Main Menu

নেতা হওয়ার রকমারি পদ্ধতি এবং পূর্বাপর পরিণতি

 

গোলাম মাওলা রনি:নেতা হওয়ার রকমারি পদ্ধতির কীর্তি-কাহিনী বলে শেষ করা যাবে না। যুগ-যুগান্তরের বহু মানব এবং মহামানব নেতা-নেত্রী নেতৃত্ব সম্পর্কে বহু কথা বলেছেন। কারো কারো মতবাদ, রীতিমতো কিংবদন্তির দলিল হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। অন্য দিকে, কারো কারো মতবাদ শয়তানের বক্তব্য হিসেবে সীমাহীন বিতর্ক সৃষ্টির পর দুনিয়াবাসীর নিন্দা ও অভিশাপের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। বৈধভাবে অর্থাৎ জায়েজ এবং অবৈধভাবে অর্থাৎ নাজায়েজ নেতৃত্ব সৃষ্টির বিপরীতমুখী হাজারো কলাকৌশলের মধ্যে আপনি কোনটি বেছে নেবেন তা একান্তই আপনার ব্যক্তিগত রুচি-অভিরুচি অথবা বিকৃত রুচির ব্যাপারস্যাপার। এ ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত কোনো উপদেশ বা অনুরোধ আজকের নিবন্ধে প্রকাশ পাবে না।

 

আজকের নিবন্ধে অবশ্যই নাজায়েজ নেতা এবং নেতৃত্ব সম্পর্কে কিছু বলব না। নেতা হওয়ার প্রাকৃতিক নিয়ম, পেশাদারি ইচ্ছা এবং উত্তম মানুষজনের নিরন্তর চেষ্টা-তদবির সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনার চেষ্টা করব। আপনি যদি একজন উত্তম নেতা হতে চান অথবা উত্তম নেতার অনুসারী হয়ে দুনিয়া এবং আখেরাতে মহান আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত এবং রাসূল (সা.)-এর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চান, তবে আপনাকে প্রথমেই জানতে হবে নেতা কে এবং নেতা কেন দরকার। তারপর আপনি জানবেন নেতা হওয়ার পদ্ধতি এবং খায়ের ও বরকত সম্পর্কে। সবার শেষে উত্তম নেতৃত্বের পূর্বাপর কিছু ঐতিহাসিক পরিণতি জেনে নিলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আপনার ঈমান এবং আকিদা মজবুত হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এবার আল্লাহর ওয়াস্তে আজকের প্রসঙ্গ শুরু করা যাক-

 

একজন নেতা কোনো সাধারণ মানুষ নন। অনেক মানুষের সমন্বিত চিন্তাশক্তি, ইচ্ছাশক্তি এবং আশা-আকাক্সক্ষাকে ধারণ করতে সক্ষম ব্যক্তিই নেতা। সাধারণ মানুষ যা চিন্তা করতে পারেন না, নেতা তা করেন। অন্যরা যেটা বলতে বা করতে সাহস পান না, সেটা নেতা করে থাকেন সিংহবিক্রমে। মানুষের মনের অব্যক্ত বেদনা, পুঞ্জীভূত ক্ষোভ-বিক্ষোভ এবং না বলা কথামালা একজন নেতা চমৎকারভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন এবং জনগণের প্রয়োজন এবং ইচ্ছানুসারে তিনি তা সর্বসম্মুখে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে ব্যক্ত করেন। নেতা সব সময় নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুকে টার্গেট করে এগোতে থাকেন এবং টার্গেটে পৌঁছানোর জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। তিনি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তার কর্মী, অনুসারী এবং সমর্থক সৃষ্টি করেন এবং সবার সহযোগিতা নিয়ে অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হন।

 

নেতা কোনো দিন নিজের স্বার্থের কথা কল্পনা করেন না। তিনি কোনো দিন একা চলেন না- একা ভোগদখলের পাঁয়তারা করেন না এবং মানুষজনের সাথে শত্রুতা পোষণ করেন না। নেতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তার দরদভরা বিশাল হৃদয় এবং প্রকৃতি হলো অনুপম এবং অনুকরণীয় ক্ষমা করে দেয়ার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা। তিনি মন্দ বিষয়ে দৃষ্টিপাত করেন না এবং তার ওপর প্রেরণা সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার দুরন্ত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে থাকেন। নেতার সবচেয়ে বড় গুণ হলো- যোগাযোগ রক্ষা করার অতুলনীয় ক্ষমতা। তিনি সবার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেন। সবার বক্তব্য শোনেন এবং জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার সাথে সামঞ্জস্য রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

 

নেতা কেন দরকার এবার এ প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করা যাক। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে নেতৃত্বদানের মাধ্যমে অসাধ্য সাধন এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য নেতা দরকার হয়। পরিবার, সমাজ, গোষ্ঠী কিংবা রাষ্ট্র নেতা ছাড়া চলতে পারে না। মানুষের সামাজিক জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ নেয়ামতটির নাম সৎ ও যোগ্য নেতা। এ কারণে হাজার হাজার বছরের ইতিহাসে সর্বকালের ঈমানদার মুমিন ও মোত্তাকিরা সৎ, যোগ্য এবং খোদাভীরু নেতা লাভের জন্য আল্লার দরবারে নিয়মিত প্রার্থনা করতেন। স্বয়ং আল্লাহ তার কালামে রব্বানিতে উত্তম নেতা হওয়ার এবং উত্তম নেতা লাভের প্রার্থনা কিরূপে করতে হবে তা শিখিয়ে দিয়েছেন। রাসূলে আকরাম সা: নামাজের পর সর্বদা দোয়াটি করতেন, যার একটি বাক্য হলো- হে আল্লাহ তুমি আমাকে পরহেজগারদের নেতা বানিয়ে দাও।

 

পৃথিবীর বহু জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায় বহুবার নিজেদের বদ খাছলত এবং বদ আমলের দরুন জালেম ও জাহেল শাসকের কবলে পড়েছেন। অনেকে আবার নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় পড়ে রীতিমতো সিভিল ওয়ারের অরাজকতার শিকার হয়েছেন। ভুক্তভোগীরা দলবেঁধে তৎকালীন নবী-রাসূল অথবা আউলিয়া কেরামদের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন আল্লার দরবারে ফরিয়াদ জানানোর জন্য। বনি ইসরাইল জাতির এমনতরো দুর্ভোগ এবং খোদায়ী সাহায্যে নেতা লাভের কাহিনী আল কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে। জালুত নামক এক অত্যাচারীর আক্রমণের কবল থেকে রক্ষার জন্য স্বয়ং আল্লাহ হজরত তালুতকে বনি ইসরাইল জাতির নেতা মনোনীত করে দিয়েছিলেন।

 

নেতা হওয়ার রকমারি পদ্ধতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উত্তম এবং কার্যকরি পদ্ধতিটি স্বয়ং আল্লাহ তার নিজের জিম্মায় রেখেছেন। তিনি তার পছন্দ মোতাবেক, ইচ্ছে মাফিক অথবা রুচি ও প্রয়োজন অনুসারে স্থান কাল পাত্র ভেদে উত্তম নেতা মনোনীত করে পৃথিবীবাসীকে ধন্য করেন। দ্বিতীয় স্তরের উত্তম নেতার মধ্যে জন্মগতভাবে নেতৃত্বের অনুপম গুণাবলিগুলো লুকায়িত থাকে এবং বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে সেসব গুণাবলি জনসম্মুখে সূর্যের তেজোদীপ্ত প্রখর কিরণের মতো ঝলসে ওঠে। ফলে জনগণ পঙ্গপালের মতো দিশেহারা হয়ে নেতার পানে ধেয়ে যান তার আদেশ-নির্দেশ এবং উপদেশ শ্রবণের জন্য। তৃতীয় স্তরের উত্তম নেতৃত্ব উত্তরাধিকার সূত্রে পারিবারিকভাবে গড়ে ওঠে। রাজার সন্তানের রাজা হওয়া কিংবা গোত্র প্রধানের মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীর নেতৃত্ব লাভ এই পর্যায়ে পড়ে। চতুর্থ স্তরে রয়েছে ব্যক্তিপর্যায়ের চেষ্টা-তদ্বির, শিক্ষা-দীক্ষা লাভ এবং নিজের মধ্যকার অন্তর্নিহিত নেতৃত্বের গুণাবলি জাগিয়ে তুলে নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হওয়া।

 

উত্তম নেতা হওয়ার পদ্ধতিগুলোর মধ্যে বিভিন্নতা থাকলেও তাদের কর্মকাণ্ড, আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনা এবং মন-মানসিকতা কিন্তু অভিন্ন। উত্তম নেতার হাজারো বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এতসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে আজকের নিবন্ধে কেবল একটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করব। একজন নেতার প্রধানতম গুণাবলির মধ্যে অন্যতম হলো তার যোগাযোগ করার ক্ষমতা। ইংরেজিতে যাকে কমিউনিকেশন স্কিল বলা হয়। নেতাকে সফল এবং উত্তম হতে হলে তার মধ্যে কমিউনিকেটর হওয়ার অসাধারণ যোগ্যতা থাকতে হবে। বাংলায় এই শব্দের প্রতিশব্দ বললে অপূর্ণ বিষয়টি পরিষ্কার হবে না। এ ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে যে, নেতা সবার সাথে আলাপ-আলোচনা করবেন, আলোচনার জন্য জনগণকে নিজের কাছে নিয়ে আসবেন অথবা জনগণের কাছে যাবেন।

 

আলাপ-আলোচনা বলতে সাধারণত জনগণের অভাব-অভিযোগ, ক্ষোভ-বিক্ষোভ, চাহিদা, আশা-আকাক্সক্ষা শ্রবণ করাকে বুঝায়। জনগণকে জড়ো করে বক্তৃতা দেয়ার নাম আলাপ-আলোচনা নয়। যে নেতার বক্তব্য দেয়ার ক্ষমতার তুলনায় শ্রবণ করার ক্ষমতা অধিক, সেই নেতা ততটা সফল এবং সার্থক হওয়ার ক্ষমতা রাখেন। তো যদি জনগণের কথা না শুনে উল্টো জনগণকে নিজের কথা শোনাতে বাধ্য করেন সে ক্ষেত্রে নেতাটি নিজের প্রতি মস্তবড় জুলুম করলেন এবং নিজেকে আসমানী সহযোগিতা প্রাপ্তি থেকে মাহরুম বানিয়ে ফেললেন। পৃথিবীর তাবৎ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, জ্ঞানী এবং গুণীজনেরা নেতাদের সফলতার মূলে তাদের বক্তৃতা দেয়ার পরিবর্তে তাদের অধিকমাত্রায় শ্রবণ করার ক্ষমতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

 

পবিত্র কুরআনের সূরা ইউনুসের ৬৭ নম্বর আয়াতে শ্রবণ করার ফজিলত সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। অন্য দিকে, সূরা মুলকের ১০ নম্বর আয়াত এবং সূরা ফুছচ্ছিলাতের ২৬ নম্বর আয়াতে শ্রবণ না করার ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। সূরা আনফালেও একইভাবে সতর্ক করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের ভাষ্যমতে কাফির, গাফেল এবং জাহান্নামিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হবে ঠিকমতো শ্রবণ না করা এবং সে মতে মান্য না করা। অন্য দিকে, সূরা মায়েদার ৮৩ নম্বর আয়াতে উত্তম শ্রবণকারীর মারেফতি ফজিলত সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। এই আয়াতের তাৎপর্য হলো- যারা মনোযোগসহকারে শোনেন তাদের নসিবে এলমে মারেফত লাভের সুযোগ এসে যায়। তারা অশ্রুসিক্ত নয়নে এবং কোমল হৃদয়ের মমত্বপূর্ণ অভিব্যক্তি নিয়ে সব কিছু শোনার যোগ্যতা অর্জন করে ফেলে।

 

নেতা হওয়ার যেমন রকমারি পদ্ধতি রয়েছে, তেমনি নেতৃত্বেরও রয়েছে হাজারো প্রকার ভেদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিকতা, শিল্প-কলকারখানায় শ্রমঘন পরিবেশ, কৃষিক্ষেত্র, খেলাধুলা, বিনোদন প্রভৃতি সব ক্ষেত্রে যেমন নেতা দরকার তেমনি ধর্মকর্মেও নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রের নেতা-নেত্রী কিরূপে উত্তম হতে পারবেন তার শত সহস্র উদাহরণ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পৃথিবীর ইতিহাস, প্রকৃতি ও পরিবেশের মধ্যে রেখেছেন। আল্লাহ প্রেরিত সব যুগের সব নবীই ছিলেন অতি উঁচু মর্তবার উত্তম নেতা। তারপর যদি আমরা ওলি আউলিয়া, গাউস, কুতুব প্রমুখের জীবনী আলোচনা করি তবে সেখানেও উত্তম নেতৃত্বের অনুপম গুণাবলি দেখতে পাওয়া যাবে।

 

নেতা যেমন উত্তম হন তেমনি তার সঙ্গী-সাথী, পরামর্শক, কর্মী ও সমর্থকেরা ও উত্তম হয়ে থাকে। উত্তম নেতার অনুসারীরা কোনো দিন মন্দ ও বাজে প্রকৃতির হন না। নেতা প্রথমে পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং পরে তা বাস্তবায়নের জন্য সঙ্গী-সাথী এবং নেতাকর্মী সংগঠিত করেন। নিজের পরিকল্পনাগুলো তিনি তার কর্মীদের কাছে উপস্থাপন করেন। একটি উন্মুক্ত এবং খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে নেতার পরিকল্পনা সম্পর্কে তার সঙ্গী সাথী এবং কর্মী-সমর্থকেরা নিজেদের মতামত, আলোচনা, সমালোচনা ইত্যাদি নির্ভয়ে এবং নিঃসংকোচে ব্যক্ত করার সুযোগ লাভ করেন। কোনো একটি বিষয়ে যদি সবাই বিরূপ মন্তব্য করেন অথচ নেতা চান বিষয়টি বাস্তবায়ন করার জন্য, সে ক্ষেত্রে উত্তম নেতা ধৈর্যহারা না হয়ে কৌশলের আশ্রয় নেন এবং নিজের পরিকল্পনাটি পুনরায় চমৎকারভাবে তথ্য ও প্রমাণ সহকারে উপস্থাপন করেন। এটি কেমন হতে পারে তার উদাহরণ আমরা স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত ওয়াল জালালের একটি কর্ম থেকে শিক্ষা লাভ করতে পারি, যা আজকের নিবন্ধের শেষাংশ বর্ণিত হবে।

 

আমরা যদি সব নবী এবং রাসূলের জীবনী পর্যালোচনা করি তবে দেখব যে, তারা কেউই নিঃসঙ্গ ছিলেন না। তাদের সবারই ছিল উত্তম সাহাবায়ে কেরাম এবং অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। তারা সবাই মিলে নিরন্তরভাবে সংগ্রাম করেছেন নিজেদের আপন রক্তের আত্মীয়, পরিবারপরিজন, সমাজ সংসার, গোত্র এবং রাষ্ট্রশক্তির সাথে। ক্ষেত্রবিশেষে তাদের অনেকে সামরিক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা সঙ্গী-সাথীদের সাথে উদ্ভূত পরিবেশ, পরিস্থিতি এবং সমস্যা নিয়ে আলাপ আলোচনা করতেন অত্যন্ত খোলা মনে। নবী ও রাসূলেরা বক্তৃতা দেয়ার চেয়ে শুনতে বেশি পছন্দ করতেন এবং নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার পরিবর্তে সমন্বিত এবং গ্রহীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তৎপর হতেন। আল্লার রাসূল সা:-এর সব যুদ্ধযাত্রা এবং যুদ্ধের ময়দানের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের ইতিহাস পর্যালেচানা করলে দেখা যায়, তিনি বেশির ক্ষেত্রে সাহাবাদের মতামতকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। খন্দকের যুদ্ধের পরিকল্পনা তিনি হজরত সালমান ফারসি রা:-এর পরামর্শে করেছিলেন। তেমনি বদর, ওহুদ, হুনায়েন প্রভৃতি যুদ্ধের সঠিক প্রস্তুতি, পরিকল্পনা এবং আক্রমণের পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি সাহাবাগণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

 

উত্তম নেতা-নেত্রীরা সব সময়ই জমিনের জন্য খোদাই বরকত বয়ে আনেন। তাদের সময়কালে সব কিছুর ঊর্ধ্বে মানবিকতা স্থান পায়। ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা, গণতন্ত্র, সমঅধিকার এবং দুষ্টের দমন ও শিষ্টের প্রতিপালনের দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ সর্বদা উত্তম নেতার মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময় মানুষের অন্তরে দরদ মায়া মমতা এবং স্নেহ ভালোবাসার উৎসব শুরু হয়ে যায়। আত্মত্যাগ, পরোপকার, জনকল্যাণ ইত্যাদি শুভকর্মের বন্যায় দেশ, কাল, সমাজ-সংসার প্লাবিত হয়। মানুষের মন কৃতজ্ঞতায় পূর্ণ থাকে এবং মস্তিষ্ক শয়তানি চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে বিস্ময়কর সব আবিষ্কার এবং উদ্ভাবনের পেছনে কর্মযজ্ঞ শুরু করে। মানুষ আত্মিক উন্নয়নের চরমে পৌঁছে। ধর্মকর্ম, আনন্দ-অনুষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য, দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড ইত্যাদি কোনোটির সাথে কোনোটির দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাত হয় না। সামাজিক এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চমৎকার সব নজির সৃষ্টি হয়ে যায়। জমিনের এতসব শুভকর্মের আয়োজনে আসমানের মালিক তার রহমত বরকত হেদায়েত এবং মাগফিরাতের সব জানালা-দরজা বান্দাদের জন্য খুলে দেন।

 

আমরা আজকের নিবন্ধের একেবারে শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। এবার নেতার কর্মপদ্ধতি কেমন গণতান্ত্রিক হওয়া উচিত, তা স্বয়ং আল্লাহ পাকের একটি কর্মের উদাহরণ দিয়ে শেষ করব। আল্লাহ যখন সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি মানবমণ্ডলী সৃষ্টি করবেন, তখন তিনি বিষয়টি আলোচনার জন্য ফেরেশতাগণকে একটি মাহফিলে জমায়েত করলেন। আল্লাহ মানব সৃষ্টির ব্যাপারে নিজের ইচ্ছার কথা জানিয়ে ফেরেশতাদের মতামত চাইলেন। এটি তিনি করেছেন কেবল মাত্র জমিনে তার বান্দাদের জন্য উদাহরণ সৃষ্টির জন্য। কারণ আলিমুল গাইব হিসেবে তিনি অবশ্যই মানব সৃষ্টির ফলাফল জানেন। অন্য দিকে, অমুখাপেক্ষিতার গুণাবলি এবং কুন ফাইয়া কুনের মালিক হওয়ার কারণে তার কোনোই দরকার ছিল না বিষয়টি নিয়ে ফেরেশতাদের সাথে আলোচনা করার। তার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার শক্তি ও সামর্থ্য জমিনে কারো নেই এবং ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় হোক তার সব নির্দেশ তামাম মাখলুকাত যেখানে মানতে বাধ্য, সেখানে আল্লাহর এ ধরনের আলোচনা নিশ্চয়ই বিরাট তাৎপর্য বহন করে।

 

আল্লাহর বক্তব্য শোনার পর ফেরেশতারা মানুষ সম্পর্কে নিজেদের মতামত প্রকাশ করল। সবাই একবাক্যে বলল ইয়া বারে ইলাহি। ইবাদত বন্দেগির জন্য তো আমরাই আছি, মানুষ লাগবে কেন। তা ছাড়া মানুষ জমিনে দ্বন্দ্ব ফাসাদ এবং রক্তক্ষয়ী ঝগড়াঝাটি, মারামারি এবং যুদ্ধবিগ্রহ করে ভয়ানক বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। আল্লাহ মনোযোগ সহকারে ফেরেশতাদের কথা শুনলেন কিন্তু কোনো মন্তব্য করলেন না। তিনি সে দিনের মতো মাহফিল স্থগিত করলেন। এরপর আদমকে সৃষ্টি করে তাকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দিলেন। তামাম সৃষ্টিকুলের ইলমে শরিয়ত-মারেফত, হক্কিকত ছাড়াও বিশেষ হিকমা দান করলেন। হজরত আদম আ: যখন আল্লাহর কুদরতের শান-মান এবং নজিরে পরিণত হলেন তখন তাকে দলিল হিসেবে উপস্থাপনের জন্য পুনরায় ফেরেশতাদের মাহফিল ডাকা হলো।

 

মাহফিলে উপস্থিত সব ফেরেশতার আসনে আল্লাহ স্বয়ং তার আপন কুদরত, মাখলুফাত এবং আসমান-জমিন, বেহেশত দোযখ, আরশে আজিম এবং রূহজগৎ সম্পর্কে হজরত আদম আ:কে জিজ্ঞাস করলেন। তখন তিনি গড় গড় করে সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিলেন অত্যন্ত নিখুঁত এবং নিপুণভাবে। ফেরেশতারা আদম আ:কে দেখে এবং তার জ্ঞানগর্ভ জবাব শুনে যারপরনাই বিস্মিত এবং বিমোহিত হয়ে গেলেন। তারপর আল্লাহ ফেরেশতাদের জিজ্ঞাসা করলেন- তোমরা কি পারবে আদমের মতো সব প্রশ্নের জবাব দিতে? ফেরেশতারা একবাক্যে বললেন- ইয়া আল্লাহ! এটা অসম্ভব নিশ্চয়ই আপনি যা জানেন তা আমরা জানি না। এই পর্যায়ে আল্লাহ আদম আ:-এর সৃষ্টিকৌশলতার সৌকর্য এবং জ্ঞান গরিমার শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি ফেরেশতাদের কাছ থেকে লাভ করার পর হুকুম করলেন আদমকে সিজদা করার জন্য।

 

লেখক :কলামিস্ট এবং সাবেক সংসদ সদস্য,  গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *