Main Menu

বাংলার শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত শিল্পী আবদুল আলিম

 

 

আনোয়ারুল হক আনোয়ার : পরের জায়গা পরের জমি, ডাকি তোমায় ও দয়াল, দুয়ারে আইসাছে পালকি নাইওরী, মনে বড় আশা ছিল যাব মদীনায়, এই যে দুনিয়া কিসের ও লাগিয়া, আমারে সাজাইয়া দিও নওসার ও সাজন, কেহ করে বেচাকেনা কেহ কাঁন্দে, হলুদিয়া পাখী সোনারই বরন পাখিটি ছাড়িল কে, মেঘনার কূলে ঘর বান্ধিলাম বড় আশা করে, প্রেমের মরা জলে ডুবেনা, তোমারো লাগিয়ারে সদাই প্রাণ আমার কান্দে, বহু দিনের পীরিত গো বন্ধু একই দিনে ভেঙ্গোনা ইত্যাদি অসংখ্য কালজয়ী গানের মাধ্যমে বাংলার শ্রেষ্ঠ কন্ঠ শিল্পী আবদুল আলিম কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে । মহান আল্লাহ পাক তাকে এমন এক সূর দান করেছিলেন – যে কিনা বাংলার শ্রেষ্ঠী সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে নিজের তুলে ধরেন।

 

শিল্পী আবদুল আলিম ১৯৩১ সালে ২৭ জুলাই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার তালিবপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন এবং ১৯৭৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ইন্তেকাল করেন । ছোটবেলা থেকেই তিনি সঙ্গীতের প্রবল অনুরাগী ছিলেন । কিন্তু পারিবারিক দৈন্যতার কারনে শিক্ষকের কাছে গান শেখার সৌভাগ্য হয়নি তার ।অন্যের গাওয়া গান শুনে গান শিখতেন। তার পিতার নাম মোহাম্মদ ইউসুফ আলী । প্রাইমারী স্কুলে পড়ালেখার সময় গ্রামাফোন রেকর্ডে গান শুনে গান গাইবার আগ্রহ জাগে আবদুল আলিমের । পরবর্তীতে তার সঙ্গীত গুরু ছিলেন সৈয়দ গোলাম আলী । অল্প বয়সেই বাংলার লোক সঙ্গীতের অমর শিল্পী গান গেয়ে পরিচিতি লাভ করেন । এরমধ্যে মাত্র তের বছর বয়সে অর্থাৎ ১৯৪৩ সালে তার গানের প্রথম রেকর্ড হয় । এরপর আবদুল আলিমকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি । তিনি হয়ে উঠেন বাংলার লোক সঙ্গীতের এক অবিসংবাদিত কিংবদন্তী পুরুষ । পরবর্তীকালে তিনি কলকাতায় শিল্পী আব্বাস উদ্দিন এবং কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে গান শুরু করেন । বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব বেদার উদ্দিন আহমদ, ওস্তাদ মোহাম্মদ খসরু, মমতাজ আলী খান, আবদুল লতিফ, কানাই লাল শীল ও আবদুল হালিম চৌধুরী প্রমুখ ব্যক্তিদের থেকে আবদুল আলিম লোক ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের উপর তালিম গ্রহন করেন ।

 

দেশ বিভাগের পর শিল্পী আবদুল আলিম ঢাকায় চলে আসেন এবং রেডিওতে স্টাফ আটিস্ট হিসেবে গান গাইতে শুরু করেন । পরে টেলিভিশন সেন্টার চালু হলে সেখানেও সঙ্গীত শুরু করেন । এছাড়া বাংলার প্রথম চ্চলচিত্র “মুখ ও মুখোশ“ সহ বেশকিছু বাংলা চ্চলচিত্রে গান করেন । এরমধ্যে সবচে উল্লেখযোগ্য চ্চলচিত্রটি ছিল “লালন ফকির“। শিল্পী আবদুল আলিমের পাঁচ শতাধিক গান রেকর্ড হয় । সে সময় তিনি বেশ কিছু উর্দূ গানও পরিবেশন করেন । শিল্পী আবদুল আলিম তার আধ্যাত্নিক ও মরমী মুর্শিদী গানের জন্য চীর স্বরণীয় হয়ে থাকবে । পেশাগত জীবনে শিল্পী আবদুল আলিম ঢাকা সঙ্গীত কলেজের লোকগীতি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন । সঙ্গীতে অনবদ্য অবদানস্বরুপ তাকে একুশে পদক, পূর্বানী চ্চলচিত্র পুরস্কার, বাংলাদেশ চ্চলচিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার, পকিস্তান মিউজিক কনফারেন্স ও লাহোর সঙ্গীত পরিবেশন করে পাঁচটি স্বর্ণপদক লাভ করেন ।১৯৭৭ সালে সরকার তাকে মরনোত্তর একুশে পদক প্রদানের মাধ্যমে বিশেষভাবে সন্মানিত করেন।

 

স্বাধীনতার পর শিল্পী আবদুল আলিম দেশের বিভিন্ন জেলায় সঙ্গীত পরিবেশন করেন । নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার তমরদ্দি ইউনিয়নের তমরদ্দি হাইস্কুল ময়দানে এক রাতে শিল্পী আবদুল আলিম সঙ্গীত পরিবেশন করেন । তখন অনুষ্ঠান ঘোষক সঙ্গীত পরিবেশনের জন্য শিল্পী আবদুল আলিমের নাম ঘোষনা করলে তিনি স্টেজে গান গাইতে আসেন । কালো ও সাধাসিধে প্রকৃতির মানুষটি স্টেজে উপস্থিত হলে হাজার হাজার দর্শক রাগে ক্ষোভে চীৎকার করে বলতে থাকে, উনি শিল্পী আবুদল আলিম নয় । আমরা শিল্পী আবদুল আলিমকে চাই । পরে শিল্পী আবদুল আলিম গান শুরু করলে উপস্থিত দর্শকরা বুঝতে পারে ইনি অাসল অাবদুল অালিম। তখন দর্শকরা করতালির মাধ্যমে তাদের প্রাণপ্রিয় শিল্পীকে অভিনন্দন জানান।

শিল্পী আবদুল আলিমের সন্তানরাও পিতার পদাঙ্ক অনুসরন করে আসছে । টিভি পর্দায় তারা পিতার কন্ঠে গাওয়া ঐতিহাসিক গানগুলো পরিবেশন করে পিতার স্মৃতি অক্ষুন্ন রাখেন।

 

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক  এবং বিশ্লেষক






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *