রাষ্ট্রতন্ত্র ভাবনা | হাসিব চৌধুরী | বাংলারদর্পণ

হাসিব চৌধুরী

ধর্ম ,সমাজতন্ত্র ,রাজতন্ত্র নাকি গণতন্ত্র ? কোন ব্যবস্থায় কোন পথে একটি রাষ্ট্রে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব ? এই সব নিয়ে চিন্তাশীল মানুষের অনেক প্রশ্ন ,অনেক মতভেদ। আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর মধ্যে থেকেও অনেকেই বলছেন সমাজতন্ত্র ছাড়া কোনোভাবেই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সুফল পাওয়া সম্ভব নয় ,আর যারা ধর্ম বিশ্বাসী ,বিশেষ করে যারা কট্টর মুসলিম সম্প্রদায়, তাদের মতে বিশ্ব-শাসন একমাত্র ‘শরিয়া’ কায়েম ছাড়া মুক্তির অন্য কোনো পথ নাই ।

বর্তমান বিশ্ব রাজনৈতিক কার্যক্রমে ধর্মের ব্যবহার তেমন লক্ষ করা যায় না অথবা কালের বিবর্তনে এই আধুনিক সময়ে এর প্রয়োগে কত টুকু কার্যকর এ নিয়ে রয়েছে অনেক প্রশ্ন। ইতিহাস সাক্ষী ধর্ম তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যে যুগের পর যুগ প্রচেষ্টা করে শুধু ব্যার্থ-ই হয়নি জন্ম দিয়েছে বড় বড় যুদ্ধ বিগ্রহের ,তৈরী করেছে ভীবৎস রক্তাক্ত ইতিহাস।

বর্তমান সভ্য মানুষেরা এই পৃথিবীকে তার নিজেস্ব গ্রাম মনে করছে এবং সংস্কৃতি , আচারে আচরণে ও শিক্ষা প্রযুক্তির বিনিময়ে ইতিমধেই ঘটিয়ে নিয়েছে ব্যপক পরিবর্তন। আধুনিক মানুষেরা ধর্মকে বেছে নিয়েছে একান্ত ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় হিসাবে। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় অর্থনীতি ,রাষ্ট্রনীতি ,মানবিক উন্নয়নের ধারা , প্রতিরক্ষা , শিক্ষার প্রসার ,অজানাকে জানার প্রচেষ্টা ,সাংস্কৃতিক বিনিময় , বিজ্ঞান-প্রযুক্তি সব কিছুই ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় রাজতন্ত্র ,সমাজতন্ত্র কে মানুষ যেভাবে গ্রহণ করেনি ঠিক তেমনি ধর্মীয়-রাষ্ট্র ব্যবস্থা বহু কাল পূর্বেই মানুষ গ্রহণ করার অনেক চেষ্টা করেও গ্রহণ করতে সক্ষম হয়নি।

তবে এটাও দিবালোকের মতো সত্য ধর্মকে মানুষ পরিপূর্ন ভাবে পরিত্যাগ করেনি ,মানুষ ধর্মকে নিয়েছে ইহলৌকিক ও পরোলোকিক আত্মশুদ্বির আধ্যাতিক মাধ্যম হিসাবে । এখন ও আমরা অনেকেই ধর্মকে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্ব শ্রেষ্ট মাধ্যম মনে করে প্রকাশ্যে গোপনে রাজনৈতিক কাযক্রম করে যাচ্ছি , যেমনটা বিভোর হয়ে আছেন সমাজতন্ত্রীরা সমগ্র বিশ্ব ব্যাপী সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে।

‘ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার’ এই নীতিতেই বিশ্ব রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে। এটি কোনো ঠুনকো নীতি নয় , সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর যে ধনতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ,এটি একটি দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় অনেক পরীক্ষিত সত্য অতিক্রম করে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি মানুষের মনের আকাঙ্খা পূরণে সক্ষম হয়েছে। অস্বীকার করার উপায় নেই, গণতান্ত্রিক-ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাও মানুষের সকল সমস্যা পূরণে সক্ষম হয়নি ,রয়েছে অনেক ক্রটি বিচ্যুতি। ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে ,গরিব আরো গরিব হচ্ছে ।

আধুনিক গণতান্ত্রিক ও ধনতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে দ্বারস্থ হচ্ছে ধর্মীয় ও সমাজতন্ত্রের যুক্তি সঙ্গত বিষয়ে, তৈরী হচ্ছে মিশ্র গণতান্ত্রিক -ধনতান্ত্রিক কাঠামো। চিন্তা করতে হচ্ছে সম্পদের সুষম বন্টন এর নিশ্চয়তা নিয়ে, যাতে করে কমিয়ে আনা ধনী গরিবের ব্যবধান, নতুন করে ভাবতে হচ্ছে কি করে গণতন্ত্রকে আরো সঠিক ভাবে কার্যকর করা যায় ?
গণতন্ত্রের মূল বিষয় ‘সকল মানুষের ভোটার সময় অধিকার ‘ এ নিয়ে ও আছে অনেক প্রশ্ন।

একজন সাধারণ মানুষ যার তেমন কোনো বোধ নেই এবং যার রাষ্ট্রীয় বিষয়ে মতামত দিবার মতো তেমন সক্ষমতা নেই , এই প্রকৃতির মানুষের ভোট, কি করে আর একজন সর্বোচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তির ভোটার সমান হয় ? অনেক সময় সাধারণ মানুষের আবেগ ভালোবাসার ভোটে এমন ধরণের অরাজনৈতিক, অযোগ্য ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষে চলে যায় যাকে দিয়ে জনগণের ও রাষ্ট্রের তেমন কোনো উপকার হয় না।

উন্নয়নশীল দেশ ,যে সব দেশে শিক্ষার হার খুব কম রাষ্ট্রীয় বিষয়ে মতামত দেয়ার মতো জনসাধারণের তেমন অবস্থান তৈরী হয়নি , সেই সব দেশে কি করে পাশ্চাত্যের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেতে পারে ? ব্যপারটা এমন গরুর গাড়ীতে বি,এম, ডাব্লিও গাড়ীর ইঞ্জিন বসানোর সমতুল্য । বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সাধারণ মানুষের ভোটে নূন্যতম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলেও গণতন্ত্রের প্রকৃত সুফল পাওয়া এখনই সম্ভব নয়।

যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের আর্ত সামাজিক প্রেক্ষাপটে যে গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত ,কি করে তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশের অনুন্নত আর্ত সামাজিক প্রেক্ষাপটে একই ধরণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেতে পারে ? যেখানে এখনো পুষ্টিহীন মানুষেরা জীর্ণ শীর্ণ স্বাস্থ নিয়ে দুবেলা খাবার সংগ্রহের চিন্তা নিয়েই ব্যস্ত আছে ! সত্যিকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে , সেই দেশে গণতন্ত্রের পরিবেশ তৈরী করতে হবে ।

তাহলে ভাবনার পড়তেই হয় , গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কি বিশেষ ধরণের পরিবেশ থাকা উচিৎ ? না কি এটি বাস্তবায়নে কোন পূর্ব শর্ত থাকা চাই ? এটি কোন সাধারণ প্রশ্ন নয় , এর জন্য তৈরী করতে হবে উন্নত মননের শিক্ষিত জাতি ,মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করতে হবে বিবেক বুদ্ধি দিয়ে বুঝার সক্ষমতা ,থাকতে হবে নুন্নতম অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা । তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে , যেখানে গণতন্ত্রের পরিবেশ বিদ্যমান নেই সেখানে কি নতুন কিছুর সন্ধান করতে হবে ? নাকি প্রথাগত গণতান্ত্রিক কাঠামোতে থেকেই ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে হবে ?

গণতন্ত্র একটি চর্চার বিষয় , একটি বীজ রোপন করলে যেমন এক দিনে ফল পাওয়া যায় না ,বীজটি প্রথমে চারা গাছে রূপান্তরিত হয় তারপর যথাযথ পরিবেশে ও পরিচর্চায় একদিন প্রকৃত গাছে পরিণত হয় , ঠিক তেমনি গণতন্ত্রকে ও পরিচর্যার মাধ্যমে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করতে হয়। আজ মানুষ শুধু নিজের পরিবার ,সমাজের, রাষ্ট্রের কল্যাণ নিয়ে ভেবে ক্ষান্ত হচ্ছেনা ,দায়িত্ব নিতে হচ্ছে বিশ্ব প্রাণী কুলের ভাবতে হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ কিভাবে স্বাভাবিক রাখা যায়।

গঠন করতে হচ্ছে রাষ্ট্র ভিত্তিক আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংঘ। রাজনৈতিক পরিমণ্ডল শুধু নিজ ভূমিতে বিদ্যমান থাকছে না সম্প্রসারিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সমস্যার পরিমণ্ডলে যেমন : সন্ত্রাসবাদ , বিশ্ব নিরাপত্তা , বিশ্ব পরিবেশ সহ অনেক গুরুত্ব পূর্ণ বিষয়ে। রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ এর বাহিরে থাকতে পারেনা।

যে কোনো দেশের মানুষের চিন্তা চেতনার প্রতিফলন বিশ্বের অন্যান্য দেশে ও প্রভাব বিস্তার করে। অঘোষিত ভাবে হলেও বিশ্ব অর্থনীতি ,আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা আজ এক কেন্দ্রিক। এর ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটা রাষ্ট্রের ভূমিকা কোনভাবেই অস্বীকার করা যায় না।

বাংলাদেশ আজ স্বাধীন সারভৌম রাষ্ট্র ,১৯৭১ সালে যে দেশটি স্বাধীন হয়ে ৫০ বৎসরে পদার্পন করছে ,যেখানে মানুষ তার অন্য, বস্র , বাসস্থান ,শিক্ষা ,চিকিৎসা নিরাপত্তার সংগ্রাম করে যাচ্ছে। সেই সময় দেখা যাচ্ছে কোনো একটি গুষ্টি এই দেশটিকে পুরোনো ধারায় বিব্রান্ত করে ভিন্ন পথে জাতিকে দ্বিধান্বিত করে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়ার চক্রান্ত করে যাচ্ছে।

১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতি নিধারণ করে নিয়েছিল এই দেশটি কি ধরণের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় পরিচালিত হবে। যার জন্য লক্ষ লক্ষ তাজা প্রাণ ,নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে অকাতরে শুধুই প্রতিষ্ঠা করতে (১) সাম্য (২) মানবিক মর্যাদা (৩) সামাজিক ন্যায় বিচার।

এইসব কি ভিত্তিহীন হয় যাবে কতিপয় অ-দূরদর্শী ব্যক্তির তর্জন গর্জিনে ? ৭১ এর বহু কষ্টার্জিত ,অপূরণীয় ত্যাগে অর্জিত সমস্ত অর্জন কি বাতাসে মিলিয়ে যাবে ? মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম আদর্শ ‘সাম্য’ অর্থাৎ যেখানে ধর্ম ,জাতি , লিঙ্গ , রং সবকিছুকে উর্ধে রেখে গঠন করা হবে শ্রেণী-হীন,শোষণ-হীন অর্থনৈতিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্তা, যা আজকে আধুনিক গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, ধর্ম নিরপেক্ষ উদার রাষ্ট্রীয় কাঠামোরই প্রতিফলিত রূপ।

মুক্তিযুদ্ধের এই যে আদর্শ সমূহ, যা রক্ত ক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল , যা আমরা কোন বুদ্ধিজীবী বা কোন মনীষীর কাছ থেকে উপঠৌকন হিসাবে পাইনি , হাজার বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা ও বাস্তব ভিত্তিক পরীক্ষিত আন্দোলন সংগ্রামে লক্ষ কোটি মানুষের অন্তরে লুকায়িত প্রাণের দাবির বাস্তবিক বহি-প্রকাশ ,যার অন্য কোন বিকল্প কোন ভাবেই হবেনা ,হতে পারে না । চলবে…

লেখক :সাধারণ সম্পাদক ,সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী সোসাইটি, যুক্তরাজ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *