ভুয়া পন্ডিত ভন্ড দাম্ভিক এবং অযোগ্য ধোঁকাবাজ !

গোলাম মাওলা রনি :

কিছু লোকের পান্ডিত্য দেখলে আপনার গায়ে হয়তো জ্বালা ধরে যায়। তারা আপনাকে দেখামাত্র নিজের পান্ডিত্য জাহির করার জন্য লেজ উঁচিয়ে, কেশর দুলিয়ে এবং জ্ঞানের মশাল আপনার একদম মুখের কাছে এনে এমন কিছু করবেন বা বলবেন যার ফলে আপনি অপমানিত, অবদমিত ও হতোদ্যম হয়ে পড়বেন। তথাকথিত এসব পন্ডিতের দ্বারা আপনার দুর্ভোগ-দুর্গতি হয়তো শৈশবকালেই শুরু হয়েছে এবং সম্ভবত কবরে না যাওয়া পর্যন্ত তা শেষ হবে না। তারা হয়তো কেউ আপনার সমবয়সী আবার কেউ হয়তো বাবা-দাদা অথবা নাতির বয়সীও হতে পারে। তারা কতগুলো গৎবাঁধা তথ্য-উপাত্ত মুখস্থ করে নেয় এবং সময় ও সুযোগমতো আপনাকে তা জিজ্ঞাসা করে বিব্রত করে ফেলে। তাদের মধ্যে কেউ হয়তো জিজ্ঞাসা করেছে- এ ব্যাটা! তুই ভ্যাট ভ্যাট করিস না রাজ্যের ট্রান্সলেশন। অন্যেরা অজু-গোসল ও বাসর যাপনের ফরজ কয়টি ও দোয়াগুলো কী তা জিজ্ঞাসা করে আপনাকে হয়তো ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। কেউবা আবার উলানবাটোর অথবা কিনসাসা নগরীর আবহাওয়া ও মেয়েদের রূপ-যৌবনের খবর না জানার কারণে আপনাকে ভর্ৎসনা পর্যন্ত করেছে।

পন্ডিত শ্রেণির বাইরে আরেক শ্রেণি রয়েছে যাদের দেখলে আপনার প্রায়ই মেজাজ বিগড়ে যায়। মনে হয় ইচ্ছামতো ডিশ থেরাপি দিয়ে তাদের পুষ্টি সমস্যার সমাধান করে দিই। তারা সব সময় ছোট মুখে বড় বলে এবং সারাক্ষণ রাজা-উজির বানানো, হাতি-ঘোড়ায় চড়া এবং বাঘ-সিংহ মারার গল্পে আপনাকে ত্যক্তবিরক্ত করে ছাড়ে। তারা প্রতি ওয়াক্ত হরিণের মাংস ছাড়া ভাত খায় না এবং খাবার টেবিলে শত পদের বাহারি ব্যঞ্জন না হলে তাদের চলে না। তাদের বউ তাদের প্রতি ওয়াক্তে ভাত মাখিয়ে খাইয়ে দেয় এবং সুন্দরী দাসীরা তাদের হাত-মুখ ধুইয়ে দেয়। তারা সকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট, দুপুরে সৌদি বাদশাহ, বিকালে জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে টেলিকনফারেন্স করে। রাতের বেলা রাশিয়া, তুরস্ক ও ইরানের প্রেসিডেন্ট তাদের বুদ্ধি নিয়ে পরদিন সিরিয়া যুদ্ধের করণীয় ঠিক করেন। তারা বাংলাদেশের আসন্ন সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মনোনয়নের তালিকা তৈরি করে দেয় এবং সরকারি কর্মকর্তাদের ধমকিয়ে-ধামকিয়ে বিভিন্ন লোকের পক্ষে কাজ করতে বাধ্য করে দিয়ে দেশ-জাতি রক্ষা করে।

উপরোক্ত দুটি শ্রেণির বাইরে আপনি হয়তো আরও একটি শ্রেণি দেখবেন যারা সারাক্ষণ রবীন্দ্রনাথের ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি-নিয়ে যাবি কে আমারে!’ অথবা ‘তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে আমার মরণযাত্রা যেদিন যাবে’ কিংবা ‘জীবনে যদি দীপ জ্বালাতে নাহি পার-সমাধি পরে মোর জ্বেলে দিও’ ইত্যাদি গান করে বিরাট বিরাট স্বপ্ন বাসর রচনা করে চলে। তারা ছেলে হলে মেয়েদের অথবা মেয়ে হলে ছেলেদের ভালোবাসতে চায়। তাদের পছন্দ হলো দুনিয়ার সবচেয়ে সেরা সুন্দর পুরুষ অথবা সুন্দরী নারী। তারা হোয়াইট হাউস, আগ্রা দুর্গ, সুলতান সুলেমানের তোপকাপি প্রাসাদ অথবা রানী

এলিজাবেথের বাকিংহাম প্রাসাদের চেয়ে ছোট বা কম বিলাসিতাপূর্ণ বাড়িঘরের কথা কল্পনা করে না। পৃথিবীর সবচেয়ে দামি হীরা-মণি-মুক্তা-জহরত, পোশাক-পরিচ্ছদ, গাড়ি-ঘোড়া, টাকা-পয়সা, দাস-দাসী, সৈন্য-সামন্ত, সিংহাসন ও বাদশাহির জাঁকজমকতা নিয়ে প্রিয়তমা বা প্রিয়তমের সান্নিধ্য উপভোগ করতে চায়। কিন্তু এ কাজের জন্য তারা কোনো কাজ করতে চায় না। তারা সর্বদা কল্পনার ফানুস উড়িয়ে রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে ভবলীলা সাঙ্গ করার জন্য উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়াতে সুনিপুণভাবে প্রতারণার জাল বুনতে থাকে সময় ও সুযোগমতো ফাঁদ পাতার জন্য। উল্লিখিত শ্রেণির নারী-পুরুষ চায়, তাদের কাক্সিক্ষত প্রেমিক বা প্রেমিকা স্বপ্নরথে এসে তাদের জোর করে তুলে নিয়ে যাক। তার কাক্সিক্ষত স্বপ্নের প্রাসাদে তাদের বন্দী করে তাদের সামনে নতজানু হয়ে বলুক- ওহে প্রাণেশ বা ওহে প্রাণেশ্বরী! তুমা বিনে আমি আর বাঁচতে পারছি না। সুতরাং কাছে এসো প্রিয়। আমাকে বক্ষে ধারণ কর- আমার সঙ্গে রমণ করে আমার জন্মের সার্থকতা ফুটিয়ে তোলো। অনেকে আবার মানুষ বাদ দিয়ে জিন-পরির কথাও কল্পনা করে। পুরুষ চায় পরিস্তানের রাজকন্যা একরাতে উড়ে এসে তাকে তুলে নিয়ে যাক। তারপর নিজেদের রাজ্যে নিয়ে গিয়ে মহাধুমধামে তাকে বিয়ে করুক এবং সে রাজ্যের রাজা বানিয়ে দিক। জিনদের সঙ্গে কোনো নারী জিনরাজ্যে যেতে চান কিনা তা বলতে পারব না। তবে তারা সকাল-বিকাল স্বপ্নে দেখেন- ইস, যদি আলাদিনের চেরাগের অথবা সিন্দবাদের গল্পের মতো তাদের একটা শক্তিশালী জিন থাকত তবে একরাতে হলিউড থেকে টমক্রুজ এবং অন্যরাতে বলিউড থেকে শাহরুখ, আমির, সালমান প্রমুখকে ধরে এনে মনের ঝাল মেটাতে পারতাম অথবা ও পাড়ার বদ ছেলেটার নাক ফাটিয়ে দিতে পারতাম।

আজকের আলোচনায় ইতিমধ্যে আমরা যে তিনটি সম্প্রদায়ের মানব-মানবীদের নিয়ে রসঘন ফ্যান্টাসি করলাম তাদের আসল পরিচয়, স্বভাব ও কার্যকারণ নিয়ে সংক্ষেপে কিছু বলার চেষ্টা করব। প্রথম উদাহরণে যাদের কথা বলেছি তারা হলেন সত্যিকার অর্থে নির্বোধ যারা চমক দেখানো পান্ডিত্য জাহির করে মূলত নিজেদের দুর্বলতা ঢেকে রাখার প্রয়াস চালায়। দ্বিতীয় উদাহরণের লোকজন সাধারণত দুর্বল ও ধুরন্ধর প্রকৃতির। তারা লোক হাসানো দাম্ভিকতা দ্বারা নিজেদের ছোট করা ছাড়া তেমন কিছুই করতে পারে না। এবার তৃতীয় শ্রেণির সম্পর্কে বলি। এরা হলো একাধারে অযোগ্য এবং একই সঙ্গে অকর্মা প্রকৃতির। কাক্সিক্ষত সফলতার জন্য কোনো কাজকর্ম না করে তারা অহেতুক স্বপ্ন দেখে এবং অলীক কল্পনার ভেলা মহাশূন্যে ভাসিয়ে দিয়ে মেঘমালার ওপর দিয়ে চলাফেরা করে। এরা একদিকে যেমন সমাজ-সংসার ও রাষ্ট্রের জন্য বোঝাস্বরূপ তেমনি তাদের নিজেদের জন্য মস্তবড় বিপদ ও বিপত্তির কারণ। এ তিনটি শ্রেণির লোকজনের কারণে আমাদের সমাজে কী কী সাধারণ সমস্যার সৃষ্টি হয় তা নিয়ে যথাসাধ্য আলোচনা করার চেষ্টা করব। প্রথমেই নির্বোধের পান্ডিত্য নিয়ে কিছু বলা যাক!

আমাদের দেশের একটি জনপ্রিয় ও প্রচলিত প্রবাদ হলো- ভাঙা কলসির ঠন ঠন আওয়াজ বেশি; অথবা খালি কলসি বেশি বাজে। প্রবাদগুলোর মর্মকথা হলো- নির্বোধ লোকেরা বেশি আওয়াজ করে। আমরা যদি প্রকৃতির পাখ-পাখালি বা ইতরপ্রকৃতির প্রাণীর দিকে তাকাই তবে সেখানেও দেখতে পাব অহেতুক ও বিরক্তিকর আওয়াজের ছড়াছড়ি। কাকের কা-কা, বাদুড়ের পাখা ঝাপটানো, হতুম পেঁচার ডাক, কুকুরের ঘেউ ঘেউ, মুরগির ককর ককর ও শেয়ালের হুক্কাহুয়ার মধ্যে কোনোরকম পান্ডিত্য বা কার্যকারণমূলক ইঙ্গিত রয়েছে বলে আমার জানা নেই। এগুলো কারণে-অকারণে ডাকাডাকি করে মনুষ্যসমাজে কেবল বিরক্তি উৎপাদন করে। প্রকৃতির ওসব প্রাণীর মতো মনুষ্যসমাজে অকারণ ও অহেতুক শব্দসমষ্টি ও কলেবর কোনো কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসে না। কিছু মানুষ রয়েছেন যারা বোধহয় কথা না বলে থাকতে পারেন না। এ শ্রেণিটির মধ্যে যারা আবার আঁতেল সাজার চেষ্টা করেন তারা অন্যকে চমকিত করার জন্য কিছু বিষয় রপ্ত করেন। মূলত নিজেকে পন্ডিত প্রমাণ করার জন্য অথবা নিজের দুর্বলতা ঢাকার জন্য তারা এসব করেন। সমাজে নিজেদের জন্য বিশেষ সম্মান অথবা মর্যাদার ব্যবস্থা করার জন্য সাধারণত নির্বোধ লোকেরা পান্ডিত্য জাহির করতে গিয়ে পাগলপারা হয়ে এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা শুরু করেন পান্ডিত্যের ফেরিওয়ালারূপে। পরে তারা যখন নিজেদের কর্মে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন তখনই শুরু হয় সামাজিক বিপর্যয়।

নির্বোধের পান্ডিত্য সাধারণত বিপর্যয় সৃষ্টি করে ভন্ডামির মাধ্যমে। ভন্ডপীর, ভন্ড জ্যোতিষী, ভন্ড চিকিৎসক, ভুয়া বিজ্ঞানী, ভুয়া পুলিশ ইত্যাদি শিরোনামে আমরা যে খবরগুলো পত্রপত্রিকায় দেখি তার শুরুটা কিন্তু হয়েছিল নির্বোধের পান্ডিত্য প্রদর্শনের মাধ্যমে। নির্বোধ পন্ডিত সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করতে পারে যখন তারা কোনো রাষ্ট্রক্ষমতা, সরকারি পদ অথবা বিচারকের আসন দখল করতে পারে। তাদের যন্ত্রণায় তখন আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে, মানবতা কবরে আশ্রয় নেয় এবং সৃজনশীলতার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এদের কারণে সভ্যতার চাকা উল্টোপথে ঘুরতে থাকে। মানুষ অপমানিত হতে হতে একসময় নিজেদের পশুর চেয়েও অধম ভাবতে থাকে এবং বেঁচে থাকার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। মানুষের স্বাভাবিক কলকোলাহল থেমে যায় এবং দৈনন্দিন জীবনের অভ্যাস, খাদ্যাভ্যাস ও আচার-আচরণে বিশৃঙ্খলা ও বিকৃতি লক্ষ্য করা যায়। মানুষ সত্যকে বাদ দিয়ে মিথ্যার পেছনে ছুটে বাস্তবতাকে কবর দিয়ে গুজবের পেছনে দৌড়ায় এবং সৌজন্য ও শালীনতা পরিহার করে অশ্লীলতার খেদমতগার হয়ে পড়ে।

নির্বোধের পান্ডিত্য নিয়ে আজ আর কথা বাড়াব না। এবার দুর্বলের দাম্ভিকতা নিয়ে কিছু বলা যাক। আমরা অনেকে শৈশবে আবদার রশীদের একটি জনপ্রিয় ছড়া পড়েছি যার প্রথম কয়েকটি লাইন ছিল এরূপ- লোকটা শুধু করতো বড়াই! ভাঙতে পারি লোহার কড়াই; শুনে সবাই কাঁপতো- ভয়ে খিল লাগিয়ে থাকত ঘরে। আবদার রশিদের কবিতার মর্মবাণী হলো আমাদের সমাজের বেশির ভাগ লোকই ভীতু। তারা জানে কম, বলে বেশি। তারা চিন্তা-ভাবনার পরিবর্তে দুশ্চিন্তা করে এবং দক্ষতা অর্জন না করেই লোভের বশে- কখনো উত্তেজনা বা ক্ষোভের বশে অসাধ্য সাধন করতে গিয়ে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মানুষের এই স্বভাবকে টার্গেট করে কিছু লোক দাম্ভিকতার আশ্রয় নিয়ে সবাইকে ভয় দেখিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে নেয়। সাধারণত দুর্বল চরিত্রের ভীরু কাপুরুষরাই দম্ভ করে বেড়ায়। লম্পট, ভন্ড, অসৎ ও চরিত্রহীন নচ্ছাড় প্রকৃতির লোকেরা দাম্ভিকতার পোশাক পরে অত্যাচার, অশ্লীল গালাগাল ও অঙ্গভঙ্গি ইত্যাদির মাধ্যমে লোকজনকে ভয় দেখিয়ে প্রথমত, নিজেদের কুকর্ম আড়াল করার চেষ্টা করে এবং দ্বিতীয়ত, অন্যের অধিকার হরণের মাধ্যমে নিজেদের পকেট ভারী করে। তারা দাম্ভিকতার মাধ্যমে নিজেদের লোভ-লালসা, কামনা-বাসনা, ঘুষ-দুর্নীতি, জুলুম-অত্যাচার ইত্যাদি কুকর্মকে খুব সহজে সাবলীলভাবে অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে পারি।

দুর্বল লোকেরা যখন কোনো পদ-পদবি পেয়ে যায় তখন তারা দাম্ভিকতাকে নিজেদের জন্য অব্যর্থ হাতিয়ার বানিয়ে নেয়। লোকজন যদি তাদের কাছাকাছি চলে আসে তবে তাদের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়ে যাবে। অথবা তারা যদি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করতে যায় তাহলেও দুর্বলতা প্রকাশ পেয়ে যাবে। এজন্য তারা দাম্ভিকতা, দুর্ব্যবহার ও অশ্লীল গালাগাল দ্বারা লোকজনকে সন্ত্রস্ত করে দূরে সরিয়ে রাখে। শজারু যেমন নিজের শরীরের নরম মাংস আক্রমণকারী অন্য পশুদের হাত থেকে রক্ষার জন্য কাঁটা মেলে ধরে অথবা ভাওয়া ব্যাঙ যেভাবে সাপের হাত থেকে বাঁচার জন্য লাফ দেয় কিংবা কুকুর যেভাবে এবং যে কারণে ঘেউ ঘেউ করে ঠিক একইভাবে দাম্ভিকেরা অসদাচরণ দ্বারা নিজেদের দুর্বলতা ঢেকে রাখার পাশাপাশি নিজেদের অস্তিত্ব ও পদ-পদবি রক্ষা করে চলে।

আজকের নিবন্ধের তৃতীয় ও সর্বশেষ প্রসঙ্গ হলো অযোগ্য লোকের স্বপ্নবিলাস। এ শ্রেণির লোকের কারণে সমাজ-সংসারে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। তারা কাজকর্মের চেয়ে গালগল্প ও পরিশ্রমের পরিবর্তে আরাম-আয়েশের তত্ত্ব প্রচার করতে থাকে। এসব লোক তার নিজের জীবন-জীবিকার জন্য যেমন জগদ্দল পাথরের মতো বাধা হয়ে দাঁড়ায় তেমনি তারা আরও অনেক লোকের জীবন তছনছ করে দেয়। মানুষ তার স্বভাবমতে গল্প শুনতে ভালোবাসে। সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখতে বিশেষ করে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করে। তারা পর্ণকুটিরে শুয়ে রাজকন্যার সঙ্গে বাসর করার স্বপ্ন অথবা সুন্দরবনের কোনো হোতা বা শীর্ণ খালে চিংড়ি মাছের পোনা ধরতে ধরতে বিরাট এক রাজপ্রাসাদ বানানোর কল্পনায় ডুবে যেতে পছন্দ করে। দরিদ্র ও অভাবী মানুষের চিন্তা সব সময় দুর্বল হয়। তাদের লোভ ও বড়লোক হওয়ার আশাও প্রবল। অন্যদিকে কম পরিশ্রমে অধিক অর্থ লাভের সহজ-সরল পথের খোঁজে দরিদ্ররা সুযোগ পেলেই অলীক সব কল্পনা শুরু করে দেয় এবং গুপ্তধনের সন্ধানে দিনরাত চেষ্টা-তদবির করতে থাকে। মানুষের গল্প শোনার অভ্যাস কল্পনার রাজ্যে প্রাসাদ বানানোর স্বপ্ন অথবা দরিদ্র মানুষের সাধারণ ভ্রান্তি ও দুর্বলতাকে পুঁজি করে অযোগ্য অথচ ধড়িবাজ স্বপ্নবিলাসীরা মাঝেমধ্যে জমিনে নানা অনাসৃষ্টি ও বিপর্যয় ঘটিয়ে ফেলে। তারা গৃহবধূদের কুলহারা কলঙ্কিনী বানিয়ে শেষ পর্যন্ত পতিতালয়ে বিক্রি করে দেয়। তারা নবযৌবনপ্রাপ্ত কিশোর-কিশোরীকে যৌনতার ফাঁদে ফেলে অথবা মাদকের জালে আটকিয়ে সর্বনাশ ঘটিয়ে দেয়। তারা মিথ্যা স্বপ্ন ও মিথ্যা গল্পের ফাঁদ পেতে কবিতা বা সংগীতের সুর তুলে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো গরিব-দুঃখী, মেহনতি মানুষদের আকৃষ্ট করে কখনো হায় হায় কোম্পানি, কখনো হায় হায় সমবায় ব্যাংক কিংবা মাল্টি লেভেলের কোম্পানির মাধ্যমে সর্বনাশ করে ছাড়ে। আপনি যদি বাংলাদেশের এযাবৎকালের মহাপ্রতারক ও ধান্ধাবাজ লুটেরাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন তবে দেখতে পাবেন, তারা শৈশব থেকেই প্রায় সর্বক্ষেত্রে অযোগ্য ছিল। তারা সুন্দর করে মিথ্যা বলত- নিজেরা মিথ্যা স্বপ্ন দেখত এবং অন্যকে সেসব মিথ্যা স্বপ্ন বিশ্বাস করানোর জন্য চমৎকার কৌশল রপ্ত করেছিল। ফলে এসব অযোগ্য স্বপ্নবিলাসীর কারণে কত সুন্দর সুন্দর সংসার যে ধ্বংস হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। তেমনি তাদের কারণে জাতীয় অর্থনীতির রাষ্ট্রীয় অর্থ এবং দেশের ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে বা হচ্ছে তা লাখো কোটি সিঁধেল চোর, দাগি আসামি, চিহ্নিত ধর্ষণকারী ও দুর্ধর্ষ ডাকাত মিলেও করতে পারে না।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য ও কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *