এক সড়কের ইট তুলে অন্য সড়কে বসালেন চেয়ারম্যান

 

যশোর | ২৫ অক্টোবর ২০১৭।

যশোরের মনিরামপুর উপজেলায় ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এক গ্রামীণ সড়কের ইট তুলে নিয়ে অন্য একটি সড়ক নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। আগের সড়কটিতে ওই ইট ছিল ৪০০ ফুটজুড়ে। সেই ইট এনে ১৩৬ ফুট রাস্তা বানানো হয়েছে।

বিষয়টি স্বীকার করেছেন উপজেলার কাশিমনগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জি এম আহাদ আলী। তিনি  বলেন, ইউনিয়নের লেবুগাতী গ্রামের ওই রাস্তা পাকাকরণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। সে জন্যই রাস্তার ৪০০ ফুটের সাড়ে ৯ হাজার ইট তুলে নিয়ে পাশের গোয়ালপাড়া গ্রামের একটি রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার বলেছেন, পাকাকরণের দরপত্র হয়েছে অন্য জায়গায়। আর গোয়ালপাড়া গ্রামের বাসিন্দারা বলেছেন, তাঁদের গ্রামে সড়কে যে জায়গায় ইট বিছানো হয়েছে, তা এলাকাবাসীর কোনো কাজে আসবে না।

সরেজমিনে দেখা যায়, লেবুগাতী গ্রামের মোড় পর্যন্ত পাকা সড়ক রয়েছে। সেখান থেকে একটি রাস্তা গ্রামের ভেতর দিয়ে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে। কিছু দূর এগিয়ে সড়কটি পূর্বমুখী হয়েছে। এরপর আবার দক্ষিণমুখী হয়ে সড়কটি গোয়ালপাড়া গ্রামের মধ্য দিয়ে কালারহাট মোড় গিয়ে মিশেছে। সড়কটি যেখানে পূর্বমুখী হয়েছে তার পাশে রয়েছে লেবুগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। লেবুগাতী মোড় থেকে ওই বিদ্যালয়ের কাছাকাছি পর্যন্ত ৪০০ ফুট ইটের রাস্তা ছিল। এ রাস্তা থেকে সদ্য ইট তুলে নেওয়ার চিহ্ন রয়েছে। সড়কটির মাঝে মাঝে জমে আছে সামান্য কাদা। পাশের গোয়ালপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ভাঙাচোরা ইট দিয়ে রাস্তা সদ্য নির্মাণ করা হয়েছে। সড়কের দুই পাশে ভাঙা ইটের কয়েকটি স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা যায়।

দুই গ্রামের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লেবুগাতী মোড় থেকে লেবুগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়মুখী সড়কটিতে বর্ষাকালে খুব কাদা হতো। তা মাড়িয়ে শিশুদের বিদ্যালয়ে যেতে কষ্ট হতো। গ্রামের বাসিন্দাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিন বছর আগে উপজেলা প্রশাসন সড়কটির ৪০০ ফুটে ইট বসায়। গত ২৬ সেপ্টেম্বর সকালে হঠাৎ চেয়ারম্যান লেবুগাতী মোড়ে এসে কাউকে কিছু না বলে শ্রমিক দিয়ে ওই ইট তোলা শুরু করেন। তখন দুর্গাপূজা চলছিল। গ্রামের লোকজন চেয়ারম্যানকে অন্তত পূজা ও চলতি বর্ষা শেষে ইট তুলতে অনুরোধ করেন। কিন্তু চেয়ারম্যান কারও কথা শোনেননি।

লেবুগাতী গ্রামের পার্থ অধিকারী বলেন, পূজার মধ্যেই চেয়ারম্যান রাস্তার ইট তুলে নিয়ে গেছেন। পরে বৃষ্টিতে ওই রাস্তায় কাদা হয়ে গেছে।

ওদিকে এই রাস্তা থেকে তুলে নেওয়া ইট তখন গোয়ালপাড়া গ্রামে নিয়ে গিয়ে স্তূপ করে রাখা হয়। লেবুগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এ গ্রামটি প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ওই ইট ৭ ও ৮ অক্টোবর গ্রামের রাস্তাটির ১৩৬ ফুটে বসানো হয়।

গোয়ালপাড়া গ্রামের বাসিন্দা তসলিম উদ্দীন বলেন, ভাঙাচোরা ইট দিয়ে গ্রামে অল্প একটু রাস্তা করা হয়েছে। এ রাস্তা মোটেও টিকবে না।

লেবুগাতী ও গোয়ালপাড়া দুটি গ্রামই কাশিমনগর ইউপির ৩ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। স্থানীয় ইউপি সদস্য ও গোয়ালপাড়ার বাসিন্দা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘দুটি গ্রামই আমার ওয়ার্ডের মধ্যে। অথচ আমাকে কিছু জানানো হয়নি। অন্য একজন ইউপি সদস্যকে নিয়ে চেয়ারম্যান সাহেব ওই কাজ করেছেন।’

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) মনিরামপুর কার্যালয় সূত্র জানায়, কাশিমনগর ইউনিয়নের কালারহাট-লেবুগাতী সড়কের একাংশ পাকাকরণের একটি প্রকল্প তারা নিয়েছে। তবে এই কাজ শুরু হবে কালারহাট মোড় থেকে। আর প্রথম ধাপে পাকা করা হবে মাত্র ৭০০ মিটার রাস্তা। অর্থাৎ লেবুগাতী গ্রাম দূরের কথা, সেটি গোয়ালপাড়া গ্রাম পর্যন্তও পৌঁছাবে না। রাস্তার ওই অংশটি পাকাকরণের জন্য ইতিমধ্যে দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নিযুক্ত করা হয়েছে।

কাজ পাওয়া ঠিকাদার বিশ্বজিৎ দাস বলেন, ‘আমার জানামতে ইউপি চেয়ারম্যান সড়কের যে অংশ থেকে ইট তুলেছেন, সেই অংশের দরপত্র এখনো আহ্বান করা হয়নি।’

এলজিইডির মনিরামপুর কার্যালয়ের প্রকৌশলী আবু সুফিয়ান বলেন, ‘আমি এখানে যোগদান করেছি নয়-দশ মাস আগে। সড়কটির জরিপ করা হয়েছে তারও আগে। সড়কটি থেকে ইট উঠিয়ে নেওয়ার বিষয়টি আমি শুনেছি। বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখব।’ তিনি আরও বলেন, জরিপের সময় রাস্তায় ইট থাকলে তা ‘স্যালভেজ’ হিসেবে ধরার কথা। অর্থাৎ যে পরিমাণ ইট আছে, তার দাম ধরে ঠিকাদারের বিল থেকে কেটে নেওয়া হয়। ঠিকাদার সেই ইট রাস্তা নির্মাণের কাজে ব্যবহার করবেন। ইউপি চেয়ারম্যান কোনো অনিয়ম করলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *