Main Menu

‘আমরা কেরানীনির্ভর কর্মকর্তা’-অতিরিক্ত সচিব মনজুর

ঢাকা; বাংলা বানানে ভুলের জন্য নিজেদের ‘কেরানীনির্ভর কর্মকর্তা’ আখ্যা দিয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন ও চলচ্চিত্র) মো. মনজুরুর রহমান বলছেন, ঠিকমতো বাংলা লিখতে না পারলেও কাউকে লজ্জিত হতে দেখা যায় না।

বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ‘দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার ও বানানরীতি প্রশিক্ষণ কর্মশালার’ প্রধান আলোচক হিসেবে কথা বলেন মনজুরুর।

ইংরেজিতে কয়টি বর্ণ- প্রশ্ন করতেই প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের বেশিরভাগের কাছ থেকে উত্তর আসে, “২৬টি।”

এরপর বাংলায় কতটি বর্ণ আছে- এমন প্রশ্নে তিন ধরনের উত্তর আসে। কেউ বলেন ৪৯টি, কেউ ৫০টি, আবার কেউ কেউ ৫১টি বাংলা বর্ণের কথা বলেন।

মনজুরুর জানান, এনসিটিবির ২০১২ সালের প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ে ৫১টি বর্ণ থাকলেও ২০১৩ সালের ওই বইয়ে মাত্রা ছাড়া ‘ব’ অর্থাৎ অন্তস্থ ‘ব’ বর্ণটি বাদ দিয়ে ৫০টি বর্ণ রাখা হয়েছে।

“যারা অন্তস্থ ‘ব’ বর্ণটি তুলে দিচ্ছেন তাদের জন্য উদাহরণ দিচ্ছি- বিদ্বান, দ্বিতীয়, ধ্বনি, তন্বী, বিশ্বাস লিখতে অন্তস্থ ‘ব’ লাগে। কেন এই বর্ণ তুলে ফেলল তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। তবে পাঠ্যবইয়ে একটা ফাঁক রয়ে গেছে, সেখানে বলা হয়েছে পরীক্ষামূলক বই।”

গণপ্রজাতন্ত্রী শব্দটির বানান সংবিধানের ছোট সংস্করণের বইয়ে সরকারের লোগোর মধ্যে যে ভুল বানানে ছাপা রয়েছে, তা সবাইকে দেখান মনজুরুর।

দুই টাকার পুরনো মুদ্রায় ২০০৪ ইং লেখা রয়েছে দেখিয়ে মনজুরুর বলেন, ‘ইং’ বলতে কোনো শব্দ নেই। আর ওটা খ্রিস্ট্রীয় সাল। ৫০ টাকার নোটেও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নাম ভুলভাবে ‘শিল্পী জয়নুল আবেদীন’ লেখা রয়েছে জানিয়ে ওই নোটটিও সবাইকে দেখান তিনি।

মনজুরুর জানান, প্রথম দিকের মেশিন রিডেবল পাসপোর্টে জাতীয় সংগীতে ছয়টি বানান ভুল ছিল। এনিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের তা ঠিক করা হয়।

“পাসপোর্টে ছাপা হওয়া জাতীয় সংগীতে ছয়টি ভুলের বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন তারা ওয়েবসাইট থেকে ওই জাতীয় সংগীত কপি করেছিলেন। অনেকের বদ্ধমূল ধারণা হচ্ছে, বাজারে যে ছাপা কাগজ পাওয়া যায় তা শুদ্ধ।”

একটি সরকারি চিঠি হাতে নিয়ে সেখানে একই শব্দ দুই বানানে থাকার বিষয়টি তুলে ধরে মনজুরুর বলেন, যদি কেউ ওই শব্দের প্রকৃত বানান না জানেন তাহলে তিনি কোন বানানটা গ্রহণ করবেন?

বেশ কয়েকটি সরকারি চিঠি-পত্রের ভুল তুলে ধরে সেগুলোর সঠিক বানান কি হবে তার নিয়মকানুনও বাতলে দেন অতিরিক্ত সচিব মনজুরুর।

তিনি বলেন, “দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৬-৪৭ বছর পরেও শুদ্ধ করে বাংলা লিখতে পারি না। কিন্তু ইংরেজিতে ‘আই’র ফোঁটা না দিলে টি-এর মাথা না কাটলে লজ্জিত হই। কিন্তু বাংলা বানান ভুল লিখলে লজ্জিত হই না।

“আমরা কেরানীনির্ভর কর্মকর্তা। অথবা কম্পিউটারে ছাপা হয়ে এসেছে, আমি খেয়াল করিনি বলে থাকি। কম্পিউটার কিন্তু একা কাজ করে না, সুতরাং ওই দোষ দিয়ে লাভ নেই।”

মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নিচের স্তরের কর্মকর্তাদের বাংলা বানানরীতি সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে দাপ্তরিক কাজে বাংলা বানানে ভুল থেকে যাবে বলেই মনে করছেন মনজুরুর।

“আপনার ঊর্ধ্বতন যারা আছেন তারা যদি এই জ্ঞান ও বানানরীতির সাথে পরিচিত না হন তবে আপনার খবর আছে, তাই সাবধানে ব্যবহার করবেন।”

অবসরে যাওয়া ১৯৮২ ব্যাচের একজন কর্মকর্তার একটি বিল অনুমোদনের সরকারিপত্রে বেশ কয়েকটি বানান ভুলের বিষয়টি তুলে ধরলেও মনজুরুর ওই কর্মকর্তার নাম প্রকাশ করেননি।

মন্ত্রীর নামের আগে মাননীয় এবং পরে মহোদয় লেখার বিষয়ে এক কর্মকর্তা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে রসিকতার সুরে হাসতে হাসতে মনজুরুর বলেন, “মন্ত্রী যদি রেগে যান, তাই অনেকে আগে মাননীয় পরে মহোদয় লেখেন।”

তথ্যসচিব মরতুজা আহমেদ এই প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধন করে বলেন, “শহীদের রক্তে অর্জিত বিশ্বের একমাত্র ভাষা আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলার শুদ্ধচর্চা দাপ্তরিক কাজকে গতিময় ও আনন্দদায়ী করে তুলবে।

“বাংলা ভাষা আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের গর্ব। দপ্তরে-বাইরে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে এর চর্চা হতে হবে সুচারুরূপে, যত্নের সাথে।”

পড়ার অভ্যাস বজায় রাখার পাশাপাশি শুদ্ধ বানানে লেখা ও শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলার উপর গুরুত্বারোপ করে মরতুজা আহমেদ বলেন, সম্প্রচার মাধ্যমগুলোতে ভাষার ব্যবহার সুচারু হওয়া বাঞ্ছনীয়।

রেডিও অনুষ্ঠান উপস্থাপকদের উচ্চারণ তদারক করতে মন্ত্রণালয়ের বেতার শাখাকে নির্দেশনাও দেন তথ্য সচিব।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রথম মহাপরিচালক জামিল চৌধুরী ১৯৬৪ সালে বাংলায় ব্যাংকের চেক বই লিখে দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহারের এক অনন্য নজির গড়েছিলেন।

পরে প্রশিক্ষণার্থী তথ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের হাতে বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধান তুলে দেন তথ্যসচিব।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *