খুলনা প্রতিনিধি :
আনোয়ারার মোজাহের লেখাপড়া তেমন করেননি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থাকেন নগরীর সুগন্ধা আবাসিক এলাকার নিজস্ব ভবনে। মোজাহেরের দুই ছেলে, দুই মেয়ে। এক ছেলে অস্ট্রেলিয়ায়, আরেক ছেলে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করা এক মেয়েকে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর কাছে বিয়ে দিয়েছেন। আরেক মেয়ে নগরীর একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে পাশ করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ছেন।
সুগন্ধা আবাসিক এলাকার মসজিদে পঞ্চাশোর্ধ মোজাহেরের যাতায়াত ছিল নিয়মিত। আবাসিক এলাকার লোকজন জানতেন মোজাহের পিঁয়াজ-মরিচের পাইকারি ব্যবসা করেন।
গত রবিবার ভোরে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হবার পর জানা যায় মোজাহেরের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ একটি সিন্ডিকেট সাগরপথে ইয়াবা পাচারে জড়িত। সিন্ডিকেটের অন্য সদস্য হলেন একই গ্রামের জলিল প্রকাশ লবণ জলিল। মাছ ধরার ট্রলারে মূলত তারা ইয়াবা ব্যবসা করছে। মোজাহেরের আটটি ও জলিলের দশটি নিজস্ব ট্রলার রয়েছে। এসব ট্রলার মূলত ইয়াবা পাচারের কাজে ব্যবহৃত হতো। ৩০ বছর ধরে ইয়াবার ব্যবসা করলেও এ প্রথম র্যাবের হাতে ধরা পড়েছেন মোজাহের। তবে জলিল পলাতক রয়েছেন। ইয়াবার চালান নিয়ে আটক ‘এফবি মোহছেন আউলিয়া’ ট্রলারের মালিক ইয়াবা ব্যবসায়ী জলিল। ইয়াবা পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে মোজাহেরের এক ভায়রাকেও খুঁজছে।
র্যাব-৭ অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমদ জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মোজাহের জানিয়েছেন তার সিন্ডিকেটের অন্য দুই সদস্য রায়পুরের জলিল ও আবদুর নুর মিলে গত চারমাসে আনোয়ারা উপকূলে ৭৬ লাখ ইয়াবা খালাস করেছে। এর মধ্যে গত ডিসেম্বরে ১৬ লাখ, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ২০ লাখ, ফেব্রুয়ারি মাসে ২০ লাখ, মার্চ মাসে ২০ লাখ ইয়াবা খালাস করে। পঞ্চমবারে আরো ২০ লাখ ইয়াবা খালাস করতে গিয়ে ধরা পড়ে মোজাহের।
মোজাহেরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী মিয়ানমারের নাগরিক শুক্কুর, লালমিয়া ও মগ ওরফে সেন্সু তাদের কাছে ইয়াবার চালান পাঠায়।
গত ৭ এপ্রিল রাত দশটায় মগ ওরফে সেন্সু ও মোজাহেরের ম্যানেজার টেকনাফের বাসিন্দা মকতুল হোসেন ট্রলারে বাজার, বরফ ও তেল নিয়ে রাত দশটায় নগরীর ফিশারীঘাট রওনা দেয়। কর্ণফুলী নদী হয়ে কুতুবদিয়া, কক্সবাজার, টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ, সেন্টমার্টিনস, ছেঁড়াদ্বীপ হয়ে মিয়ানমারের পচাখালি এলাকায় পৌঁছায়। সেখানে আগে থেকে অবস্থানরত মিয়ানমারের একটি তেলের জাহাজ থেকে এসব ইয়াবা ট্রলারে তোলা হয়েছে। তবে সেন্সু মিয়ানমারের সেই তেলের জাহাজে রয়ে যায়।
ইয়াবাভর্তি ট্রলার নিয়ে মকতুল ছেঁড়াদ্বীপের পশ্চিম দিক থেকে বাইরের দিক দিয়ে হাতিয়া দ্বীপের কাছে মোক্তারিয়া এলাকায় পৌঁছে। পরবর্তীতে কাটালিয়া হয়ে আনোয়ারার গহিরা আসার পথে গভীর সমুদ্র এলাকা থেকে ইয়াবাসহ ট্রলারটি আটক করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় ট্রলারে থাকা মোজাহেরের ম্যানেজার মকতুলসহ আট মাঝিমাল্লাকে। তাদের দেয়া তথ্যমতে সুগন্ধার আবাসিক এলাকার বাসা থেকে মোজাহেরকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
গ্রেপ্তার নয়জন : গতকাল রবিবার বিকেলে পতেঙ্গায় র্যাব-৭ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়। এসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আনোয়ার লতিফ খান, র্যাব-৭ অধিনায়ক লেফটেনেন্ট কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমদ ও র্যাবের গণমাধ্যম শাখার প্রধান কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান উপস্থিত ছিলেন। মোজাহের ছাড়া গ্রেপ্তারকৃত অন্যরা হলেন মোজাহেরের ম্যানেজার টেকনাফের মকতুল হোসেন, আনোয়ারা রায়পুরের মো. নুর, হেলাল, আবদুল খালেদ, লোকমান, আনোয়ারার দোভাষী বাজারের জানে আলম, নোয়াখালির এনায়েত উল্লাহ ও আনোয়ারার দক্ষিণ সারেংগা গ্রামের নুরুল মোস্তফা।