Main Menu

দাগনভূঞা থানা হাজতে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন

ফেনী প্রতিনিধি ঃ দাগনভূঞায় একটি শিশু হত্যার মামলায় মামলার গতি ভিন্ন দিকে মোড় ঘুরানোর অসৎ উদ্দেশ্যে আবু আহাম্মদ নামের এক নিরপরাধ যুবককে গ্রেফতার করে দাগনভূঞা থানা হাজতে এনে হাত-পা ও মুখ-চোখ বেঁধে পা উপরে মাথা নিচে দিয়ে উপুড় করে ঝুলিয়ে এবং পায়ু পথে জ্বলন্ত মোমবাতি ঢুকিয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বর নির্যাতন করা হয়েছে। নির্যাতিত আবু আহাম্মদ হতে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের উদ্দেশ্যে পুলিশ এমনটি করেছে বলে জানা গেছে।

ঘটনার বিস্তারিত অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত ৯ ডিসেম্বর দাগনভূঞার পূর্ব জয়নারায়ন পুর গ্রামের ওসমান আলী মিয়া বাড়ী (বড় বাড়ী) নাছির উদ্দিন বাবুর মেয়ে জাহিন তাসলিম রিনতি (৫) প্রথমে নিখোঁজ ও পরে মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনায় রিনতির বাবা নাছির উদ্দিন বাবু বাদী হয়ে একই বাড়ির এনামুল হক মিষ্টারের স্ত্রী রেহানা আক্তার পারুল (৪০) কে একমাত্র আসামী করে দাগনভুঞা থানায় প্রথমে জি.ডি ও পরে ১০ ডিসেম্বর হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। এ মামলায় বাদীর আর্জিতে রেহানা আক্তার পারুল ব্যতিত অন্য কোন আসামীর নাম উল্লেখ ছিল না। ঐ দিনই পুলিশ শিশুটির মৃত দেহ একই বাড়ীর জনৈক তসলিম উদ্দিন টিপুর বসত ঘরের পূর্ব পার্শ্ব হইতে এবং শিশুটির রক্তমাখা জামা কাপড় আসামী রেহানা আক্তার পারুলের বসত ঘরের ভিতর হইতে উদ্ধার করে। একই দিন আসামী পারুলকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয় বলে জানা যায়।

হত্যাকান্ডের অন্ততঃ ১২ দিন পর ২২ ডিসেম্বর দুপুর ২টায় এ মামলার তদন্ত কর্মকতা কোরাইশমুন্সী ফাঁড়ির ইনচার্জ এস.আই মোঃ সাইফুল ইসলাম মামলার বাদী নাছির উদ্দিন বাবুকে একই বাড়ীর মৃত মাহমুদুল হকের ছেলে আবু আহাম্মদকে সাথে নিয়ে  নিয়ে সন্ধ্যার পর কোরাইশমুন্সী ফাঁড়িতে যাওয়ার জন্য মোবাইল ফোনে ডেকে পাঠায়। সে মোতাবেক নাছির উদ্দিন বাবু ও আবু আহাম্মদ একসাথে কোরাইশমুন্সী পুলিশ ফাঁড়িতে যায় সন্ধ্যা ৭ টায়। ওই সময় কোরাইশমুন্সী ফাঁড়িতে এরা এসআই সাইফুল ইসলামের সাথে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার এক পর্যায়ে এসআই সাইফুল বলল, ‘‘চল আমরা দাগনভূঞা থানায় যেতে হবে। দরকার আছে।’’ কথামত এসআই সাইফুল, নাছির উদ্দিন বাবু ও আবু আহাম্মদ রাত ৮.৩০ মিনিট দাগনভূঞা থানায় পৌঁছলে ওসি (তদন্ত) আনোয়ারুল আজিমের মোকাবেলায় আবারও কিছুক্ষণ কথাবার্তা হয়। এক পর্যায়ে ওসি (তদন্ত) আনোয়ারুল আজিম ও এসআই সাইফুল ইসলাম রাত আনুমানিক ৯ টায় আবু আহাম্মদকে নাছির উদ্দিন বাবু হতে আলাদা করে থানা হাজতে আটক করে। এ প্রসঙ্গে নাছির উদ্দিন বাবু আবু আহাম্মদকে নিয়ে বাড়ী যেতে চাইলে ওসি (তদন্ত) ও এসআই সাইফুল বলে যে, ‘‘ তুমি বাড়ী যাও। মামলার তদন্তের স্বার্থে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে।’’ এতে নিরুপায় হয়ে নাছির উদ্দিন বাবু বাড়ী ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

এরপর রাত ১০ টার পর থেকে থানা হাজতে আবু আহাম্মদের উপর নেমে আসে মধ্যযুগীয় বর্বরতার খড়গ। প্রথমে ওসি (তদন্ত) ও এসআই সাইফুল ইসলাম জীবন পঙ্গু করে দেয়ার নানা হুমকি ধামকি দিয়ে হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার মিথ্যা স্বীকারোক্তি দেয়ার জন্য আবু আহাম্মদকে মানসিক চাপ দিতে থাকে। এতেও দরিদ্র দিনমজুর আবু আহাম্মেদ মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিতে অপরাগতা জানালে ওসি (তদন্ত) আনোয়ারুল আজিম হাত-পা বেঁধে পেটানোর নির্দেশ দেয়। নির্দেশ পেয়ে এসআই সাইফুল দু’একজন পুলিশ সদস্যের সহযোগিতায় আবু আহাম্মদকে নাইলনের রশি দিয়ে হাত-পা, মুখ বেঁধে ফেলে। এরপর ওসি (তদন্ত) আনোয়ারুল আজিম ও এসআই সাইফুল মিলে আবু আহাম্মদকে মোটা লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটাতে থাকে। মুখের মধ্যে কাপড় গুঁজে দিয়ে মুখ বেঁধে ফেলায় এ নির্যাতনে ঘড় ঘড় গোংগানি দিয়ে থানা হাজতের ফ্লোরে গড়াগড়ি দেয়া ছাড়া আত্মচিৎকার করতে পারেনি নির্যাতিত আবু আহাম্মদ। এক পর্যায়ে ওসি (তদন্ত) আনোয়ারুল আজিম আবু আহাম্মদের পাঁয়ু পথে জ্বলন্ত মোমবাতি ঢুকিয়ে নির্যাতন করে। এতেও আবু আহাম্মদ হত্যাকান্ডের মিথ্যা স্বীকারোক্তি না দেয়ায় হাত-পা বাঁধা আবু আহাম্মদকে হাজতের রড সিলিং এর সাথে পা উপরে দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে নির্যাতন করে ওসি (তদন্ত) আনোয়ারুল আজিম আর এসআই সাইফুল। এ প্রসঙ্গে ফেনী কারাগারের জেল গেটে আবু আহাম্মদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাকে টানা ৪২ মিনিট উপুড় করে ঝুলিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। পরবর্তীতে আবারও ঝুলানো থেকে নামিয়ে হাজতের ফ্লোরে শোয়াইয়া এ কর্মকর্তারা বুট ও বাঁশ দিয়ে পিষতে থাকে নিরাপরাধ আবু আহাম্মদকে। এক পর্যায়ে রাত ২ টার দিকে নির্মম নির্যাতনের চোঁটে আবু আহাম্মদ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। গভীর রাতে থানা হাজতে নির্যাতিত আবু আহাম্মদের গোংগানির আওয়াজে অনেক পুলিশ সদস্যও শিউরে উঠেছেন বলে জানা গেছে।

পরের দিন ২৩ ডিসেম্বর পুলিশ এবার ষড়যন্ত্রের ভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নেয়। ওই দিন সকাল ৮ টার দিকে এসআই সাইফুল ইসলাম আবু আহাম্মদকে ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য তার স্ত্রী আরজুমান আরাকে মোবাইল ফোনে থানায় ডেকে পাঠায়। সে মোতাবেক আরজুমান আরা স্বামী আবু আহাম্মদকে ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য সকাল ১০ টার দিকে থানায় আসলে এবার শুরু হয় কথিত সেই ভিন্ন ষড়যন্ত্রের নাটক। ওসি (তদন্ত) আনোয়ারুল আজিম ও এসআই সাইফুল ইসলাম আরজুমান আরাকে এই মর্মে বোঝাতে চেষ্টা করে যে, তোমার স্বামী আবু আহাম্মদ সব স্বীকার করে নিয়েছে। এবার তুমি স্বীকার কর তোমরা কিভাবে শিশুটিকে হত্যা করেছ। এতে তোমাদের ভাল হবে। এতে আরজুমান আরা মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিতে অস্বীকার করলে এবং নিজেদের নির্দোষ দাবী করলে এ পুলিশ কর্মকর্তারা এবার এদের জীবন পঙ্গু করে দিয়ে স্বামী স্ত্রী দু’জনকেই হত্যা মামলার আসামী করার হুমকি দেয়। এরা একজন নারী পুলিশ সদস্যকে দিয়ে থানার বিভিন্ন কক্ষে আটকে রেখে আরজুমান আরাকে ওই দিন সারাদিন জিজ্ঞাসাবাদের নামে মানসিক নির্যাতন ও হুমকি ধামকি দেয়। এতে আরজুমান আরার মত গ্রাম্য সহজ সরল ও দরিদ্র গৃহবধু অত্যন্ত অসহায় বোধ করে। এক পর্যায়ে ওসি (তদন্ত) আনোয়ারুল আজিম আরজুমান আরার নিকট তাদের স্বামী স্ত্রীকে ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য ২ লক্ষ টাকা ঘুষ দাবী করে। দরিদ্র দিন মজুরের স্ত্রী গৃহবধু আরজুমান আরা পুলিশের এ দাবী মেটাতে সক্ষম না হওয়ার অপরাধে এ পুলিশ কর্মকর্তা ক্ষিপ্ত হয়ে ওই দিন বিকাল ৩ টায় (২৩ ডিসেম্বর) আবার একটি ভিন্ন কক্ষে আবু আহাম্মদকে এনে হাত-পা বেঁধে শোয়াইয়া আরজুমান আরার সামনে নির্যাতন করে। ওসি (তদন্ত) আনোয়ারুল আজিম নিজে আবু আহাম্মদের পায়ের গোড়ালী, হাটু, মাজা বরাবর শরীরের উপর দাড়িয়ে বুট দিয়ে পিষতে থাকে। আরজুমান আরার চোখের সামনে স্বামীর উপর এ নিমর্ম নির্যাতন সইতে না পেরে সে অনেক কান্না কাটি ও অনুনয় বিনয় করলেও পুলিশের মন গলেনি। এ সময় এ নির্যাতন কর্মকান্ডে ওসি (তদন্ত) আনোয়ারুল আজিম এর সাথে এসআই সাইফুল ইসলামও অংশগ্রহন করেছিল বলে আরজুমান আরা জানায়। এরপর এক নারী পুলিশ আবু আহাম্মদ থেকে আরজুমান কে আলাদা করে ভিন্ন কক্ষে আটকে রেখে নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বীকারোক্তি ও চাঁদা আদায়ের জন্য মানসিক চাপ দিতে থাকে এবং স্বামীর মত নির্যাতনের হুমকি দেয়। ওই দিন বিকাল ৬ টার দিকে আবু আহাম্মদের আত্মীয় স্বজনরা কোনমতে গৃহবধু আরজুমান আরাকে ছাড়িয়ে নিলেও আবু আহাম্মদকে পুলিশ গ্রেফতার দেখিয়ে আটক রাখে।

এরপর পরের দিন ২৪ ডিসেম্বর বেলা ১১ টার দিকে নিরাপরাধ আবু আহাম্মদকে এ হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে সন্ধিগ্ন আসামী হিসাবে কোর্টে চালান করে দেয় পুলিশ। এ বিষয়ে মামলার বাদী নাছির উদ্দিন বাবুর সাথে কথা বলে জানা গেছে, তিনি তার বোনের জামাই আবু আহাম্মদ এ হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত নহে বলে দাবী করেন। আবু আহাম্মদ নিজ বাড়ীতে আপন চাচাতো বোন আরজুমান আরাকে বিয়ে করেন। সে সূত্রে নাছির উদ্দিন বাবু ও আবু আহাম্মদ আপন শালা-ভগ্নিপতি এবং আবু আহাম্মদ রিনতির আপন ফুফা হন। আবু আহাম্মদ রিনতিকে অনেক আদর-¯েœহ করতেন বলে জানা গেছে। এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, সম্ভবত মামলার মূল আসামী রেহানা আক্তার পারুল কে বাঁচানোর স্বার্থেই পুলিশ এমনটি করেছে। আবার একই বাড়ির তসলিম উদ্দিন টিপুকে গ্রেফতারে করেও পুলিশ টাকা পয়সার লেনদেন করে ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে নিরীহ এলাকাবাসী গ্রেফতার আতঙ্কে ভুগছে। রেহানা আক্তার পারুল সম্পর্কে খোজ নিয়ে জানা গেছে, এনামুল হক মিষ্টার তার দ্বিতীয় স্বামী এবং সে অত্যন্ত উচ্ছৃংখল, সুদখোর, বন্ধ্যা ও বদমেজাজী মহিলা। সুদের টাকার লেনদেনের সূত্র ধরেই রিনতির পরিবারের সাথে সম্প্রতি বিরোধ চলে আসছিল। ঘটনার দিন সে বার বার রিনতির বাবা মাকে অঘটন করার হুমকি দিচ্ছিল। রেহানা আক্তার পারুল তার আগের সংসারেও একটি শিশুকে হত্যা করার অভিযোগ রয়েছে এবং আগের স্বামীকে হত্যা চেষ্টার প্রেক্ষাপটে সংসার ভাঙ্গে। এছাড়া বর্তমান সংসারেও বৃদ্ধা শ্বাশুড়ীকে পানিতে ডুবিয়ে হত্যারও অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে আবু আহাম্মদকে ২৪ ডিসেম্বর কোর্টে চালান দেয়ার সংশ্লিষ্ট পত্রে (এস.আই সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত) দেখা যায়, পুলিশ বেশ কিছু মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে। ২২ ডিসেম্বর আবু আহাম্মদকে দাগনভূঞা থানা থেকে গ্রেফতার করা হলেও পুলিশ ওই পত্রে ২৩ ডিসেম্বর রাজাপুর বাজার থেকে গ্রেফতারের কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও পুলিশী নির্যাতনের জখমের বিষয়ে পুলিশ গ্রেফতারের সময় ধস্তাধস্তিতে জখম হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। বিজ্ঞ আদালত এ নির্যাতনের অভিযোগ আমলে নিয়ে আবু আহাম্মদের সু-চিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছেন এবং পুলিশের রিমান্ডের আবেদন বাতিল করেছেন বলে জানা যায়।

দরিদ্র আবু আহাম্মদ ডি.জি কম নামে একটি ডিস লাইন কোম্পানীতে দৈনিক মজুরীর ভিত্তিতে চাকুরী করে আসছে। পুলিশের এ নির্যাতনের ফলে আবু আহাম্মদ ভবিষ্যতে কর্মকরে খেতে পারবে কিনা তা নিয়ে আশংকা করছেন স্ত্রী আরজুমান আরা সহ এলাকাবাসী। সর্বশেষ মুহুর্তের খবর নিয়ে জানা গেছে, ফেনী কারাগারে আবু আহাম্মদ গুরুত্বর অসুস্থ। আদালতের নির্দেশে তার সু-চিকিৎসা চলছে।

 






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *