কোম্পানীগঞ্জে দফায় দফায় ঘুষ দিয়েও বন্দোবস্ত পায়নি চারশতাধিক ভূমিহীন পরিবার

গিয়াস উদ্দিন রনি, কোম্পানীগঞ্জ-নোয়াখালী :

প্রায় ১৫ বছর পূর্বে হাতিয়ায় নদী ভাঙনের শিকার হয়ে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরএলাহী ইউনিয়নের চরকলমী মৌজায় পাড়ি জমান ছায়দুল হক (৫০)। এই জায়গাও ছিল তখন ডুবো চরের মতো। নদীর সঙ্গে অনেকটা যুদ্ধ করে এই জমিতে বাড়ি-ঘর নির্মাণ করে বসতি শুরু করেন। দীর্ঘ ১৫বছর পর্যন্ত সরকারের এ খাস জমিতে বসবাস করে এবং দুই দফায় বন্দোবস্তের জন্য টাকা দিয়েও মেলেনি বন্দোবস্ত। উল্টো প্রতিনিয়ত তৈরি করা সম্পদ হারানোর আতংকে রয়েছে এ বৃদ্ধ।

শুধু ছায়দুল হক নয়। উপজেলার উত্তর চরকলমী ও দক্ষিণ চরকলমীর চারশতাধিক পরিবার দুই দফায় ঘুষ দিয়েও বন্দোবস্ত না পেয়ে উল্টো জমি হারানোর আতংকে রয়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, তহশিলদারের নাম ভাঙিয়ে স্থানীয় আজাদ সর্দার এক দফায় ১২’শ টাকা এবং স্থানীয় মোস্তফা মেম্বার আরেক দফায় ১৫০০ টাকা করে ঘুষ নিয়েছে। তারা বলেছে প্রত্যেকের নামে বন্দোবস্তের কাগজপত্র করতে বিভিন্ন স্থানে ঘুষ দিতে হবে। এসব টাকা স্থানীয় তহশিলদারকে দিতে হবে। জমি বন্দোবস্ত পাওয়ার জন্য বাধ্য হয়ে তারা ঘুষ দিয়েছে। কিন্তু বন্দোবস্ততো দুরের কথা কোনো প্রকার কাগজপত্র করেনি তারা।

স্থানীয় জানান, ২০০১ সাল থেকে মূলত এই দুই চরে মানুষের বসবাস শুরু হয়। তৎকালীন সময় এই জমিতে তখনও জোয়ারের পানি আসা-যাওয়া করতো। ডুবো চরের মধ্যেই এসব মানুষ বাড়ি-ঘর নির্মাণ করে বসতি শুরু করে। এখানে যারা বসবাস করছে তাদের বেশিরভাগই নদী ভাঙ্গা। জেলার দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া, সুবর্ণচর ও কোম্পানীগঞ্জের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে বাড়ি-ঘর হারিয়ে তারা এখানে বসতি স্থাপন করে। আবার অনেকে রয়েছে যারা নদী ভাঙা নয়, তবে ভূমিহীন। শুরুর দিকে বসতি স্থাপন করার সময় তারা দস্যুদের টাকা দিয়ে ডুবো চরে দখল নেয়। পরবর্তীতে যখন নদী ধীরে ধীরে দুরে চলে যায় তখন চাষাবাদ শুরু করে। চাষাবাদ করতে গিয়েও দস্যুদের চাঁদা দিতে হয়েছে বাসিন্দাদের। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হলে চর থেকে দস্যুতা চলে যায়। এভাবে কঠোর পরিশ্রম আর লড়াই করে জমিকে করেছে বসবাস উপযোগি। গাছ-গাছালি লাগিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করে আসছে তারা।

ফয়েজ মেস্ত্রী, ইউছুপ, এরশাদ ও রৈইছল হক বলেন, দস্যুতা না থাকলে প্রভাবশালীদের অত্যাচারে তারা অতিষ্ট। একদিকে জমি বন্দোবস্তের জন্য লড়াই করতে হচ্ছে প্রশাসনের সঙ্গে। অপর দিকে অচেনা-অজানা প্রভাবশালী এসে ধমক দিয়ে যায় এসব জমি নাকি তাদের নামে বন্দোবস্ত হয়ে গেছে। ফলে সন্তান-সন্তুতি নিয়ে এত বছর পরও জমি হারানোর আতংকে রয়েছে তারা। সরকারি খাস জমিতে ভূমিহীনদের অধিকার থাকলেও বর্তমানে তারা আতংকে রয়েছে। তারা বলছে, ইতোমধ্যে অনেকে প্রভাবশালীদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে জমি চেড়ে বেড়ির পাশে গিয়ে বসতি শুরু করেছে। ভূমিহীনদের উচ্ছেদ করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে মাছের প্রজেক্ট। এ সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জড়িত। প্রভাবশালীরা জনপ্রতিনিধিদের দিয়ে ভূমিহীনদের উচ্ছেদ করার পাঁয়তারা করছে। ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মতিন তোতা ১৫-১৬ বছর পূর্বে প্রায় দুইশত ভূমিহীন পরিবারের বসত ঘরে অগ্নি সংযোগ করে তাদের এ অঞ্চল থেকে তাড়িয়ে দেয়। পরে সেখানে বিভিন্ন প্রভাবশালীরা মৎস্য প্রজেক্ট গড়ে তোলে। বর্তমানেও নানা অজুহাতে এখানে বসবাসকৃত ভূমিহীনদের উচ্ছেদের পাঁয়তারা চলছে।

ফয়েজ মেস্ত্রী বলেন, তহশিলদ্বার সেলিম চৌধুরী স্থানীয় ৭নং ওয়ার্ডের মেম্বার মোস্তার মাধ্যমে ১৫০০ টাকা করে ঘুষ নিয়েছে। কথা ছিল সহসায় তাদের বন্দোবস্ত দেয়ার নিমিত্তে প্রক্রিয়া শুরু হবে। কিন্তু তহশিলদার বদলী হলেও তাদের জমি বন্দোবস্ত হয়নি। এখন টাকাও দিচ্ছে না ওয়ার্ড মেম্বার। এর আগে আজাদ সরদার নামে এক ব্যক্তিও তহশিলদ্বারের নাম ভাঙিয়ে ১০০০ টাকা করে ঘুষ নিয়েছে।

এ বিষয়ে ওই ওয়ার্ডের সদস্য মোস্তফা মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে কথা হয় আজাদ সরদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, তিনি কারো কাছ থেকে তহশিলদ্বারের কথা বলে টাকা নেয়নি। তবে ২০০ টাকা করে মসজিদের জন্য নিয়েছেন। এছাড়া ভূমিহীনরা নিজেরাই ফরমের জন্য বসুরহাট গিয়ে টাকা দিয়েছেন। বর্তমানে বন্দোবস্তের প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি।

জানতে চাইলে চরএলাহী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক বলেন, কেউ যদি তহশিলদ্বারের নাম ভাঙিয়ে ভূমিহীনদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে থাকে প্রমান ফেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি ওই ব্যক্তি পরিষদের মেম্বারও হয়ে থাকে তাহলেও তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ভূমিহীনদের খাস জমি বন্দোবস্ত দিতে তিনি নিজেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন।

দৃষ্টি আকর্ষণ করলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. জামিরুল ইসলাম বলেন, খাস জমি বন্দোবস্তের জন্য নামে মাত্র কিছু টাকা প্রয়োজন হয়। যদি কেউ ঘুষ নিয়ে থাকে প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি ভূমি কর্মকর্তাকে দিয়ে বিষয়টি সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রকৃত ভূমিহীনদের মধ্যে সরকারি খাস জমি বন্দোবস্ত প্রদানের প্রক্রিয়া করবেন বলেও জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *