জেমস আব্দুর রহিম রানা: ঘূর্ণিঝড় আম্পান আঘাত হানার শুরুতেই খুলনার বিভিন্ন এলাকার বেড়িবাঁধ উপচে পানি ঢুকতে শুরু করেছে লোকালয়ে। উপকূলের মানুষ প্রাণপণে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জেলার কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপের মানুষ সব থেকে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মানুষ প্রাণপণে ছুটছে আশ্রয় কেন্দ্রের দিকে। ইতোমধ্যে লক্ষাধিক মানুষ খুলনার প্রায় সাড়ে ৮শ’ আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে দুইদিন আগে থেকেই খুলনাঞ্চলের নদ-নদীতে জোয়ারে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।
মোংলার পশুর নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে ৫/৬ ফুট পানির উচ্চতা বেড়েছে। মঙ্গলবার রাত থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
বুধবার সকাল থেকে ঝড়ো বাতাস বইতে শুরু করে। এ কারণে উপকূলের উপজেলা
কয়রা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা ও পাইকগাছায় জনমনে আতঙ্ক বেড়ে যায়। এছাড়া বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চলের মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে বেড়ি বাঁধ এলাকার মানুষ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড খুলনা ২’এর নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি বলেন, মঙ্গলবার থেকেই খুলনার নদ-নদীতে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিপদসীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হচ্ছে পানি। বুধবার দাকোপের পশুর নদীতে পানির উচ্চতা ছিল ২ দশমিক ৭৭ মিটার। এ নদীতে পানির স্বাভাবিক মাত্রা ২ দশমিক ২২ মিটার। তিনি বলেন, খুলনার মধ্যে সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হচ্ছে কয়রা উপজেলা। ইতোমধ্যে এ উপজেলায় বেড়ি বাঁধ উপচে পানি প্রবেশ করেছে লোকালয়ে। স্থানীয়রা চেষ্টা চালাচ্ছে যাতে বাঁধ ভেঙে না যায়।
কয়রার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের আংটিহারা, কয়রা সদর এলাকায় বুধবার দুপুরের জোয়ারের পানিতে ওয়াপদার রাস্তা ছাপিয়ে লোকালয়ের ভিতরে পানি ঢুকেছে। স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে স্থানীয়রা তাৎক্ষণিকভাবে বেড়ি বাঁধ মেরামতের কাজ করছে।
কয়রা উপজেলার কয়রা সদর, উত্তর বেদকাশী এবং দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের কয়েক জায়গা দিয়ে বেড়ি বাঁধ উপচে পানি প্রবেশ করেছে।
স্থানীয় মানুষ বেড়ি বাঁধের উপর মাটি দিয়ে পানি আটকানোর চেষ্টা করেন।
এছাড়া পাইকগাছা উপজেলার সোলাদানা ইউনিয়নে বয়ারঝাপা
এলাকায় ওয়াপদা বাঁধে ভাঙ্গন শুরু হয়।
স্থানীয় চেয়ারম্যান এসএম এনামুল হক তাৎক্ষণিভাবে লোকজন নিয়ে মাটি ফেলে ভাঙ্গন রোধে কাজ করেন। রাতের জোয়ারে আরো বেশি পানি বাড়তে পারে বলে উৎকণ্ঠায় এসব এলাকার হাজারো মানুষ।
চেয়ারম্যান এস এম এনামুল হক জানান, কয়রার বেশ কিছু এলাকার বেড়ি বাঁধ অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। যে কোনো সময় বাঁধ
ভেঙে প্লাবিত হতে পারে বিস্তীর্ণ জনপদ।
দাকোপ উপজেলার কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের ১ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জিএম ফয়সাল আলম বলেন, রামনগর সরকারি জগন্নাথ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাইক্লোন শেল্টারে এলাকাবাসী আশ্রয় নিয়েছেন। সাইক্লোন শেল্টার কমিটি খিচুড়ির ব্যবস্থা করেছে।
এদিকে বেলা বাড়ার সাথে সাথে আশ্রয় কেন্দ্রে ছুটতে থাকে মানুষ। তবে আশ্রয় কেন্দ্রে আসা অধিকাংশই বৃদ্ধ ও শিশু।
এদিকে, উপকুলীয় দাকোপ ও কয়রা উপজেলার মানুষ বেড়িবাঁধ ভাঙ্গনের আশঙ্কায় রয়েছেন। অনেক জায়গায় মানুষ
নিজেরাই স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের ফাঁটল মেরামত করছেন।
স্থানীয়রা জানান, কয়রা উপজেলার কয়রা সদর ইউনিয়ন, দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়ন, উত্তর বেদকাশি ইউনিয়ন ও মহারাজপুর ইউনিয়নের কপোতাক্ষ নদ ও শাকবাড়িয়া নদীর প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এরমধ্যে কপোতাক্ষ নদের গোলখালী থেকে দশালিয়া পর্যন্ত
১৫ কিলোমিটার ও শাকবাড়িয়া নদীর আংটিহারা থেকে মহরারাজপুর ইউনিয়নের পোবনা পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
এছাড়া দাকোপ উপজেলার তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের ঢাকী নদীর বটবুনিয়া বাজার সংলগ্ন ৪০০ মিটার ও কামিনীবাসিয়া
গাইনবাড়ি সংলগ্ন ৭০ মিটার বেড়িবাঁধ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বাঁধ ভেঙ্গে গেলে ব্যাপক ফসলহানিসহ লবণ পানিতে প্লাবিত হবে জনপদ।
দাকোপ উপজেলার পানখালী ২নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শফিউল আজম সেলিম জানান, পানখালী ইউনিয়নের পশুর নদীর খলিশা এলাকায় ১০০-১৫০ গজ বেড়িবাঁধ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
জলোচ্ছ্বাসে বাঁধ ভেঙ্গে ব্যাপক এলাকা লবণ পানিতে প্লাবিত হতে পারে।
পানখালী ইউপি চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল কাদের জানান, পানখালী পশ্চিমপাড়ায়
ঝপঝপিয়া নদী সংলগ্ন প্রায় আধা কিলোমিটার বেড়িবাঁধ অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বুধবার সকালে স্থানীয় মানুষ নিজেরা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে পশুর নদীর খলিশা এলাকায় ১০০-১৫০ গজ বেড়িবাঁধ মেরামত করেছে। তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো মেরামত করা না হলে জলোচ্ছ্বাসে বাঁধ ভেঙ্গে ব্যাপক ফসলহানিসহ বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সুন্দরবন সংলগ্ন ছুতারখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাসুম আলী ফকির জানান, তার ইউনিয়নে ২৭টি আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে। সকালে কিছু কিছু মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আসলেও আবহাওয়া ভালো দেখে তারা আবার বাড়ি চলে যায়। তবে, দুপুরের পর থেকে তারা আবার
আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে শুরু করেছে। কয়রা সদর ইউপি চেয়ারম্যান মো. হুমায়ুন কবির জানান, কয়রা সদর ইউনিয়নে ২৪টি স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে।
বেলা ১২টার পর থেকে মানুষ সাইক্লোন শেল্টারে আসা শুরু করেছে। বিকাল ৪টার মধ্যে সব মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসার নির্দেশনা থাকলেও এখনো অনেকে আসছেন ।
এদিকে মোংলা বন্দরে অবস্থানরত ১১টি পণ্যবাহী জাহাজ, নৌযান ও ট্যুারিস্ট
বোর্ড নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানান মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ।
খুলনার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন বলেন, ইতোমধ্যে খুলনার লক্ষাধিক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে। তাদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
খুলনা জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা মোঃ আজিজুল হক জোয়ারদার বলেন, আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তিদের দুইবেলা খিচুড়ি দেওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে স্থানীয় উপজেলা
প্রশাসনকে।