাঝিসহ সর্বস্তরের মানুষ।
গত বছর বন্যার আগে হরিরামপুর উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর বাজার এলাকায় পদ্মার সঙ্গে ইছামতি নদীর সংযোগস্থলে এই বাঁধ দেওয়া হয়।
ইছামতি নদীটি শিবালয় উপজেলার জাফরগঞ্জ এলাকায় যমুনা নদীর সঙ্গে, ঘিওর উপজেলার মাইলাগি এলাকায় ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে, তরা এলাকায় কালীগঙ্গা নদী এবং হরিরামপুর উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের বাহাদুপুর বাজার এলাকায় পদ্মার সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
বাঁধের কারণে গোপীনাথপুর, চরপাড়া, কপালীপাড়া, মধ্যপাড়া, ভাটিপাড়া, ডেগির এলাকার প্রতিটি চকে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এ কারণে গেলো বছর চৈতালির আবাদ সময়মত করতে পারেননি কৃষকেরা। তারা নিজ খরচে পানি অপসারণ করে সেখানে চাষাবাদ করে। এছাড়া নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছের চাষ করায় সেখানকার পানি দৈনন্দিন কাজে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এদিকে নদীতে পানি প্রবাহ চলমান না থাকায় বদ্ধ জলাশয়ে মশা ও কচুরিপানা বংশ বিস্তার করছে।
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ বাংলাইনসাইডারকে জানান, বাহাদুরপুর বাজার এলাকার পদ্মা নদীর সংযোগস্থল থেকে জাফরগঞ্জ এলাকার যমুনা নদীর মিলনস্থল পর্যন্ত ইছামতির দৈর্ঘ্য ৩৬ কিলোমিটার। বিভিন্ন এলাকায় অন্যান্য নদীর সংযোগস্থল পর্যন্ত এই নদীটির দৈর্ঘ্যও প্রায় একই রকম। শুধু তাই নয়, এই জেলার অভ্যন্তরীণ আরো ছোট ছোট ছয়টি নদী এবং অসংখ্য খালের সঙ্গে এই নদীর সংযোগও রয়েছে।
গত বুধ ও বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে বাহাদুরপুর, রামকৃষ্ণপুর, কপালীপাড়া এবং আশপাশের এলাকার শিক্ষক, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, জেলে, মাঝি, এবং জনপ্রতিনিধিসহ সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীতে বাঁধ দেয়ায় পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে অন্যান্য নদী থেকে এই নদীতে মাছ আসতে পারছে না। এ কারণে এই এলাকার জেলেরা মাছ ধরতে না পেরে কষ্টে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
ইঞ্জিনচালিত আর ছোট নৌকা চালিয়ে যাদের জীবিকা নির্বাহ হতো আজ তারাও মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।
রামকৃষ্ণপুর এলাকারা কয়েকজন নৌকার মাঝি জানান, তারা বংশগত ভাবেই বাহাদুরপুর বাজার ঘাটে নৌকা চালিয়ে রোজগার করতেন। এখন নদীর উপরে বাঁধ দেওয়ায় তা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে তাদের একমাত্র আয়ের উৎসও কমে গেছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে সামনের দিনগুলো কিভাবে চলবেন তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন পার করছেন।
ওই এলাকার স্থানীয় বৃদ্ধ রফিক (৬৩) বলেন, ইছামতি নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। গেলো বছর বাঁধ দেয়াতে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পদ্মা, যমুনা কিংবা অন্য নদীগুলো থেকে মাছ আসতে পারছে না। ফলে নদীতে মাছ না থাকায় খুবই কষ্টে আছেন।
ঝিটকা বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, ঝিটকা বাজার পুরো জেলার বড় কয়েকটি বাজারের মধ্যে অন্যতম। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকার হাজারও লোক বিভিন্ন পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য ইছামতি নদীপথ একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু নদীর উপর কয়েকটি বাঁধ থাকায় এই বাজারে পণ্য আমদানি অনেক কমেত গেছে। এতে ক্রেতা-বিক্রেতারা অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। দেশে বিভিন্ন এলাকা থেকে যে সকল যেসব ব্যবসায়ীরা আসতো এখন তারা আর আসে । হরিরামপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের তিনটি ইউনিয়নের লোকজন নদীপথে এই বাজারে মালামাল নিয়ে এখন আর আসতে পারে না। যার ফলে বাজারে বেচাকেনা কমে গেছে। ঝিটকা বাজারের ব্যবসায়ীরা বাঁধটি দ্রুত ভেঙে ফেলার দাবি জানান।
গালা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিক বিশ্বাস বলেন, এই বাঁধ নদীভাঙন রোধ করবে এমন কথারও কোনো যৌক্তিকতা নেই। বরং বাঁধ নির্মাণের ফলে হরিরামপুর উপজেলার চরাঞ্চলের লোকজন তাদের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর জন্য ঝিটকা হাটে নৌকা নিয়ে আসতে পারছে না। এতে করে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি জেলে, মাঝি ও জনসাধারণও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, এই বাঁধ এখন কৃষকের গলার কাটা হয়ে দাড়িয়েছে। বন্যার পানি জমি থেকে না নেমে যাওয়ার কারণে কৃষকরা জমিতে চাষাবাদ করতে পারছে না।গত ২৭ অক্টোবর উপজেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটিতে বাঁধটি ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত হওয়ার পরেও কেন এখনও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
দ্রুত বাঁধ ভেঙ্গে ফেলার দাবি জানিয়ে এলাকাবাসী অভিযোগ বাঁধ তৈরি করে জলাশয়ে মাছের চাষ করে বিপুল পরিমান টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কিছু অসাধু ব্যাবসায়ীরা। গত বছর জেলেদের পাশাপাশি এলাকাবাসীও ওই জলাশয়ে মাছ আরহরণ করতে গেলে সরকার দলীয় কিছু লোকজন বাঁধা দেয়। পরে তাদের অপেক্ষা করে মাছ আরহণ করতে গেলে পুলিশ এসে মাছ ধরা বন্ধ করে দেয়। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ওই এলাকার সুশীল ও সচেতন মহল মনে করছেন বাঁধটি দ্রুত অপসারণ না করা হলে যেকোন সময় বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে।
নদীতে বাঁধ ও মাছ চাষের ব্যাপারে মুঠোফোনে জানতে চাইলে হরিরামপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস-চেয়ারম্যান আবুল বাশার সবুজ বাংলাইনসাইডারকে বলেন, ইছামতি নদীতে পানি প্রবাহ সচল রাখার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীতে খনন কাজ করছে। গত বছরের বর্ষা মৌসুমে এই খনন কাজ শুরু হওয়ার সময় বাহাদুরপুর বাজার ও তিন কিলোমিটার উত্তরে কপালীপাড়া এলাকায় নদীতে বাঁধ দেয়া হয়। খননকাজ শেষ হলে এই বাঁধ অপসারণ করার কথা। কিন্তু পদ্মা নদীর ভাঙন থেকে বাহাদুরপুর, রামকৃষ্ণপুর এলাকা রক্ষার্থে ওই এলাকার সংখ্যক লোকজন বাঁধটি আপসারণের বিপক্ষে রয়েছেন। ফলে উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন বাল্লা চালা ও গোপীনাথপুর এলাকায় কয়েকশত বিঘা জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে তিন এলাকার সাধারণ কৃষকরাও ব্যাপক ক্ষতির আসঙ্কায় রয়েছে। এছাড়া ঝিটকা এলাকায় সেতু নির্মাণের কাজ চলমান থাকায় সেখানেও নদী পার হওয়ার জন্য একটি বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। এই সেতুর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে নদীর সকল বাঁধ অপসারণ করে পানি প্রবাহ ঠিক রাখা হবে।
তবে নদীতে বাঁধ তৈরি করে মাছ চাষের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, মাছ চাষের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, গত বছর এলাকাবাসীদের সঙ্গে নিয়ে একটি কমিটি করে মাছ চাষ করা হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছর এই জলাশয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে না্।
নদীতে বাঁধ দেওয়ার ব্যাপারে মুঠোফোনে জানতে চাইলে হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী আরেফিন রেজোয়ান বাংলাইনসাইডারকে বলেন, মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক ইছামতি নদীতে খনন কাজের সময় এই বাঁধটি দেওয়া হয়েছিল। ওই এলাকার স্থানীয় কিছু লোকজন বাঁধটি ভাঙ্গার বিপক্ষে থাকার কারণে ভাঙ্গা সম্ভব হয়নি।