Main Menu

৭ নভেম্বর : বিপ্লব ও সংহতি’ বনাম ‘মুক্তিযোদ্ধা হত্যা’ দিবস

বাংলারদর্পন
১৫ই আগস্ট, ৩ নভেম্বর এবং এরপর, ৭ নভেম্বর – স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের ৩ টি কলঙ্কিত দিন। স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর সামরিক বাহিনীর ভিতরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ সেনানায়কদের হত্যা করে ষড়যন্ত্রকারীরা এদিন পাকাপাকিভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকেই মূলত ইতিহাস বিকৃতির শুরু। অথচ, লক্ষ্য করলে দেখবেন, এই তিনটি ঘটনাই একই সূত্রে গাঁথা। বিএনপি যেটাকে ‘জাতীয় বিপ্লব এবং সংহতি দিবস’ এবং জাসদের মূল অংশ যেটাকে “সিপাহী জনতার অভ্যূত্থান” বলে গর্বিত হওয়ার ভান করে, সেই দিনটিতে মূলত বিনা বিচারে কিংবা বিচারের নামে প্রহসন করে হত্যা করা হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা, মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ (বীর উত্তম), লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ.টি.এম. হায়দার (বীর উত্তম) এবং কর্নেল নাজমুল হুদা (বীর বিক্রম) সহ আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধা সেনা সদস্যকে।

ঘটনার নেপথ্যেঃ
কর্নেল তাহের। সেনা অফিসার ও সৈনিকদের মাঝের বৈষম্য নয় – নীতিগত এই অবস্থানের কারণে তিনি কিছু সৈনিকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। মূলত, ১৯৭২ সাল থেকে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ কায়েমের লক্ষ্যে কর্ণেল তাহেরের নেতৃত্বে প্রতিবিপ্লবীরা সংগঠিত হয়। এরা সেনাবাহিনীতেও একটা বিরাট প্রভাব ফেলে। তারপর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে জাতির জনক কে স্বপরিবারে হত্যা করে সামরিক শাসনের শুরু ও ৩ নভেম্বর এ জাতীয় চার নেতাকে জেলের ভিতর হত্যা… ঘটতে থাকে পরারপর। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের কুশীলব মেজর বাহিনী ও খন্দকার মোশতাক বঙ্গভবনে অবস্থান নিয়ে একাধারে দেশ ও সেনাবাহিনী পরিচালনার মতো নৈরাজ্যের সৃষ্টি করেছিল। যাতে করে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমাণ্ড সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে। এই অবনতিশীল পরিস্থিতির রাশ টেনে ধরা এবং সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধারা খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটা প্রচেষ্টা নেয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ক্ষমতায় বসেছিল মেজর ফারুক, রশিদ, ডালিম, জিয়া এবং খন্দকার মোশতাকের যে ঘৃন্য সরকার, বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৩রা নভেম্বর, ১৯৭৫-এ সেই সরকারের পতন হয়। শোনা যায় জেনারেল ওসমানীর মধ্যস্থতায় জাতীয় বেইমান খন্দকার মোশতাক সেদিন বেঁচে যায় – কিন্তু নির্মমভাবে জেলে নিহত হন চার নেতা। অন্যদিকে ওসমানীর মধ্যস্থতা মেনে নিয়ে জীবনের সবচেয়ে বড় মূল্যটাও পরিশোধ করেন খালেদ মোশাররফ।

৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে যেহেতু রক্তপাতহীনভাবে ঘটাতে চেয়েছিলেন জেনারেল খালেদ মোশাররফ, তাই, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে হত্যা না করে তার নিজ বাসভবনে গৃহবন্দী করে রাখেন তিনি। কর্নেল তাহের জানতে পারেন এই অভ্যুত্থানের কথা। কর্নেল আবু তাহের বিশ্বাস করতেন জিয়াও তার সমাজতন্ত্রের আদর্শের লোক। তিনি ঢাকাতে তাঁর অনুগত ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাহীদের বিদ্রোহের নির্দেশ দিয়ে তৎক্ষনাৎ চট্টগ্রামে থেকে ঢাকা রওনা হন, এ সময় তাঁর সঙ্গী ছিল শত শত জাসদ কর্মী। ৭ নভেম্বর সুবেদার মেজর আনিসুল হকের ইঙ্গিতে শুরু হয় সিপাহী বিদ্রোহ। রাত ১২ টা থেকেই তাহেরের বিপ্লবী গণবাহিনীর সদস্যরা এবং বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত সিপাহীরা জিয়াকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে জিয়ার বাসায় চারপাশে সমবেত হতে থাকে। উল্লেখ্য, জিয়াকে মুক্ত করতে আসা কয়েকটি ইউনিটের মধ্যে মেজর মহিউদ্দীন (বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার ফাঁসি প্রাপ্ত আসামী) ও সুবেদার মেজর আনিসের নেতৃত্বে টু ফিল্ডের কতিপয় সৈন্য সর্বপ্রথম জিয়ার বাসভবনে পৌছায়। “জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ, সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই” স্লোগান দিয়ে বেশ কিছু সৈনিক জিয়ার বাসায় ঢুকে প্রায় বিনা বাধায় তাকে মুক্ত করে নিয়ে আসে।

জিয়াকে মুক্ত করার কিছুক্ষন পরেই তাহের টু-ফিল্ড রেজিমন্টে ছুটে আসে। জিয়া তাহেরকে জড়িয়ে ধরে “তোমাকে ধন্যবাদ, আমাকে বাঁচিয়েছো বলে কৃতজ্ঞতা জানাল (সেটা ভিন্ন গল্প যে এই তাহেরকে জিয়া এই অভ্যুত্থানের দায়েই ফাঁসিতে ঝোলায়, সে গল্প নাহয় আরেকদিন বলা যাবে)। যাইহোক, জিয়ার মুক্তির পুরষ্কারস্বরুপ কর্নেল তাহের জিয়ার সাথে রাস্ট্রক্ষমতায় আসীন হতে চাইলেন। তিনি চাইলেন জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের করে জাসদের অফিসে এনে তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হবে। পরে সিপাহী-জনতার এক সমাবেশ হবে। সেখানে বক্তব্য রাখবেন জিয়া আর তাহের। জিয়া সেটি করতে অপারগতা প্রকাশ করে এবং টু-ফিল্ডের অফিসেই রেডিও রেকর্ডিং ইউনিট এনে নিজের একটি ভাষন রেকর্ড করায় সকালে প্রচারের জন্য।

মুক্তিযোদ্ধা নিধনঃ
৭ নভেম্বরের বিবর্ন সকাল। আশার শেষ প্রদীপটি নিভু নিভু করে তখনো জ্বলছে। কিন্তু ধ্বংসাত্মক জিয়ার প্লান ছিল কিছু ভিন্নই। মুক্তিযুদ্ধের সাথে বেঈমানী করলো একজন মুক্তিযুদ্ধা এবং প্রতারিত হলো জনগণ। দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যাযজ্ঞ শুরু হল জেনারেল খালেদ মোশাররফ কর্নেল হুদা ও লেঃ কর্নেল হায়দারকে দিয়ে।

জেনারেল খালেদ মোশারফের হত্যার ঘটনাটি লে. কর্ণেল হামিদ লিখেছেন এভাবে, ‘৭৫ সালের ৭ নভেম্বর রাত ১২ টায় বঙ্গভবনে সিপাহী বিপ্লবের খবর পেয়ে জেনারেল খালেদ কর্নেল হুদা ও হায়দারকে সঙ্গে নিয়ে প্রথমে ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামানের বাসায় যান। সেখান থেকে শেরে বাংলা নগরে অবস্থিত ১০ম বেঙ্গল রেজিমেন্টে যেতে সিদ্ধান্ত নেন। উল্লেখ্য, ১০ম বেঙ্গলকে বগুড়া থেকে খালেদই আনিয়েছিলেন তার নিরাপত্তার জন্য। পথে ফাতেমা নার্সিং হোমের কাছে তার গাড়ি খারাপ হয়ে গেলে তিনি হুদা ও হায়দারসহ পায়ে হেটে কর্নেল নওয়াজিসের ১০ম বেঙ্গলে গিয়ে পৌছেন। খালেদের আগমনের খবর পেয়ে তৎক্ষণাত তিনি টেলিফোনে টু ফিল্ডে সদ্যমুক্ত জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তার ইউনিটে খালেদের উপস্থিতির কথা জানান।

তখন ভোর প্রায় চারটা, জিয়ার সাথে ফোনে তার কিছু কথা হয়। এরপর তিনি মেজর জলিলকে ফোন দিতে বলেন। জিয়ার সাথে মেজর জলিলের কথা হয়। ভোরবেলা দেখতে দেখতে সিপাহী বিদ্রোহের প্রবল ঢেউ ১০ম বেঙ্গলে এসে পড়ে। পরিস্থিতি কর্নেল নওয়াজিসের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়। আফিসার মেসে বসে খালেদ-হায়দার-হুদা সকালের নাস্তা করছিলেন। হুদা ভীত হয়ে পড়লেও খালেদ ছিলেন ধীর, স্থির, শান্ত। হায়দার নির্ভীক নির্বিকারভাবে পরাটা মাংস খাচ্ছিলেন। এমন সময় মেজর জলিল কয়েকজন উত্তেজিত সৈনিক নিয়ে মেসের ভিতর প্রবেশ করে, সাথে একজন হাবিলদারও ছিল। সে চিৎকার দিয়ে জেনারেল খালেদকে বলল-“আমরা তোমার বিচার চাই”! খালেদ শান্তকণ্ঠে জবাব দিলেন, ” ঠিক আছে, তোমরা আমার বিচার করো। আমাকে জিয়ার কাছে নিয়ে চলো।” স্বয়ংক্রিয় রাইফেল বাগিয়ে হাবিলদার চিৎকার করে বললো – “আমরা এখানেই তোমার বিচার করবো।” খালেদ ধীর স্থির কন্ঠে বললেন, ” ঠিক আছে, তোমরা আমার বিচার করো।” খালেদ দু’হাত দিয়ে তার মুখ ঢাকলেন। ট্যারর-র-র-র! একটি ব্রাস ফায়ার। মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন সেনাবাহিনীর চৌকস অফিসার জেনারেল খালেদ মোশারফ যার ললাটে ছিল বীরযোদ্ধার জয়টিকা, মাথায় ছিল মুক্তিযুদ্ধের বীর উত্তমের শিরোপা আর মাথার বাম পাশে ছিলো পাকিস্তানী গোলন্দাজ বাহিনীর কামানের গোলার গভীর ক্ষতচিহ্ন। কামরার ভেতরেই গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণত্যাগ করলেন আগরতলা ষড়যন্ত্রমামলার অন্যতম আসামী, মুক্তিযুদ্ধে ৮নং সেক্টরের সাবসেক্টর কমান্ডার বীর বিক্রম কর্নেল নাজমুল হুদা। কর্নেল হায়দার ছুটে বেরিয়ে যান কিন্তু সৈনিকদের হাতে বারান্দায় ধরা পড়েন। উত্তেজিত সিপাহীরা কিল ঘুষি লাথি মারতে মারতে দোতলা থেকে নিচে নামিয়ে এনে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে।’

সিপাহী বিপ্লব মুলত ছিল হত্যা উৎসব। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার একটি রিপোর্টে বলেন, এই সময়ে সেনাবাহিনীতে অফিসারের সংখ্যা ৩০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। অনেককেই হত্যা করা হয় একেবারে ব্যাক্তিগিত আক্রোশে। সৈনিকদের সেদিনের শ্লোগানই ছিল সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই। হাবিলদার মেজর আবদুল হাই মজুমদার ছিলেন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্য। তার এক বছর জেল হয়েছিল। তিনি দাবি করেন যে, ‘ঐ অফিসারদের হত্যা করেছে পাকিস্তান প্রত্যাগত সৈনিকেরা’। জানা যায়, জাসদের বিপ্লবী সংস্থার সদস্যবৃন্দ সিপাহী বিদ্রোহের রাতে খাকি উর্দি পরে তারা মিশে গিয়েছিল ক্যান্টনমেন্টের সাধারন জোয়ানদের সাথে। কে বিপ্লবী সৈনিক, কে আসল সৈনিক বুঝা মুশকিল হয়ে পড়েছিল। তারাই অফিসারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্লোগান দিচ্ছিল। জামায়াতসহ যেসব পাকিস্তানপন্থী দলগুলো নিষিদ্ধ ছিল, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এরচেয়ে বড় সুযোগ তো ঐ সময় ছিল না। সুতরাং সিপাহী-জনতার সেই বিপ্লবে এরাও ছিল জনতা।

দিনটিকে যেভাবে নামকরন করা হয়েছিল সেদিন তাতে মনে হয় সিপাহী ও জনতাই যেন এর মূল নায়ক এবং এক মহান উদ্দেশ্যে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে। কিন্তু আসলেই কি তাই? জিয়া কি আদতেই তখন তেমন কোন জনপ্রিয় ব্যাক্তিত্ব ছিলেন যে সিপাহী-জনতা স্বতস্ফুর্তভাবে তাকে মুক্ত করার জন্য এগিয়ে আসবে? মধ্যরাতে জিয়াউর রহমানকে প্রায় বিনাবাধায় মুক্ত করে কিছু সৈনিক আর সকালবেলা বিপ্লবীদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে অন্যান্য সৈনিকরা তাদের ইউনিটের ট্রাকে চেপে স্লোগান দিতে দিতে শহরের দিকে ছুটতে থাকে। তাদের হুকুম দেওয়ার কেউ নেই, বাধা দেওয়ার কেউ নেই। নতুন শ্লোগান উঠল, ‘সিপাহী জনতা ভাই ভাই’। ভয় ভেঙ্গে কৌতুহলী জনতা বের হয়ে আসে ও ধীরে ধীরে সৈনিকের উল্লাসে সামিল হয়ে স্লোগান দিতে থাকে ‘আল্লাহু আকবার। সিপাহী জনতা ভাই ভাই। জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’। সাথে চলতে থাকল মুক্তিযোদ্ধা সৈনিকদের হত্যা।

প্রশ্ন রইল আপনাদেরই কাছে, কেমন করে ৭ই নভেম্বর হয় ‘বিপ্লব ও সংহতি দিবস’? কেমন করে জিয়া হতে পারে কারো আদর্শ, আর কেমন করেই বা একজন তাহের হয় পূজনীয় অকুতভয় প্রাণ?






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *