এ বাশার (চঞ্চল) ,নওগাঁ প্রতিনিধি: নওগাঁর রাণীনগরের আতাইকুলা গণহত্যার ৪৫ বছর পার হলেও এই গণহত্যার মূল পরিকল্পনাকারি ও ইন্দনদাতারা আজও চিহিৃত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার ক্ষমতায় আসার পরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাক-হানাদার বাহিনীর দোসর এদেশীয় রাজাকার আলবদরদের বিচার কাজ শুরু করলেও রাণীনগরের আতাইকুলা গ্রামের গণহত্যাকারিদের চিহিৃত করে আজও বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। এমনকি ওই দিনে গণহত্যার শিকার শহীদদের স্বীকৃতি আজও মিলেনি। তালিকাভূক্ত হয়নি ওই গ্রামের পাক-বাহিনীর হাতে পাশবিক নির্যাতনের শিকার বীরঙ্গনাদের নাম।
নওগাঁ জেলার রাণীনগর উপজেলার আতাইকুলা গ্রাম বাসির কাছে ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল এক স্মরণীয় দিন। মুক্তিযোদ্ধের ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে লেখা দিন। ২৫এপ্রিল রাণীনগরে যেমন শোকের ছায়া নেমে আসে তেমনি এই দিনটিকে নিয়ে এলাকাবাসি গর্ব বোধ করেন। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার আতাইকুলা গ্রামে গণহত্যা চালায়। নিরস্ত্র-নিরপরাধ মুক্তিকামি গ্রামবাসীর উপর চালিয়ে ছিল হত্যা, নারী নির্যাতন, লুটপাত, অগ্নিসংযোগের মত বর্বর হামলা। এদেশীয় স্থাণীয় রাজাকার আলবদরদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে এসে ওই গ্রামের যগেশ্বর পালের বাড়ির বৈঠক খানার সামনের আঙ্গিনায় যগেশ্বর ও তার পুত্র, ভাতিজা সহ ৫২ জন গ্রাম বাসীকে “জয় বাংলা বলতা হ্যায়, নৌকা মে ভোট দিতা হ্যায়” এই স্লোগান দিতে দিতে পাক-সেনারা মেশিনগান দিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে। সে এক বীভৎস করুণ বেদনাদায়ক দৃশ্য মনে করে আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামবাসি আজও আতংকে কেঁপে উঠে।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় ০৭ কিলোমিটার দক্ষিন-পশ্চিমে রাণীনগর উপজেলার ছোট যমুনা নদীর তীরে মিরাট ইউনিয়নের নিভৃত পল্লী আতাইকুলা পালপাড়া গ্রাম। গ্রামবাসির অপরাধ ছিল তারা মুক্তিযোদ্ধকে সমর্থন করে অস্ত্র হাতে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরেছিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে এদেশকে রক্ষা করার জন্য। ১৯৭১ সালে ২৫ এপ্রিল হানাদার খানসেনা ২’শতাধিক পাক-বাহিনীর নরপশুর একটি দল ওই দিন সকাল অনুমান ৯টার দিকে আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামের পূর্বদিকে কুজাইল বাজারে অবস্থান নিয়ে তাদের পূর্ব পরিকল্পনা মত পাকিস্তানের পতাকা হাতে নিয়ে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিতে দিতে কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে ধীরে ধীরে নদী পার হয়ে আতাইকুলা গ্রাম ঘিরে ফেলে। অবস্থা বাগতিক দেখে ওই গ্রামের কিছু লোক বাড়ি-ঘর ফেলে রেখে নারী-পুরুষ যুবক-যুবতীরা যে যার মনে পালানোর চেষ্ঠা করলেও পাক-হানাদার বাহিনীর স্থাণীয় রাজাকার আলবদররা তাদেরকে বাঁধা দেয়। হতভাগ্য পালপাড়া গ্রামবাসি বুঝতে পারলো পরিবারের সবাইকে আজ মরতে হবে। পালপাড়া গ্রামের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যগেশ্বর পালের বৈঠকখানার আঙ্গিনায় জরো করে। এরপর শুরু হয় দিনভর পাক-সেনাদের বর্বরতা নির্যাতন, ঘরে ঘরে হত্যা, লুন্ঠন, ধর্ষন অগ্নিসংযোগসহ মর্মস্পর্শী নির্যাতন। নিমর্ম অত্যাচারে গ্রামের মানুষের বাঁচার আত্মনাতে বাতাস ভারি হয়ে উঠে। নরপশুদের হাতে বন্দী নর-নারী শিশুরা পাথর হয়ে যায়। যার যা কিছূ টাকা-কড়ি, সোনা-দানা সহ সব কিছু তুলে দিলেও শেষ পর্যন্ত তাদের মন গলাতে পারেনি গ্রামবাসি। দিনের শেষ বিকেলে বৈঠকখানার আঙ্গিনায় বন্দীদের ওপর চালালো উপর্যুপরি মেশিনগানের ব্রাশফায়ার। গুলিতে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয় নিরীহ গ্রামবাসিদের। ঘটনাস্থলেই শহীদ হন শ্রী গবিন্দ্রনাথ চরন পাল (৩৫), জগেনন্দ্রনাথ (৪০), শুরেশ্বর পাল (৪১),তার পুত্র প্রকৌশলী প্রশান্ত কুমার পাল(২৫), শুনিল কুমার পালসহ শেষ হয়ে গেল ৫২টি তাজা প্রান।
ঘটনাক্রমে ওইদিন গুরত্বর আহত অবস্থায় প্রানে রক্ষাপায়, শ্রী সুনীল চন্দ্র পাল, সাধন চন্দ্র পাল, দেশ স্বাধীনের অনেক দিন পেরিয়ে গেলেও শহীদ পরিবারের খোঁজ-খবরসহ এখানকার গণকবরের উন্নয়নে কেউ ভূমিকা রাখেনি। তবে শহীদ পরিবারের সদস্য গৌতম পাল জানান, স্থাণীয় সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলম এমপি’র প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ইতিমধ্যেই শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ, অডিটোরিয়াম ও শিশুপার্ক নিমার্ণের জন্য শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই ৫ শতক জমি দান সহ সরকারি পর্যায়ে ৩৯ শতক জমি একোয়ার এর জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। শহীদ পরিবারের দাবি শেষ মূহূতে হলেও শহীদদের স্বীকৃতি, গণকবরটি সংরক্ষন ও বীরঙ্গনাদের তালিকা করে রাস্টীয় সম্মানী প্রদানের আসা করেন।
স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরেও আতাইকুলা গণহত্যার ইন্ধনদাতারা চিহিৃত হয়নি