জন্ম দহনে, বেড়ে উঠা চিতায়, পেশা যার ঊল্কা চালানো, সে কী আগুনে ভয় পায় ?

মো. হুমায়ুন কবির >   মুক্তমত >                   প্রথমেই ধন্যবাদ জানাচ্ছি মহান স্রষ্টা আল্লাহকে যিনি আমার আকাঙ্খানুযায়ী আমাকে একজন পুলিশ অফিসার হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। তবে আমার আকাঙ্খা সৃষ্টি হয়েছিল আমার জীবনের একটা মর্মান্তিক ঘটনার প্রেক্ষিতে। সেই ট্র্যাজিডিই আমাকে ডাক্তার না হয়ে পুলিশ হওয়ার লক্ষ্যে ধাবিত করে। আল্লাহ আমার ডাক শুনেছেন। আমি পুলিশ হলাম। আমি গর্বিত এজন্য যে, পুলিশ না হয়ে অন্য বড় অফিসার হলেও আমার প্রতিশোধের বাসনা পূর্ণ হতো না। সারদা ট্রেনিং

আমার একটি স্ট্যাটাসে প্রায় এক বছর আগে লিখেছিলাম যে, অপরাধ বিজ্ঞাণীদের গবেষণায় ও আমার দীর্ঘ প্রায় ২১ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখতে পেয়েছি — “কোন ভাল মানুষ, নিরীহ ও শান্তিপ্রিয়  লোকেরা পুলিশের বিরুদ্ধে কারণে – অকারণে কথা বলতে আমি দেখিনি। যারা বলেছে তারা কোন না কোন ভাবে অপরাধী। সে হয়তো কোন অপরাধ কর্ম চালিয়ে যাচ্ছে নয়তো অপরাধ কর্মের কারনে পুলিশের ধাবড়ানি, শাটানি খেয়েছে অথবা আমার মত কোন অফিসারের লেখনীতে ১০/ ১২ বছরের বেশী সময় লাল দালানে থাকতে হয়েছিল। কারন আমি যদি না ঘুমিয়ে আপনাকে নিরাপদে ঘুমোতে দিই সেই আপনি আমাকে বকবেন কেন? কারা বকবে? বাজে বকবে তারাই, যারা অপরাধ করে পুলিশের কাছে পার পায়নি, কিংবা তার দ্বারা প্রতিদিন সম্পাদিত অপরাধ কার্যকলাপের জন্য আবার যেকোন সময় পুলিশের ধাবড়ানি, শাটানি খেতে পারে, এমন বাজে লোক  ছাড়া পাগলও পুলিশকে খারাপ বলতে শুনিনি। এটা এমন, ঠিক তেমন — রাতে অন্ধকার রাস্তা অতিক্রমের সময় পথিক ভীতি দুর করার জন্য যেমন আউলা সুরে বে-তালের গান গাইতে থাকেন।

 

বন্ধুরা, জানি আপনাদের সময় অনেক মূল্যবান আমার  লেখাটা বেশ লম্বা হচ্ছে, পড়তে গিয়ে ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটতে পারে কিন্তু কিছু লিখা না লিখলেই নয়। আপনারা নিশ্চয়ই  জানেন আমাদের দেশে প্রচলিত আইনে বিচারপ্রার্থীকে সকল সাক্ষ্য প্রমান উপস্থাপনের করে প্রমানের মাধ্যমেই বিচার পেতে হয়। তাই দীর্ঘ সময় পরে সাক্ষীরা বিভিন্ন প্রতিকুলতার বেড়াজালে পড়ে অধিকাংশ মামলাতেই বিচারপ্রার্থী কাঙ্খিত বিচার পায়। তাছাড়া আমাদের দেশে আরোও একটি জনশ্রুতি আছে যে, বিচারের সময় আদালত অপরাধীর প্রতি সহানুভূতিশীল থাকে। তা যাই হোক, অাসামীর বিরুদ্ধে অপবাধ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সাজা দেন না। অর্থাৎ অপরাধীকে আর কোন ভাবেই খালাস দেয়া যায় না সে ক্ষেত্রেও জেলে আসামীর আধিক্য ইত্যাদি বিবেচনা করে লঘুতম দন্ডাদেশই দিয়ে থাকেন। তারপরও রয়েছে আপীল করে কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনায় মওকুফ পাওয়ার সুবিধাও। এতদসত্বেও খুনের দায়ে যে লোক ২৫ বছরের মধ্যে ১৪ বছর কারাদন্ড ভোগ করেছিল, যে লোক কুখ্যাত জলদস্যু হিসেবে এলাকায় পরিচিত, যে লোক ডাকাতির মালামাল বন্টন বিরোধের কারনে সহযোগি ডাকাতদের দা’য়ের ১৬ বা ২৬ টি কোপে অাহত হয়েছিল। সে লোকটিই যদি জেল খেটে এসেই বিখ্যাত সাংবাদিক বনে যায়। তাহলে আর প্রকৃত সাংবাদিক সমাজের কালিমা লেপন হবে কবে কিভাবে ? একজন জলদস্যু ফেসবুকে লিখেই যদি সাংবাদিক হয়ে যায়, তাহলে তো আমি তোর চেয়ে অনেক বড্ডা সাংবাদিক।

 

এবার বলছি অাসল কথা–সোনাগানাজীতে দু’ এক চিহ্নিত ২/১ জন কুখ্যাত অপরাধী অাছে যাদের অতীত অপরাধের ইতিহাস সোনাগাজীর শিশু-কিশোর বৃদ্ধ সকলেরই জানা। যারা নাম নাই পত্রিকার একটা কার্ড কিনে নাম লেখায় সাংবাদিক। জেল খাটার সময় গল্প শুনেছে পুলিশ সাংবাদিককে ভয় পায়। আমি বলছি প্রকৃত  সাংবাদিক হলে পুলিশ তাকে সম্মান দেখায়,  ভয় পায় না। কিন্তু তোর মত চিহ্নিত ডাকাতকে সাংবাদিক মনে করে ভয় পাওযার মত ওসি হুমায়ুন কবির নয়।  এ টাকা দিলে ওর বিরুদ্ধে, আর ও টাকা দিলে এর বিরুদ্ধে যা খুশি তাই লিখে ‘ফেসবুক’ টাকেই কলঙ্কিত করেছিস।

 

আমার বদলীর অনুমান ১৫ দিন আগে ব্রীজের কাজের বিপুল পরিমান রড সহ এক চোর ধরা পড়ার খবর পেয়েই ঐ সাধু সাংবাদিক চলে আসে, তাকে ভাল লোক বলে ছাড়িয়ে নিতে, ইন্সপেক্টর তদন্তকে ৫০ হাজার টাকা দেয়ার প্রস্তাবও দেয়। কিন্তু কোন চোর বা ডাকাত কে দেয়ার নজির আমার ডিকসনারীতে নাই।  আমার জানানোর পর এক বাক্যের জবাব ছিল ৫০ লাখ হলেও আমি দিতে পারবো না।  মামলা নিয়ে চোরকে চালান দেয়া হলো, হতাশ হলেন ঐ দস্যু। ফিরে গেলেন ব্যর্থ মনোরথে। অতঃপর আমার বদলীর এক সপ্তাহের মধ্যে বহু চেষ্টার পর ধরা হলো  ৫৭ বছরের সাজাপ্রাপ্ত ও ২০ বছর সাজা খাটুয়া কুখ্যাত নিজাম ডাকাত কে। জেনে গেছি সে ওর সতীর্থ।  এক সময়  দু’জন একসাথেই রাতের কাজ-কর্ম করত। সতীর্থের প্রতি টানই থাকে অালাদা। ভোর না হতেই থানায় দৌড়ে হাপিয়ে জিজ্ঞাসিলেন। “রাতে ঘুমান নাই”? ক্লান্ত ছিলাম তাই মাথা ডান-বামে  করেই জবাব দিলাম। অাবার বলে, ওর তো কোন মামলা নাই, ওকে ধরছেন কেন?” আমি জবাব না দিয়ে ৩ টি ডাকাতি সহ ৪টি মামলার CDMS  শীট বাড়িয়ে দিলাম।  এ মামলায় ঐ মামলায় হাজির অাছে” ইত্যাদি।  আমার জিজ্ঞাসা–” তার বড় ভাইকে পা ভেঙ্গে যে দু’টুকরা করে একেবারেই পঙ্গু করে দিল, সে টা? দালালের উত্তর ছিল –ঐ টা জমিজমার বিরোধের কারনে হয়েছে?  তাই বলে কি ঐ লোক বিচার পাবেনা?  -একথা বলেই আমি অফিস ত্যাগ করি। দুপুর পর্যন্ত আমার অন্য অফিসার কে দিয়ে আমাকে পটানোর চেষ্টা করেও বিফলে যায়। এবার ক্ষুব্দ্ধ হলেন।

 

আমার বদলী হলো। প্রফুল্ল মনে লিখে যাচ্ছেন সতীর্থদের জন্য। থানায় পুলিশ খেটে মরছে। আর টাকা খাচ্ছে দালালেরা কিন্তু বদনামের পুরোটাই পুলিশের। সোনাগাজীর সাধারন মানুষকে দালালের খপ্পর হতে বাঁচানোর জন্য আমি ছোট, বড়, মেজো, সেজো কোন সারির দালালকেই শিকের ভেতরে পুড়েছি। আমার মনে হয়–বাকী ছিলি তুই।

 

আমি আশা করি আজ থেকে সোনাগাজীর সাধারন মানুষ তোকে অন্তত ভৎসর্না করবে তোর মুখে থু দিয়ে। মনে সোনাগাজীর এত মানুষ তোকে মাফ করবে না। মান সোনাগাজী থানায় অন্ততঃ পুলিশ তোকে কুকুরের মত করে তাড়াবে। সোনাগাজীর মানুষ অন্ততঃ এটুকু  বুঝল যুগ যুগ ধরে সোনাগাজীর মানুষের অশান্তির মূল কারন তোদের মত মানুষরুপী পশুর ছানারাই এবং অনুধাবন করতে পারলো- ডাকাত যদি  “ফেসবুক মার্কা” সাংবাদদিকও হয় তবু তার স্বভাব পরিবর্তন হতে মোটের উপর সময় লাগবে ২০০ বছরই।

লেখক – অফিসার ইনচার্জ, ফুলগাজী থানা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *