প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিখোঁজ সাংবাদিক উৎপলের মা- বাবার আকুতি

 

নিজস্ব প্রতিবেদক :

ছেলের সন্ধান চেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আকুতি জানিয়েছেন নিখোঁজ সাংবাদিক উৎপল দাসের বাবা চিত্তরঞ্জন দাস। বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ আকুতি জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পরিবারের সদস্যদের কান্না দেখে সহকর্মীরাও কান্না ধরে রাখতে পারেননি।

অনলাইন নিউজ পোর্টাল পূর্বপশ্চিমবিডি.নিউজের সিনিয়র রিপোর্টার উৎপল গত ১০ অক্টোবর মতিঝিলের অফিস থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়েন পূর্বপশ্চিম বিডি ডট নিউজের প্রধান সম্পাদক পীর হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা সবাই এখানে উদ্বেগ, উৎকন্ঠা ও ব্যথিতচিত্তে উপস্থিত হয়েছি। আমাদের সঙ্গে নিখোঁজ সংবাদকর্মী উৎপল দাসের অসহায় পিতা চিত্তরঞ্জন দাস ও তার পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত রয়েছেন। আমরা গণমাধ্যম পরিবারকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি, আমাদের পূর্বপশ্চিম নিউজ পোর্টালের মেধাবী ও পরিশ্রমী সিনিয়র রিপোর্টার উৎপল দাসের সন্ধান পেতে সবাই আন্তরিকভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন।

পীর হাবিবুর রহমান বলেন, আপনারা অবগত আছেন, গত ১০ অক্টোবর মঙ্গলবার অফিস থেকে বের হওয়ার পর উৎপল আর কর্মস্থলে আসেনি। একটু খেয়ালি, ভাবুক স্বভাবের উৎপল পরবর্তীতে অফিসে না আসায় আমরা প্রথমে মনে করেছিলাম হয়তো কোথাও বেড়াতে গেছে। অফিসকে না জানিয়ে মাঝেমধ্যে অনুপস্থিত থাকতো উৎপল। কিন্তু একপর্যায়ে তার ঠিকানায় চিঠি ও লোক পাঠিয়েও সন্ধান না পেয়ে আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। উৎপলের মোবাইল টানা বন্ধ, বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকায় আমাদের উৎকন্ঠাই শুধু বাড়েনি, বিচলিত হয়ে পড়ি। আমরা ২২ অক্টোবর বিকেলে নিখোঁজ উৎপলকে নিয়ে মতিঝিল থানায় জিডি করি। পরদিন নরসিংদীর রায়পুরার গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় ছুটে এসে উৎপলের উদ্বিগ্ন পিতা মতিঝিল থানায় আরেকটি জিডি করেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) নেতারা বিবৃতিই দেননি, তৎপর হয়ে ওঠেন। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে নিখোঁজ উৎপলের সংবাদ জানানো হয়েছে। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশে ফিরলে কথা বলবেন। র্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ ও ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়ার সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করলে তারাও আন্তরিকভাবে সাড়া দেন।

সিনিয়র এই সাংবাদিক আরো বলেন, ১৬ দিনেও প্রাণবন্ত, প্রাণচঞ্চল রিপোর্টার উৎপল দাস আমাদের মাঝে ফিরে আসেনি। যা শুধু উদ্বেগের বিষয় নয়; তার স্নেহশীল বাবা-মায়ের জন্য ঘুম হারাম করা ভয়ের বিষয়। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এতোদিন ধরে আমাদের সন্তানতুল্য সহজ-সরল উৎপল দাস কোথায়, কেমন আছে? কী ঘটেছে তার জীবনে, কেন তার সন্ধান মিলছে না, আমরা বুঝতে পারছি না।

আমাদের সবার দাবি একটাই, আমরা আমাদের উৎপলকে সুস্থ অবস্থায় ফেরত চাই। আপনাদের মাধ্যমে মিডিয়াবান্ধব প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কাছে আকুল আবেদন, আপনি উদ্যোগ নিন। উৎপল ফিরে আসুক মায়ের কোলে, ফিরে আসুক আমাদের মাঝে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তাদের প্রতি এমনকি দেশবাসীর কাছে আমাদের আবেদন যার যার জায়গা থেকে উৎপলকে ফিরিয়ে আনতে, তার সন্ধানে তৎপর হোন। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে আজ একজন তরতাজা তরুণ সংবাদকর্মী এভাবে দিনদুপুরে নিখোঁজ হয়ে হারিয়ে যেতে পারেন না।

সংবাদ সম্মেলনে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক উৎপলের বাবা বলেন, আমার ছেলে খুজে পাচ্ছিনা। চিত্তরঞ্জন দাস বলেন, আমি অতি সাধারণ মানুষ। শিক্ষকতা করে জীবন চালিয়েছি। আমাদের কোনো শত্রু নেই। রাষ্ট্র ও সমাজের নানা জটিলতা আমরা বুঝি না। আমরা আমাদের সন্তানকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে পেতে চাই।

সেসময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন সাংবাদিক উৎপলের বোন ববিতা রানী দাস ও বিনীতা রানী দাস। তাদের ভাষ্য, তাদের ভাই প্রতিদিন একবার হলেও ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, দিদি কেমন আছিস।

‘আজ কতদিন হল-আমার সোনা ভাইটা আমাকে কল দেয় না। আমরা কী এমন ক্ষতি করেছি! উৎপলের জন্য আমার মা কিছু খায় না। কারো সাথে কথা বলে না। জানি না এই মুহূর্তে আমার মা কী করছে। আমার কিছু চাই না, আমার ভাইটারে চাই,’ বলতে বলতে আরো একবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন ববিতা রানী দাস।

এ সময় ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শাবান মাহমুদ বলেন, আমরা নবম ওয়েজ বোর্ডের দাবিতে যে আন্দোলন করছি, সে আন্দোলনের এজেন্ডায় উৎপল দাসের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টাকে অন্তর্ভুক্ত করেছি। উৎপলকে যত দিন আমরা ফিরে না পাব, তত দিন মানববন্ধন, বিক্ষোভসহ নানা কর্মসূচি পালন করব।

উৎপলের পরিবারের সঙ্গে আজ র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ দেখা করবেন বলে জানান শাবান মাহমুদ। এ ছাড়া ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার সঙ্গে পীর হাবিবেব কথা হয়েছে জানিয়ে এই সাংবাদিক নেতা বলেন, তিনি (পুলিশ কমিশনার) পুরো বিষয়টি নিয়ে অবগত আছেন। তিনি আন্তরিকভাবে দেখছেন বলে জানিয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পূর্বপশ্চিমবিডি.নিউজের প্রধান সম্পাদক পীর হাবিবুর রহমান, সম্পাদক খুজিস্তা নূর-ই-নাহারিন (মুন্নি), ঢাকা সাংবাবিদক ইউনিয়নের সভাপতি শাবান মাহমুদ, সাধারণ সম্পাদক সোহেল আজাদ চৌধুরী, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বাদশা, সাধারণ সম্পাদক মোরসালিন নোমানী প্রমুখ।

নিখোঁজ সাংবাদিক উৎপলের পরিবারের পক্ষ থেকে আয়োজন করা ওই সংবাদ সম্মেলনে এক হৃদয় বিদরাক দৃশ্যের অবতরণা হয়। সংবাদ সম্মেলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে আসা সংবাদ কর্মীরাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।

ভাইয়ের সন্ধান চেয়ে উৎপলের বোন বিনীতা বলেন, আমি শুধু ভাইকে ফিরে পেতে চাই। আর কিছু চাইনা। উৎপল কে খুজে দিন। সংবাদিক উৎপলের নিখোঁজের ঘটনায় অনলাইন নিউজ পোর্টালটির পক্ষ থেকে সম্প্রতি মতিঝিল থানায় জিডি করা হয়। উৎপলের বাবাও একই থানায় আরেকটি জিডি করেন।

উৎপল ফকিরাপুল এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। তার গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরার রাধানগরে। সেই থেকে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ ছিল। তবে গত সোমবার সন্ধ্যা ৭টা ২২ মিনিটে তার মোবাইল নম্বর থেকে কল আসে বাবা চিত্তরঞ্জনের কাছে। প্রায় ৮ মিনিট কথা বলার পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় মুক্তিপন দাবি করা ব্যক্তি। এরপর থেকে ফোনটি বন্ধ রয়েছে।

এর মধ্যে গত সোমবার উৎপলের মোবাইল নম্বর নকল করে স্পুফিং কল করে পরিবারের কাছে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, উৎপল তাদের কাছে আটক আছে। এক লাখ টাকা দিলে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হবে। চিত্তরঞ্জন দাস এ তথ্য জানিয়ে বলেছেন, নিখোঁজের পর থেকেই তাঁর ছেলের ফোন বন্ধ ছিল। সোমবার হঠাৎ ওই নম্বর থেকে কল করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, সর্বশেষ ধানমণ্ডি এলাকায় উৎপলের মোবাইল সচল ছিল।

সাংবাদিক উৎপল দাসের নিখোঁজের ঘটনায় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বুধবার বলেছেন, সরকার এ বিষয়ে অবগত আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশে ফিরলে সাংবাদিক উৎপলের বিষয়ে তার সাথে কথা বলবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *