চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কর ব্যবস্থা ও ভাড়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে

 

 

চট্রগ্রাম ব্যুারো -চট্টগ্রাম মহানগরের ভাড়াটিয়াদের অধিকার সুরক্ষায় অদ্য ২৪ অক্টোবর ২০১৭ইং সকালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে কাউন্সিল অব ভোক্তা অধিকার বাংলাদেশ (সিআরবি)’র উদ্যোগে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ভোক্তা অধিকার বাংলাদেশ (সিআরবি)’র মহাসচিব নক্শাবিদ কেজিএম সবুজ। ভোক্তা অধিকার এক্টিভিস্ট নোমান উল্লাহ বাহার’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও পরিবেশবিদ অধ্যাপক ইদ্রিচ আলী, দক্ষিণ পশ্চিম বাকলিয়া সমাজ কল্যাণ পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোঃ ফেরদৌস আলী, সমাজসেবী মোঃ সোহরাব জব্বার চৌধুরী, সমাজকর্মী শফিকুল ইসলাম রাহী, সেহের অটিজম সেন্টারের সম্পাদক তাবাসসুম জেরীন, ভোক্তা অধিকার পত্রিকার ব্যবস্থাপক মোঃ শাহাদাত হোসেন স্বপন, ইকো ফ্রেন্ডস’র সাংগঠনিক সম্পাদক কাইয়ুমুর রশিদ বাবু, ছাত্রনেতা বোরহান উদ্দিন গিফারী, সিআরবি’র শাখা সমন্বয়ক মোহাম্মদ আলী ও হাজী আলী আকবর প্রমুখ।

লিখিত বক্তব্যে কেজিএম সবুজ বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরের প্রায় সকল ভবন মালিকেরা ভাড়া আদায় ও বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যে রকম উদ্যোগী কর প্রদানের ক্ষেত্রে তাঁদের সে রকম উদ্যম নেই। তাই বিগত ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরের গৃহকর আদায়ের পরিমান ২৯.৭৬%। সম্প্রতি বর্ধিত কর বিষয়ে ভবন মালিকরা আইনের পাশাপাশি মানবিকতার বিষটিকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবী তুলেছেন। ভবন মালিকদের এই দাবী আমরা সমর্থন করি। কিন্তু বিগত আট বছরে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কোন কর বৃদ্ধি করেনি। তারপরও ভবন মালিকরা বাসাভাড়া বৃদ্ধি থেকে বিরত ছিলেন না। মানুষের আয় যা বেড়েছে তার চেয়ে অনেক বেশী হারে বাসাভাড়া তাঁরা বৃদ্ধি করেছেন চরম অমানবিক ভাবে।

 

নগরের ভাড়াটিয়াদের বিগত ৮ বছরে অন্তত ৮বার বর্ধিত মূল্যে ভাড়া পরিশোধ করতে হয়েছে। বাড়ির মালিকরা বাড়ি ভাড়া আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের ভাড়া বৃদ্ধির তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার উপর বিনা রসিদে বিশাল অঙ্কের অগ্রিমও নিচ্ছেন ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে। বাড়ি ভাড়ার কোন রসিদও দেয়া হয়না, চুক্তিপত্রও করেন না। অনেক এলাকায় বছরে দুই/তিন বার বাসা ভাড়া বৃদ্ধির ঘটনাও বিরাজমান। অনেক ভাড়াটিয়াকে খাবার কেনার অর্থ দিয়ে বাসাভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে। কিন্তু এই বিষয়ে সরকারের কোন দপ্তরেরই গ্রহণযোগ্য তদারকি নেই। প্রতিনিয়ত বাসাভাড়া বৃদ্ধিতে ভাড়াটিয়ারা হচ্ছেন নিঃস্ব এবং সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। ভাড়াটিয়াদের কর্মমুখরতায় নগরের বিকাশ ঘটে। নগর জীবনে ভাড়টিয়াদের অধিকার ভুলণ্ঠিত হচ্ছে বাড়িভাড়া নামক অস্বচ্ছ খাতটির কারণে।বাসাভাড়া বৃদ্ধির এই অনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে বেশীর ভাগ মানুষই সৎ উপার্জিত অর্থ দিয়ে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছেন। তাই বাসস্থানের মত মৌলিক চাহিদা নির্বাহে বাধ্য হয়ে অনেকে অসৎ পথে ধাবিত হচ্ছেন এবং এতে দিন দিন সামাজিক বিপর্যয়ের আশংকা বাড়ছে।

 

তাই ভবন মালিক, সিটি কর্পোরেশন তথা সরকারসহ সকল পক্ষের মাঝে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে স্বচ্ছ কর ব্যবস্থা ও বাড়ি ভাড়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে ভাড়াটিয়াদের অধিকার সুরক্ষার দাবী জানাচ্ছি। চসিকের দুইজন সাবেক মেয়র যাঁরা মেয়র পদে থাকাকালীন সময়ে তাঁদের একজনের গৃহকর আদায়ের সফলতা ১৯.৪১% অন্যজনের ২৮.০৪%। বর্তমান মেয়রের আমলেও কর আদায়ের পরিমান ২৯.৭৬%। রাজস্ব আদায়ের পরিমান যদি এত কম হয় তাহলে কি করে নগরবাসীর নাগরিক সেবা নিশ্চিত হবে? তবে বর্ধিত কর প্রদানের ক্ষেত্রে ভবন মালিকদের অনড় অবস্থান এবং চসিকের বর্তমান অবস্থানে ভাড়াটিয়াদের অধিকার বিপন্ন হবে।

অধ্যাপক ইদ্রিচ আলী বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও ভবন মালিকদের কর আদান-প্রদান, বাসাভাড়া চুক্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে ভাড়াটিয়া অধিকার সুরক্ষিত হবে।

সংবাদ সম্মেলনে ভাড়াটিয়াদের অধিকার সুরক্ষায় ৫দফা দাবী উত্থাপন করা হয়। (১) চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত বর্তমানে ১,৮৫,২৪৮টি হোল্ডিং-এর কর আদায় ও বাসা ভাড়ার তথ্য স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহীতার স্বার্থে কর্পোরেশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। ভবন মালিকরা যদি মিথ্যা বাসা ভাড়ার তথ্য সিটি কর্পোরেশনকে দেন সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভাড়াটিয়াকে আপিল করার সুযোগ দিতে হবে। (২) সিটি করর্পোরেশনের কর আদায় কমিটিতে ভবন মালিক, ভাড়াটিয়া ও ভাড়াটিয়া অধিকার নিয়ে কর্মরত সংগঠনের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে মাসিক সভার ব্যবস্থা করতে হবে। (৩) ভবন মালিকদের আপিলের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার জন্য আপিলের আবেদন বিজ্ঞপ্তি আকারে স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশের উদ্যোগ নিতে হবে। পত্রিকায় প্রকাশের ১৫দিন পরে শুনানীর ব্যবস্থা করতে হবে। এতে বিষয়টি সাধারণ ভাড়াটিয়ার নজরে আসবে এবং তথ্য মিথ্যা হলে কর্পোরেশনে আপত্তি আসবে। এতে করে ১৫,০০০/- টাকার ভাড়া ঘর ৮,০০০/- এ্যাস্সেমেন্ট করিয়ে আবার আপিল করে কর কমানোর হীন চক্রান্ত বন্ধ হয়ে যাবে। (৪) বাসাবাড়া বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ভবন মালিকেরা বাসা ভাড়ার চুক্তি করছে কিনা, রসিদ প্রদান করছে কিনা, বাসা সংস্কার ও পানি সরবরাহ সহ অন্যান্য পরিষেবা ঠিক মতো প্রদান করছেন কিনা তা তদারকির ব্যবস্থা চালু করতে হবে। (৫) সিটি কর্পোরেশনের যে সকল কর্মকর্তা ভুল এ্যসেসমেন্ট করে কর ব্যবস্থাকে প্রশ্নববিদ্ধ করেছেন এবং ভবন মালিকদের সংক্ষুব্ধ করার পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন সেই সকল কর কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব বিবরণী প্রকাশসহ তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

ভাড়াটিয়াদের আশঙ্কা, বিগত বছরের মতো ভবন মালিকের কাছ থেকে চসিক কর্তৃক গৃহকর ২৯-৩০% আদায় অর্জিত হলেও বর্ধিত করের দোহাই দিয়ে বাড়তি বাড়ি-ভাড়া আদায় করবেন ১০০% ভবন মালিকরা। এতে ভাড়াটিয়ারা নতুন ভাবে শোষণের শিকার হবেন। ইতিমধ্যে ভাড়াবৃদ্ধির এমন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। কর আদান-প্রদান ও বাসাভাড়ার ক্ষেত্রে দ্বৈত প্রতারণার অবসান ঘটিয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, ভবন মালিক ও ভাড়াটিয়াসহ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার আহবান জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *