Main Menu

৮ ডিসেম্বর রামগড় হানাদার মুক্ত দিবস – বাংলারদর্পন

 

 

এমদাদ খান : ৮ ডিসেম্বর রামগড় হানাদার মুক্ত দিবস। মুক্তিযুদ্ধে রামগড়ের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে সময় খাগড়াছড়ি ছিল রামগড় মহকুমার মহালছড়ি থানাধীন একটি ইউনিয়ন মাত্র। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণার পর ১৬ মার্চ আওয়ামী সংগ্রাম পরিষদ গঠনের মাধ্যমে মহকুমা শহর রামগড়ে ব্যাপকভাবে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। ২৫ মার্চের পর চট্টগ্রামের বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, অভিনেত্রীসহ সামাজিক নেতৃবৃন্দ রামগড় আসতে শুরু করেন।

আসেন মেজর জিয়া, ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদেরসহ বেশ কয়েকজন সামরিক অফিসার। মেজর জিয়া ও ক্যাপ্টেন রফিকের নেতৃত্বে রামগড় হাই স্কুল মাঠে খোলা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। মুক্তিফৌজের সর্বপ্রথম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এ রামগড়েই খোলা হয়। আওয়ামীলীগ নেতা সুলতান আহমেদের (মরহুম) নেতৃত্বে শত শত মুক্তিকামী তরুণ, যুবক সকলেই দেশকে স্বাধীন করার দৃঢ় প্রত্যয়ে এ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। একদিকে পাক সরকার বিরোধী অসহযোগ আন্দোলন চলে, অন্যদিকে রামগড়কে শত্রু মুক্ত রাখতে বিভিন্ন স্থানে ঘাঁটি বসিয়ে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। রাঙ্গামাটি পতনের পর ১৩ এপ্রিল পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা সদর সেখান থেকে স্থানান্তরিত করে নিয়ে আসা হয় রামগড়ে।

রামগড়ে এসে তৎকালীন জেলা প্রশাসক (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর জন প্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা) এইচ টি ইমাম স্বাধীন বাংলা সরকারের অধীনে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করেন। এরমধ্যে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী প্রভৃতি এলাকা থেকে হাজার হাজার বাস্তুহারা মানুষ ভারতে পারি জমাতে রামগড়ে আসতে শুরু করেন। জেলা প্রশাসক এইচ টি ইমাম এসব বাস্তুহারা মানুষের খাবার দাবারের জন্য লঙ্গরখানা খোলেন। ফেনী নদীর উপর কাঠের সেতু নির্মাণ করে ভারত থেকে আনা হয় অস্ত্র গোলাবারুদসহ বিভিন্ন সমরাস্ত্র। এসব অস্ত্রশস্ত্র রামগড় থেকে চাঁদের গাড়ি করে পাঠানো হয় চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে। ২৭ এপ্রিল মহালছড়িতে পাকবাহিনী ও তাদের দোসর মিজো ও চাকমা মুজাহিদদের সাথে এক প্রচন্ড যুদ্ধে শহীদ হন অকুতোভয় তরুণ সেনা অফিসার ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের বীর উত্তম। রামগড়ের মাটিতে সমাহিত করা হয় এ বীর শহীদকে।

২ মে ভোর বেলায় ভারী কামান ও শক্তিশালী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চারিদিক থেকে রামগড় ঘাঁটির উপর হামলা চালায় পাকবাহিনী। মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুদের প্রতিরোধে সর্বাত্মক চেষ্টা করে। কিন্তু শত্রু পক্ষের বিপুল সৈন্য সংখ্যা ও ভারী অস্ত্রশস্ত্রের মুখে বেশীক্ষণ টিকতে পারেনি মুক্তিযোদ্ধারা। বিকেল ৫ টার দিকে পাকবাহিনী পুরো রামগড় দখল করে নেয়। পতন হয় চট্টগ্রাম, কুমিলা শহরে মুক্তিযোদ্ধাদের সবচেয়ে শক্ত ঘাটিটির। রামগড় পতনের পর সেক্টর এক এর হেডকোয়ার্টার পুনঃস্থাপন করা হয় সীমান্তের ওপারের ভারতের ত্রিপুরার সাবরুম মহকুমার হরিনায়। এর আওতায় সাবরুমের অম্পি নগর, বগাফা, পালাটনা,হরিনা প্রভৃতি স্থানে স্থাপিত ট্রেনিং সেন্টারে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ প্রশিক্ষণ শুরু করা হয়। সেক্টর এক এর কমান্ডার মেজর রফিকুল ইসলামের (সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী) তত্ত্বাবধানে ছিল এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। শত্রদের নিশ্চিহ্ন করে রামগড়ের মাটিতে আবার স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ানোর দৃপ্ত শপথ নিয়ে সাবরুমের ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে যুদ্ধ প্রশিক্ষণ নেয় ১২ বছরের বালক থেকে ৫০ বছরের প্রৌঢ় সবাই।

প্রশিক্ষণ সম্পন্নকারীদের নিয়ে গঠন করা হয় পৃথক পৃথক যোদ্ধা গ্রুপ। রামগড়ের এসব অগ্নিতরুণ যুবকযোদ্ধারা প্রিয় মাতৃভূমিকে হানাদার মুক্ত করতে শুরু করেন মরণপণ মুক্তিযুদ্ধ। রামগড়ের শত্রুঘাঁটির উপর তারা প্রায়ই গেরিলা হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত করে পাক বাহিনীর। ৭ ডিসেম্বর সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে ভারতীয় বিমান বাহিনীর তিনটি জেট বিমান রামগড়ে দখলদারবাহিনীর অবস্থান গুলোর উপর প্রবল বোমা বর্ষণ করে। প্রায় সাত মিনিট বোমা হামলা শেষে বিমান তিনটি ফিরে যাওয়ার সাথে সাথে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী সন্মিলিতভাবে কঠোর আক্রমণ চালায় পাক হানাদারদের উপর। এতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় শত্রুরা। ফলে ভীতসন্ত্রস্ত্র পাকবাহিনীর সৈন্যরা ৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যা থেকে পিছু হটতে শুরু করে। ৮ ডিসেম্বর সকাল ৯ টা ৫০ মিনিটে আরো দুটি ভারতীয় বিমান পাকঘাঁটির উপর পাঁচ মিনিট বোমা বর্ষণ করে। বিমান থেকে বোমা হামলা আর স্থলে অকুতোভয় বীরযোদ্ধাদের মরণপণ গেরিলা আক্রমণে নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে পাক সেনারা। শেষ পর্যন্ত শত্রুরা নিজের প্রাণ বাঁচাতে সদলবলে রামগড় থেকে পালাতে শুরু করে।

৮ ডিসেম্বর বিকেলের আগেই পাক সৈন্যরা সবাই রামগড়ের মাটি ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যায়। বিকেল ৪ টার দিকে ভারতের সাবরুমের আশ্রয় শিবির থেকে বিজয় উল্লাসে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে দেশের মাটিতে ছুটে আসে রামগড়ের মানুষ। রামগড় বাজারে উড়ানো হয় স্বাধীন বাংলার পতাকা।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *