Main Menu

৬৫ বছর  পর ফেনীর গর্ব ভাষা শহীদ সালামের কবর সনাক্ত

 

ফেনী |

৬৫ বছরের অপেক্ষার পালাশেষে তার ভাই পেতে যাচ্ছেন ভাষা শহীদ সালামের কবর! সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর- পাঁচ ভাষাশহীদের নাম উচ্চারণে প্রথমেই আসে ভাষা শহীদ সালামের নাম। চার ভাই দুই বোনের মধ্যে সালাম ছিলেন সবার বড়। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সংগ্রামে শহীদ হন তিনি।

রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ৬৫ বছর পার হয়ে গেলেও এখনও চিহ্নিত করা হয়নি বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের সূর্যসৈনিক ভাষাশহীদ সালামের কবরটি।

সংবাদ সংগ্রহে এই প্রতিবেদক রাজধানীর ধানমন্ডিতে ভাষাসংগ্রামী কাজী গোলাম মাহবুব ট্রাস্ট পরিচালিত ভাষা আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্র ও জাদুঘর-এ গেলে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক এম আর মাহবুবের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, বেশ কয়েকবার তিনি সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেছেন ভাষাশহীদ সালামের কবর চিহ্নিত করার ব্যাপারে। স্মারকলিপিও দিয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। এম আর মাহবুবের কাছ থেকেই জানা গেলো ভাষাশহীদ সালামের ভাই আবদুল করিমের জীবিত থাকার খবর।

ভাষা আন্দোলনের ওপর প্রতিবেদন তৈরির কাজে হাত দিয়ে এই প্রতিবেদকের কথা হয় ভাষাশহীদ সালামের ভাই আব্দুল করিমের সঙ্গে। এই প্রতিবেদককে মোবাইলফোনে আব্দুল করিম বলেন, ‘আমার একটাই দাবি, আমার ভাইয়ের কবর চিহ্নিত করে দেওয়ার ব্যবস্থা করুক সরকার। মরবার আগে এটা আমি দেখে যেতে চাই’। আবদুল করিম আরো বলেন, ‘প্রত্যেক বছর ফেব্রুয়ারি এলে সাংবাদিকরা আমার সাথে দেখা কইরা আমার কথা নেয়। কিন্তু কথা নিয়া কী লাভ, কেউ তো আগাইয়া আসে না আমার ভাইয়ের কবরটা শনাক্ত করার ব্যবস্থা করতে। আমি প্রত্যেক বছর একই কথা কই।’

বড়ভাই সালামের কবর চিহ্নিত করার জন্য বেশ কয়েকবার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন বলেও জানান আব্দুল করিম। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে ভাষাশহীদ সালামের কবর জিয়ারতে আজিমপুর কবরস্থানে আসেন আব্দুল করিম। তিনি বলেন, ‘বহুবার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করছি। আজিমপুর কবরস্থানে গিয়াও কতজনরে কইছি। আজিমপুর কবরস্থানের মালিকরা আমারে কইছে তিন লাখ টাকা দিলে তারা আমার ভাইয়ের কবর চিহ্নিত কইরা দিবো। তারপর থেকে আর রাগে-ক্ষোভে টাকা দেওয়ার ভয়ে কারোরে কিছু কই না। আমার তো তিন লাখ টাকা জোগাড়ের সামর্থ্য নাই।’

কবরস্থানের মালিক কারা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওই যে তারা কবরস্থানে বইসা থাকে, ওইখানেই কথা হইছে।’ গ্রামের সাধারণ সহজ-সরল আব্দুল করিমের সাথে কে বা কারা এই নির্মম প্রহসন করেছে তা অজানাই রয়ে যায়।

আজিমপুর কবরস্থান বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে। এ বিষয়ে এই প্রতিবেদক মেয়র সাঈদ খোকনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘আব্দুল করিম আজিমপুরের যেখানে ভাষাশহীদ সালামের কবর চিহ্নিত করে দেবেন সেখানে আমরা অন্য ভাষাশহীদের কবরের মতো করে সালামের কবর পাকাকরণের ব্যবস্থা করবো।’

‘আপনি ব্যবস্থা করেন কোন জায়গায় সালামকে কবর দেয়া হয়েছে সেটা বের করার, এটা অনেক ভালো ও মহৎ উদ্যোগ। আমি কথা দিচ্ছি এটা অবশ্যই হবে’, বলেন মেয়র সাঈদ খোকন।

একইভাবে এই প্রতিবেদক সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি এ বিষয়ে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, ‘বলা হয় দায়িত্ব কার? সরকারের দায়িত্ব অবশ্যই আছে। আমরা যখন যা জানতে পারছি তখনই সেটা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

বৃহস্পতিবার ভাষার মাস উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তমদ্দুন মজলিস আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকায় আসেন আব্দুল করিম। অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যেও একই দাবি তোলেন আব্দুল করিম। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কথা হয় আব্দুল করিমের। তাকে জানানো হয় যে মেয়র সাঈদ খোকন ও মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের দেওয়া আশ্বাসের কথা। এরপর এই প্রতিবেদকের অনুরোধে আব্দুল করিম পরিবর্তন ডটকমের সঙ্গে যান আজিমপুর কবরস্থানে। এ সময় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা ভাষাশহীদ বরকতের ভাতিজা আইনুদ্দিন বরকত টুটু ও ভাষা আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্র ও যাদুঘরের নির্বাহী পরিচালক এম আর মাহবুবও সঙ্গে ছিলেন।

আজিমপুর কবরস্থানে ভাষাশহীদ শফিউর রহমানের কবরের পূর্বদিকে দুইটি পুরানো কবরের পরের কবরটিকে ভাষাশহীদ সালামের কবর বলে দাবি করেন সালামের ভাই আব্দুল করিম। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন কবরস্থানের ইনচার্জ মাওলানা হাফিজুল ইসলাম।

সংশ্লিষ্ট কবরস্থান কর্মকর্তা ও নগরভবন সূত্র জানায়, এখন কেবল বাকি আছে আব্দুল করিমের দাবির সঙ্গে ১৯৫২ সালের আজিমপুর কবরস্থানের রেজিস্টার খাতা মিলিয়ে দেখার কাজ। তাহলেই আনুষ্ঠানিকভাবে ভাষা শহীদ সালামের কবর শনাক্ত হয়ে যাবে।

১৯২৫ সালে ফেনীর দাগনভুইয়া উপজেলার লক্ষ্মণপুর (বর্তমান সালামনগর) গ্রামে শহীদ আবদুস সালামের জন্ম। বাবার নাম মোহাম্মদ ফাজিল মিয়া। শহীদ আবদুস সালাম দাগনভুইয়া কামাল আতাতুর্ক হাই স্কুলে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ডিরেক্টরেট অব ইন্ডাস্ট্রিজ বিভাগের ‘পিয়ন’ হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

ঢাকায় আবদুস সালাম ৩৬/বি নীলক্ষেত ব্যারাকে বাস করতেন। ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিতে সরকার ১৪৪ ধারা জারি করলে ছাত্র-জনতা সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যে-বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন, শহীদ আবদুস সালাম তাতে অংশ নেন। সেই বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হলে তাঁকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়।

পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। সালামের লাশ ঢাকাস্থ আজিমপুর কবরস্থানে নেওয়া হয়। সে সময় সালামের বাবা ফাজিল মিয়া, ভাতিজা মকবুল, ভাই হাবিব উল্লাহসহ ছাত্র-জনতার উপস্থিতিতে সালামের জানাজা শেষে দাফন করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী ভাতিজা মকবুল এখনও জীবিত আছেন। সে সময় সালামের ছোট ভাই আব্দুল করিম ছিলেন শিশু। পরে বাবা ও ভাইদের সঙ্গে সালামের কবর জিয়ারত করতে বিভিন্ন সময়ে আজিমপুর কবরস্থানে আসেন আব্দুল করিম।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *