Main Menu

নারায়ণগঞ্জে সুষ্ঠু ভোটে আইভীর বিজয় ও প্রতিপক্ষের হতাশা!

চিররঞ্জন সরকার, বাংলার দর্পন ডটকম:

এখন চরম হতাশা নেমে এসেছে। শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ শেষে শান্তিপূর্ণভাবে ফলাফলও ঘোষণা করা হয়েছে। ফলাফলে বিএনপি প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খানের চেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী।

fb_img_1482427412172

আমরা আশা করেছিলাম এই নির্বাচনে বড় একটা ঝামেলা হবে। গুলি-বোমা ফুটবে। ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই, মারামারি কাটাকাটি হবে। শাসক দলের নামে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করা হবে। সেই সুযোগে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির প্রার্থী ‘প্রহসনের নির্বাচন’ বর্জনের ডাক দেবেন। দেশব্যাপী হরতাল হবে। আবার বোমা-গুলি-টিয়ারগ্যাসে মেতে উঠবে দেশ। প্রয়োজনে আবারও পেট্রোলবোমায় নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে মারা হবে।

বিজয়ের মাসে আমরা আবার একাত্তরের উত্তেজনা অনুভব করব। আমাদের শীতের দিনগুলো হবে উত্তেজনায় ঠাসা। টকশোজীবীরা আবার মেতে উঠবেন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও বাক্যরচনার শ্বাসরুদ্ধকর খেলায়। কিন্তু কিসের কী! সেসবের কিছুই হলো না। বরং ‘সাতখুনের শহর’, ‘ময়লা-আবর্জনার শহর’, ‘যানজটের শহর’, দূষণ-দখলে-ক্লিষ্ট শীতলক্ষ্যার শহর নারায়ণগঞ্জে সেই চেনা মুখ সেলিনা হায়াৎ আইভীই জিতে গেলেন!

এটা কোনো নির্বাচন হলো? একটা পটকাও কোথাও ফুটল না, কোথাও কোনো অনিয়ম ঘটল না, গোলাগুলি বোমা-ককটেল তো দূরের একটা চড়-থাপ্পর মারার কথাও শোনা গেল না! এমন একটা ম্যারমেরে, উত্তেজনাহীন, ফালতু নির্বাচনের জন্যই আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলাম? গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম?

ফাইল ফটো-বিএনপি-জামায়াতের হরতাল চিত্র

ভাগ্যিস নারায়ণগঞ্জের ‘মুকুটহীন নবাব’ শামীম ওসমান ছিলেন! তিনি যদি ব্যালটে সিল মেরে প্রকাশ্যে তা উঁচিয়ে না ধরতেন, সাংবাদিকরা তার ছবি না তুলতেন, কিছু ঔদ্ধত্যপূর্ণ বোল-চাল না ছাড়তেন, তাহলে আমাদের পুরো অপেক্ষাটাই মাটি হয়ে যেত! এজন্য শামীম ওসমানকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়! তিনি অন্তত কিছুটা উত্তেজনা এবং সমালোচনার বিষয় আমাদের উপহার দিয়েছেন!

সবচেয়ে নিন্দনীয় কাজ করেছেন নারায়ণগঞ্জের ভোটাররা। তারা একজন ‘ব্যর্থ’ মেয়রকেই পুনঃনির্বাচিত করেছেন! তারা কেন এমন ‘গবেটের’ মত কাজ করলেন তা বোধগম্য নয়! পৃথিবীর কত দেশে ‘নীরব বিপ্লব’ হয় ব্যালটের মাধ্যমে! আমরাও আশা করছিলাম নারায়ণগঞ্জে এবার তেমন নীরব ব্যালট-বিপ্লব হবে। সেলিনা হায়াৎ আইভী সেই বিপ্লবে ভেসে যাবে। ক্ষমতাসীনরা উচিত শিক্ষা পাবে! আমাদের সাধের বিএনপি প্রাণ ফিরে পাবে। কিন্তু না। তেমন কিছুই ঘটল না। সেই পুরনো মুখ আইভীকেই তারা বেছে নিলেন! যারা নিজেদের পরিবর্তন ও উন্নতি নিজেরা চায় না তাদের উন্নতি তো ঈশ্বরও করে দেবেন না! নারায়ণগঞ্জবাসীর আয়-উন্নতি যে কোনোদিনই হবে না-একথা হলফ করেই বলা যায়! এমন ‘আত্মঘাতী’ মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে সত্যিই চিন্তিত হতে হয়!

এমনিতেই আমরা অনেক দিন ধরে ভীষণ অস্বস্তি নিয়ে দিন কাটাচ্ছিলাম! এটা কোনো দেশ হলো? হরতাল নেই, অবরোধ নেই, মারামারি-কাটাকাটি নেই, পেট্রোল বোমা নেই, নৈরাজ্য, উদ্বেগ-আতঙ্ক নেই—এমন পরিস্থিতি কারও ভালো লাগে? না তাই লাগা উচিত?

আমাদের আর কী দোষ? আমরা তো আসলে অভ্যাসের দাস। ভালো জিনিসের না হলেও খারাপ জিনিসের তো বটেই। একই কাজ বার বার করলে, একই পরিস্থিতির মধ্যে দিনের পর দিন কাটালে সেটাই অভ্যাস হয়ে যায়, আমরা সেটাতেই অভ্যস্ত হয়ে যাই। আর অভ্যাস সহজে যায় না। আশির দশকের শেষে বাংলাদেশ টেলিভিশনে একটা নাটক দেখানো হয়েছিল। নাটকে দেখানো হয়েছিল, পালিয়ে বিয়ে করা এক অস্বচ্ছল দম্পতি কম টাকায় ট্যানারির কাছে ঘর ভাড়া নেয়। যেখানে গলির দোকানে টেপ-রেকর্ডারে সারাক্ষণ রুনা লায়লার গাওয়া ‘বন্ধু তিনদিন তোর বাড়িত্ গেলাম দেখা পাইলাম না’ জাতীয় গান বাজতে থাকে। আর নাকে বিদ্ধ হয় ট্যানারির উৎকট গন্ধ। এভাবে চরম অস্বস্তি আর বিরক্তি নিয়ে ওই দম্পতি দিনাতিপাত করতে থাকে। তাদের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হলে এক সময় তারা অন্যত্র বাসা নেয়। কিন্তু এই নতুন বাসায় কিছুতেই তাদের ভালো লাগে না। ঘুমও আসে না। অবশেষে রেকর্ডারে ‘বন্ধু তিনদিন তোর বাড়িত্ গেলাম দেখা পাইলাম না’ গান বাজিয়ে, সিথানে চামড়ার ব্যাগ রেখে তার গন্ধ নাকে নিয়ে তারা স্বস্তির ঘুম দেয়!

অভ্যাস আসলে খুব মারাত্মক। সহজে যেতে চায় না। আমাদের এলাকায় একবার এক অবাক ফেরিওয়ালাকে দেখেছিলাম। তিনি ‘ঘি আছে, খাঁটি গাওয়া ঘি আছে’ বলে হাঁক দিচ্ছিলেন। এক ভদ্রমহিলা তাকে ঘিয়ের কেজি কত জিজ্ঞেস করার পর আমরা তাজ্জব হবার মত কথা শুনেছিলাম।

ফেরিওয়ালা একগাল হেসে বলছিলেন, আপা ঘি নাই, আমি আসলে বাদাম আর কটকটি বেচি! ভদ্রমহিলার বিস্ময় মাখানো জিজ্ঞাসা— তাহলে ঘি ঘি বলে চিৎকার করছিলে কেন?

কাচুমাচু হয়ে ফেরিওয়ালা উত্তর দেয়—আসলে আপা আমি প্রায় ১০ বচ্ছর ধইরা ঘি বেচছি। কিন্তু ব্যবসায় মাইর খাইয়া এখন কম পুঁজির কারবার বাদাম আর কটকটি বেচোন শুরু করছি। কিন্তু ঘি বইল্যা চিৎকার পারনের আগের অভ্যাসটা রইয়াই গেছে!

বিএনপি দীর্ঘদিন হরতাল-অবরোধ-পেট্রোল বোমা, জ্বালাও-পোড়াও- নৈরাজ্য ইত্যাদির চর্চা করায় ওগুলো আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এগুলো ছাড়া আমাদের অনেকেরই তেমন ভালো লাগে না, স্বস্তিও পাই না। কেবলই মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগছিল, এগুলো বিএনপি আমাদের আবার কবে ফিরিয়ে দেবে? কবে? নারায়ণগঞ্জের নির্বাচন নিয়ে আমরা আশাবাদী হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু সেই আশার গুড়েও বালি পড়ল!

ভোট বা নির্বাচনের একটা আলাদা জাদু আছে। কৃষ্ণের বাঁশির সুর শুনলে রাধা যেমন অস্থির এবং ব্যাকুল হয়ে পড়তো, ভোটের বাঁশি বাজলে বাঙালির চিত্তও চঞ্চল হয়ে উঠে। পুরো মাতোয়ারা হয়ে যায়। সেটা স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি নির্বাচন হোক, ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হোক, আর সিটি করপোরেশন বা জাতীয় নির্বাচন হোক। ভোট মানেই বাঙালির উত্তেজনা, উৎসব, আচ্ছন্ন মনোভাব। ভোটের সময় অন্য কোনো বিষয়ে অন্য কোনো দিকে মন দেয়ার কারো টাইম নেই। এটা অবশ্য খুব ভালো। কেননা, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রাণ-ভোমরাই হচ্ছে ভোট বা নির্বাচন।

গণতন্ত্রে ক্ষমতা পরিবর্তন বা নিজের পছন্দের ব্যক্তির মাথায় মুকুট পড়াতে কিংবা অপছন্দের ব্যক্তিকে প্রত্যাখান বা জব্দ করতে নির্বাচন বা ভোটই হচ্ছে একমাত্র লাগসই অস্ত্র। এর কোনো বিকল্প নেই। কোনো সর্টকাটও নেই। যদিও আমাদের ‘ভোটারবিহীন নির্বাচনের’ও একটা অভিনব ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচয় আছে! সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। যারা নির্বাচনের গুরুত্ব বোঝে না, তারাই হরতাল-অবরোধ-পেট্রোল বোমা, বর্জন-বয়কট দিয়ে ক্ষমতা পরিবর্তন করতে চায়। এটা অনেকটা বল্লম দিয়ে কান চুলকানোর মতো। ওতে কোনো লাভ তো হয়ই না, উল্টো অনেক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। এজন্যই সম্ভবত নির্বাচন নিয়ে মানুষের এত মাতামাতি, এত বাড়াবাড়ি।

কিন্তু তাই বলে এমন নির্বাচন? এতো যেন কবরের শান্তি! নির্বাচন কমিশন, সরকার, ক্ষমতাসীন জোট, নারায়ণগঞ্জের জনসাধারণ সবাই মিলে দেশের অগণিত উত্তেজনাপ্রত্যাশীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন! সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন বিএনপি নেতৃত্ব! আপনারা কেন আগে ভাগেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে হরতাল-অবরোধের ডাক দিলেন না? ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’র কথা বলে কী আর দেশবাসীকে উত্তেজিত করা যায়?

সব যদি ‘ভালোয় ভালোয়’ শেষ হয়, তাহলে আমরা কী নিয়ে মেতে থাকব? আর এত ‘শান্তি-স্বস্তি’ নিয়ে আমরা করবটাই কী?






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *