Main Menu

ফাঁদে পড়ার আকাঙ্খায় বিএনপির ব্যাকুলতা! 

 

গোলাম মাওলা রনি:

রাজনীতি সংশ্লিষ্টদের সব আগ্রহ এখন বিএনপিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। সব আলাপ-আলোচনা, রাজনীতির জটিল ও কূটিল অঙ্কগুলো এবং সমীকরণাদীও বিএনপিকে ঘিরেই আলোচিত হচ্ছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি কী অংশগ্রহণ করবে, নাকি করবে না- এমনতর প্রশ্নের জবাব খোঁজার জন্য জনগণ যতটা না উদগ্রীব তার চেয়েও বেশি মাত্রায় উদগ্রীব হয়ে পড়েছে ক্ষমতাসীন জোট। বিএনপির মেজাজ-মর্জি, ইচ্ছা-অনিচ্ছা এবং কর্মকাণ্ডের ওপর মহাজোটের শরিক দলগুলোর যেমন ভাগ্য নির্ভর করছে, ঠিক তেমনি আওয়ামী লীগের অনেক বাঘা বাঘা নেতার তকদিরও পেন্ডুলামের মতো দোল খাচ্ছে। বিএনপির সাথে রাজনৈতিক খেল খেলার জন্য ক্ষমতাসীনেরা ত্রিমাত্রিক পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছে। সর্বাধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতিতে খেলাধুলার পাশাপাশি আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক চাল এবং চালাকির হাললাগাদ কৌশল নিয়ে বিএনপির প্রতিপক্ষরা যত বেশি আকুলতাসহকারে অগ্রসর হচ্ছেন, বিএনপি তার চেয়েও বেশিমাত্রায় ব্যাকুলতা নিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে।

 

বিএনপির চালচলন, ভাবসাব, কথাবার্তা, আকার ইঙ্গিত ইত্যাদি দেখলে মনে হয় তারা হয়তো সরকারের কূটকৌশলের জালে আবদ্ধ হওয়ার বাসনায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে; নয়তো নিজেদের পরিণতি সম্পর্কে অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়েছে। গত চার-পাঁচ বছর ধরে আওয়ামী লীগসহ ক্ষমতাসীন মহাজোটের নেতারা যেভাবে জলে-স্থলে এবং অন্তরীক্ষে বিএনপি জোটকে আক্রমণ করে যাচ্ছে, তার বিপরীতে জয়লাভ তো দূরের কথা- সম্মানজনক পরাজয়টুকুও বিএনপি নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে অত্যন্ত সফলতার সাথে।

 

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অবশ্যই অংশগ্রহণ করবে। অন্য দিকে, বিএনপির একসময়ের প্রভাবশালী নেতা এবং সহযোগীরা যারা বর্তমানে বিএনপির সাথে নেই, আবার বিএনপি বিরোধীও নন- তারা কিন্তু বলছে ভিন্ন কথা। তাদের মতে, নির্বাচনের পূর্বক্ষণে সরকার এমন সব কথাবার্তা বলবে এবং এমন সব আচরণ শুরু করে দেবে যাতে বিএনপির মেজাজ বিগড়ে যাবে। তারা তখন রাগ করে পূর্বেকার মতো ঘোষণা দিয়ে বসবে যে- এ সরকারের অধীনে তারা কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। বিএনপির সেই রাগচণ্ডালি মনোভাব এবং গোঁয়ার্তুমিমূলক ঘোষণার সম্ভাবনা মাথায় রেখে অনেক ছোট ছোট রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যে সরকারের সাথে যোগাযোগ শুরু করে দিয়েছে। তারা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো ভুল পুনরায় করতে রাজি নয়। বিগত দিনে বিএনপির সাথে একাত্মতা ঘোষণার মাধ্যমে নির্বাচন বর্জন করে তারা সরকারকে উচিত শিক্ষা দিতে গিয়ে যে শিক্ষা নিজেরা লাভ করেছে তার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য আগামী নির্বাচনে তারা সরকারের সাথে কাঁধ মিলিয়ে বিএনপিকে শিক্ষা দেয়ার মানসে এখন থেকেই চেষ্টা তদ্বীর চালিয়ে যাচ্ছে।

 

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তাদের সাথে জোটবদ্ধ অন্যান্য ছোট বড় রাজনৈতিক দল নিজেদের মহাজোটের বাইরের রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক এবং দেশী-বিদেশী কূটনীতিবিদদের সাথে নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন আগামী নির্বাচনটিকে দৃশ্যত গ্রহণযোগ্য, প্রতিযোগিতামূলক এবং মোটামুটি নিরপেক্ষ করার জন্য। তারা বিএনপি জোটের বিভিন্ন নেতার সাথে যেমন যোগাযোগ রক্ষা করছেন, তেমনি বিএনপি থেকে বের হয়ে যাওয়া এবং বিএনপিতে সংস্কারবাদী বলে তকমার হয়ে থাকা নেতদের সাথে রীতিমতো সখ্য গড়ে তুলেছেন। ঢাকা ক্লাব, গুলশান ক্লাব, উত্তরা ক্লাব, চট্টগ্রাম ক্লাব ছাড়াও সিলেট, বরিশাল, খুলনা ও কুমিল্লা ক্লাবে নিয়মিত আড্ডায় দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে ধারাবাহিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। রাজধানীর অভিজাত এলাকায় বসবাসরত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বাসভবনে ঘরোয়া বৈঠকের নামে বিভিন্ন দলের নীতিনির্ধারণী নেতারা নিয়মিত আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

সরকার এবং তাদের সহযোগীরা মূলত তিনটি সম্ভাবনাকে সামনে রেখে নিজেদের রাজনৈতিক কৌশল তৈরি করে রেখেছেন। প্রথম সম্ভাবনা হিসেবে তারা সর্বোতভাবে চেষ্টা চালাবে বিএনপিকে সম্পূর্ণ একঘরে করে বাকি সব রাজনৈতিক দলকে সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনে নিয়ে আসার জন্য। ওই লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই বেশ কয়েক দফা মাঠ জরিপের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ছাড়াও দেশী-বিদেশী বেশ কয়েকটি নামকরা জরিপ কোম্পানি দ্বারা প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার জনগণের রাজনৈতিক মনোভাব জনপ্রিয় প্রার্থী, নির্বাচনকালীন সময়ে জনগণের অংশগ্রহণ, নির্বাচনী দাঙ্গা, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীর ভূমিকা এবং দাপটের ফলাফল নিয়ে চুলচেরা হিসাব-নিকাশের অনুসিদ্ধান্ত প্রণয়ন করা হয়েছে।

 

প্রথম সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য আওয়ামী লীগ দেশের যেসব স্থানে নিজেদের জনপ্রিয়, শক্তিশালী, গ্রহণযোগ্য এবং সুবিধাজনক মনে করে যেসব নির্বাচনী এলাকায় নিজেদের প্রার্থী দাঁড় করাবে, যার সংখ্যা ১৬০ থেকে ১৭০টির বেশি হবে না। প্রায় ৫০টি সংসদীয় আসন তারা সংরক্ষিত রাখবে দেশের নামকরা বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক, ডাক্তার ও পেশাজীবীদের জন্য, যাদের রয়েছে দেশজোড়া সুনাম এবং সুখ্যাতি। বাকি আসনগুলো সমঝোতার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বণ্টন করা হবে। অতি গোপনে এবং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্বাচনের কমপক্ষে তিন মাস আগে ৩০০ আসনের প্রার্থীতালিকা চূড়ান্ত করে বিভাগওয়ারি একাধিক গোপন বৈঠকের মাধ্যমে প্রার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া, সুসম্পর্ক স্থাপন এবং আস্থা জাগিয়ে তোলার জন্য সবরকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

পরিকল্পনা অনুসারে নির্দিষ্ট সময়ে ঘটা করে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হবে এবং প্রার্থীরাও সর্বোচ্চ শক্তি ও সামর্থ্য প্রয়োগ করে ৩০০ আসনে উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা চালাবেন। দেশী-বিদেশী সরকার সমর্থক মিডিয়াগুলোয় প্রার্থীদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং গুণাবলি নিয়ে বিশাল বিশাল মহাকাব্য রচিত, পঠিত এবং মঞ্চায়িত হবে। প্রতিটি সংসদীয় আসনের সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থীর বিজয়কে গ্রহণযোগ্য, দৃশ্যমান এবং প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিযোগী এবং বিনিয়োগ সমন্বয় করা হবে। একটি কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল সেন্টার থেকে সব কিছু তদারক করা হবে এবং উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিসের ব্যবস্থা করা হবে।

 

সরকার দ্বিতীয় সম্ভাবনা হিসেবে একটি দুর্বল, অনুগত, নিঃসঙ্গ এবং তাঁবেদার প্রকৃতির বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে আসার চেষ্টা করবে। সেই লক্ষ্যে, সরকারের সাথে মোটামুটি যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন এমন বিএনপি নেতাদের মাধ্যমে দলটির জন্য কিছু পুনর্বাসনমূলক প্যাকেজ প্রণয়ন করা হবে। ৩৫ থেকে ৪০টি সংসদীয় আসন, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার, শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা কৌশলগত মামলাগুলো এরশাদের মামলার মতো ঝুলিয়ে রাখা, লোভী এবং ব্যবসায়ী মনোভাবাপন্ন নেতাদের সরকারি কাজকর্মের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান এবং সরকারের প্রতি অনুগত ও কৃতজ্ঞ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাগুলো প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

 

তৃতীয় সম্ভাবনায় সরকার আশঙ্কা করছে, বিএনপি হঠাৎই রাজনীতির পাদপীঠে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে আসতে পারে। নিজেদের জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক ভিত্তি, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সরকারবিরোধী নিরপেক্ষ জনমতকে পুঁজি করে তারা যেকোনো মুহূর্তে সরকারের জন্য মস্তবড় ঝক্কি-ঝামেলা এবং ফ্যাতনা-ফ্যাসাদের কারণ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। বিএনপির আহ্বানে বিপুল জনগণের হঠাৎ রাস্তায় নেমে আসার সম্ভাবনাকেও সরকার তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে না। আন্দোলনের মুখে বিএনপির দাবি মেনে নেয়া অথবা একটি সত্যিকার নিরপেক্ষ, প্রভাবমুক্ত এবং স্বচ্ছ জাতীয় নির্বাচন মোকাবেলা করার ঝুঁকির বিপরীতেও সরকার নিজেদের জন্য প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করে রেখেছে।

 

তৃতীয় সম্ভাবনার মোকাবেলায় সরকার তার দলের ত্যাগী ও জনপ্রিয় নেতাদের দলীয় মনোনয়ন দেয়ার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে। সারা দেশে আওয়ামী লীগের অন্তত ৫০-৬০ জন অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা রয়েছেন, যারা সংস্কারবাদিতার অপবাদ, বর্তমানের হাইব্রিড নেতাদের গুঁতোগুঁতি এবং শীর্ষ নেতাদের বিরাগ মনোভাবের কারণে দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রয়েছেন। দলীয় মনোনয়নে তারা যেকোনো পরিস্থিতিতে বিজয়ী হয়ে আসতে সক্ষম এবং দল যদি তাদের আহ্বান করে তবে তারা যেকোনো ঝুঁকি নিতেও পিছপা হবেন না। সরকারের জন্য যদি আগামী দিনে সত্যিকার অর্থেই একটি বিরূপ এবং প্রতিকূল সময় চলে আসে, তাহলে সরকারি দল তাদের সহজাত গোঁয়ার্তুমি মাটিচাপা দিয়ে এমন সব প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবে যার মাধ্যমে সর্বোচ্চ শুভ ফলাফল নিশ্চিত করা যাবে। নিজেদের দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ মিটিয়ে ফেলার পাশাপাশি তারা সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সাথেও সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে সমঝোতা গড়ে তুলবে।

 

বিএনপিকে ফাঁদে ফেলার জন্য সরকার একাধিক কৌশলগত জাল তৈরি করে রেখেছে। এরা বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচন, ঢাকা সিটি করপোরেশন ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় বিএনপির সিদ্ধান্ত, সাংগঠনিক তৎপরতা এবং আচরণকে গভীরভাবে মূল্যায়ন করেছে। সরকারি হিসাব মতে, উপরি-উক্ত প্রতিটি নির্বাচনের আগে বিএনপি যেমন সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি, তেমনি নির্বাচনকালীন সময়ে এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সঠিক কাজটি করতে পারেনি। প্রতিটি নির্বাচনের সময় তারা ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করেছে এবং একটি আচরণের সাথে অন্য আচরণের কোনো মিল বা ধারাবাহিকতা ছিল না। ইউনিয়ন নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির মৌলিক চরিত্র নষ্ট করে দেয়া হয়েছে এবং ঢাকা সিটি ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপিকে লজ্জার অবস্থায় ফেলে ভয়ঙ্করভাবে দুর্বল বানিয়ে ফেলা হয়েছে।

 

ইউনিয়ন নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির কিছু নেতা রাতারাতি বিশাল অঙ্কের অর্থকড়ি কামিয়েছেন বটে কিন্তু দলের সর্বনাশ করে ছেড়েছেন। তৃণমূলের যেসব ত্যাগী নেতা চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়ন এবং মেম্বর পদে দলীয় আনুকূল্য লাভে দিনের পর দিন ঢাকায় অবস্থান করে দুই হাতে অর্থ বিলিয়েছেন, তারা সবাই দল এবং দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সম্পর্কে তাদের বিশ্বাস, ভালোবাসা, আস্থা ও শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলেছেন। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের দ্বারা দলটি যেমন ভবিষ্যতে কোনো আন্দোলন সংগ্রাম করতে পারবে না, তেমনি অর্থের বিনিময়ে যারা দলীয় মনোনয়ন পেয়ে চেয়ারম্যান হয়েছেন তারাও নৈতিকভাবে বিএনপির জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে একটুও আগ্রহ দেখাবেন না। অন্য দিকে, বিগত ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা মনেপ্রাণে নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী ছিলেন না। নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে তাদের যেমন প্রস্তুতি ছিল না, তেমনি তারা বিজয়ী হবেন এমন সম্ভাবনার স্বপ্ন দিন-রাতে কখনোই তারা দেখতেন না।

 

ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে যোগ্য, উপযুক্ত এবং আগ্রহী প্রার্থীদের মনোনয়ন না দিতে পারার ব্যর্থতার জন্য এ দুই মহানগরীতে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি, অস্তিত্ব এবং শক্তিমত্তা রীতিমতো দেউলিয়া হতে বসেছে। সরকার হিসাব করে দেখেছে, বিএনপির পক্ষে কোনো আপদকালীন অবস্থা মোকাবেলা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, এক ধরনের সরকারভীতি এবং নিজেদের সম্পর্কে হীনমন্যতা এক শ্রেণীর প্রভাবশালী বিএনপি নেতার অলঙ্কার এবং পরিচ্ছদে পরিণত হয়েছে। তৃতীয়ত, হঠাৎ করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বলা হলে বা হঠাৎ করে কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হলে বিএনপি কিংবর্তব্য বিমূঢ় হয়ে পড়ে এবং ক্ষেত্রবিশেষে অতিমাত্রায় আশ্চর্য হয়ে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলে। প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফল, কোকোর মৃত্যু উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বিএনপি কার্যালয় উপস্থিতি, কোনো সময় না দিয়ে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা, মাঝে মধ্যে হুটহাট করে পুরনো মামলায় দুই-এক জন নেতাকে গ্রেফতার এবং ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি বিএনপি প্রধানের আদালতে হাজিরার ঘটনার মধ্যে সরকার নিজেদের জন্য ব্যাপক বিনোদন খুঁজে বেড়ায়।

 

বিএনপিকে নিয়ে সরকারের অতীত অভিজ্ঞতা এবং নিকট অতীত অর্থাৎ গত দুই বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে তারা আগামীতে নির্বাচন নামক রাজনৈতিক যুদ্ধ এবং খেলায় বিএনপিকে ফাঁদে ফেলার জন্য সম্ভাব্য কতগুলো জাল বুনে রেখেছে। সরকার খুব ভালো করে জানে যে, জাতীয় নির্বাচন মোকাবেলার জন্য বিএনপির কোনো পূর্ব প্রস্তুতি নেই। দেশের ৩০০ আসনে নিজেদের প্রার্থী মনোনয়ন অথবা নিজেদের রাজনৈতিক জোটের সাথে সমঝোতা করে আসন ভাগাভাগির ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত তো দূরের কথা, মাধ্যমিক পর্যায়ের আলাপ-আলোচনাও তারা শুরু করেনি। আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে কী করবে না অথবা কিভাবে করবে তা নিয়ে কোনো ঘোষণা তারা আজ অবধি দিতে পারেনি। তারা তাদের বর্তমান মিত্রদের যেমন আশ্বস্ত করতে পারেনি, তেমনি সম্ভাব্য নির্বাচনকালীন মিত্রও ঠিক করতে পারেনি। নির্বাচনী ইশতেহার, ঘোষণাপত্র, তৃণমূলের জরিপ, সরকারি দলের মতো তিন সেট প্রার্থীর তালিকা তৈরি ইত্যাদি কোনো কর্মও শুরু করেনি।

 

সরকার আরো জানে যে, বিএনপি মামলার ভারে স্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। তারা সরকারকে শুধু ভয় পায় না, সরকারের মনোভাব নিয়ে রীতিমতো আতঙ্কজনক উদ্বেগের মধ্যে কাটায়। তারা সরকারকে যেমন বিশ্বাস করে না, তেমনি নিজেদের দীর্ঘ দিনের সহযোদ্ধা এবং রাজনৈতিক মিত্রদের প্রতিও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। এ অবস্থায় সরকারের জন্য সবচেয়ে অব্যর্থ রাজনৈতিক চালের ফাঁদ হলো- হঠাৎ এমন একটি ঘোষণা দেয়া, যা অস্বীকার করার উপায় বিএনপির যেমন থাকবে না, তেমনি মোকাবেলা করার সামর্থ্যও তারা হারিয়ে ফেলবে। সরকার খুব ভেবেচিন্তে বিএনপিকে ফাঁদে ফেলার জন্য যতটা দুরন্ত বেগে এগোচ্ছে, তার চেয়েও অস্থির গতি নিয়ে বিএনপি সরকারি ফাঁদে পা দেয়ার আকাক্সক্ষায় ব্যাকুলতা দেখাচ্ছে। সম্ভাব্য দু-একটি সরকারি ফাঁদ সম্পর্কে যদি আমাকে প্রশ্ন করা হয় তাহলে প্রথমেই বলব, একটি অন্তর্বর্তী নির্বাচন, যা ২০১৭ সালের শেষ দিকে অথবা ২০১৮ সালের প্রথম দিকে হতে পারে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েও সরকার বিএনপিকে ফাঁদে ফেলতে পারে।

 

লেখক, সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *